অধ্যাপক আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ এবং আমাদের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

০৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৫ AM

© সংগৃহীত

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের রচিত প্রবন্ধ ‘শাড়ি’ প্রথম আলো পত্রিকায় গত ৩০ আগস্ট প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের কাপেও এর পক্ষে-বিপক্ষে, আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

সবাই তার এ প্রবন্ধটির মধ্যকার প্রকাশভঙ্গীতে অস্থির হলেও আমি একদমই হইনি। কেননা, এই আবু সায়ীদ স্যারেরই তার লেখা বই ‘সংগঠন ও বাঙালি’ ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ে তিনি লিখেছেন — ‘পাকিস্তান আমলে শেষ কিছু বছরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সৌহার্দ্য বাড়াতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান যুবক-যুবতীদের মধ্যকার বিবাহ প্রবনতাকে উৎসাহিত করতো। নিয়ম করা হয়েছিল কোন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানির মধ্যে বিয়ে হলে তাদের প্রত্যেককে ২৫০ টাকা করে জরিমানা করা হবে।’

‘পদ্ধতিটার কথা শুনে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সেই রেষারেষির দিনগুলিতেও আমি খুশি হয়ে উঠেছিলাম। এই খুশি পাকিস্তানের স্থায়ীত্বের জন্য নয়, খুশি হয়েছিলাম এ কথা ভেবে যে, ব্যাপারটা কিছুকাল চললে আমাদের এই স্বাস্থ্য-উদ্দ্যমহীন-নির্জীব-নিরানন্দ দেশে অচিরেই এমন কিছু তাগড়া চেহারার যুবক-যুবতী দেখা যাবে; যারা দেশের সামনে আশার প্রতীক হয়ে দাড়াবে।’

তিনি তার সেই বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘শাড়ি’ প্রবন্ধের মধ্যে ঘোর আপত্তিকর যে বিষয়গুলি লিখেছেন——
• শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক।
• শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।
• আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ।
• সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ বাঙালি মেয়েকে শাড়ি ছাড়া আর হয়তো কিছুতেই মানায় না।
• শাড়ি সুকুমার ও নমনীয় শরীরের জন্যই কেবল সত্যিকার অর্থে মধুর।
• তবে মাঝে মাঝে এ দেশেও যে এক–আধজন সুন্দর মুখের দেখা পাওয়া যায় না, তা–ও নয়। তবে একটিমাত্র কারণেই কেবল তা হতে পারে; যদি তারা তাদের কমনীয় শাড়িগুলোকে নান্দনিক বা সুরুচিসম্মতভাবে পরতে পারে।
• বাঙালি সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: আমার ধারণা ‘উচ্চতা’।
• দৈহিক সৌন্দর্য ছেলেদের বড় ব্যাপার নয় বলে এ নিয়েও তারা কোনোমতে পার পেয়ে যায়।
• আমার ধারণা, একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪–এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না।
• শাড়ি একটা রহস্যময় পোশাক। নারী দেহকে কতটা প্রদর্শন করলে আর কতটা অপ্রকাশিত রাখলে তা শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে, তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে।
• সালোয়ার-কামিজ, টাইট জিনস, মিনি স্কার্ট কি এর সমকক্ষ? শেষেরগুলো তো প্রায় পোশাক না থাকারই শামিল।
• শাড়ির মধ্যে আছে এই দুইয়ের মিলিত জাদু। এ সৌন্দর্যের লালসাকেও বাদ দেয় না আবার আলোয়–ছায়ায়, মেঘে-রৌদ্রে শরীরকে যেন স্বপ্নরাজ্য বানিয়ে দেয়।
• তাদের শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে শাড়ি এই দুর্লভ কাজটি করে।
• শাড়িও তেমনি নারীর শরীরে সৌন্দর্যের প্রতিটি ঢেউ আর সরণিকে আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করে আঁচলের কাছে এসে একঝাঁক সাদা পায়রার মতো নীল আকাশে উড়তে থাকে।
• যেকোনো অসমতাকে আড়ালে রেখে মানসম্মত দেহসৌষ্ঠব নিয়ে দাঁড়ানোর পথ একটাই—ইংরেজিতে যাকে বলে মেকআপ—যার গভীরতর মানে মেকআপ দ্য লস।

তার এই আপত্তিকর লেখাগুলির পিঠে আমার কিছু কথা : প্রথমত, আমার কাছে মনে হয়- আবু সায়ীদ স্যার এখানে সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছেন বক্তব্যের সাধারিণীকরণ করে। কোনো বিষয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে, কিন্তু সেটাকে সর্বজনীনরূপে উপস্থাপন করা উচিত হয়নি।

স্যার লেখার প্রথম বাক্যেই লিখলেন, ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক।’ এই বাক্যে স্যার যদি ‘আমার মতে’ কথাটুকু জুড়ে দিতেন তাহলে কোনো কিছুই বলার থাকত না।সবার কাছে শাড়ি যৌনাবেদনময় এবং শালীন পোশাক মনে না-ও হতে পারে। শাড়ির গুণকীর্তন করতে গিয়ে স্যারের মনোযোগ অনির্দিষ্ট কারণে দেহে নিবিষ্ট হয়েছে বেশি। এটাও অস্বস্তিকর।

রচনাটিতে লেখক সায়ীদ স্যারের চেয়ে তাঁর পুরুষ সত্তাটি প্রকটিত হয়েছে বেশি। স্বাভাবিকতই মনে এটি দেখে একজন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে— অধ্যাপক সায়ীদ স্যার শালীনতার মধ্যে যৌনাবেদন খুঁজলেন নাকি যৌনাবেদনময়ীতার মাঝে শালীনতা খুঁজলেন।

দ্বিতীয়ত, নারীজনিত গতিময় ভঙ্গি ফুটে ওঠার একটা মানদণ্ড কি পাঁচ ফুট চার ইঞ্চ উচ্চতা? ......যাই পরুক, তাকে সুন্দর লাগতে হবে কেন। কেন? সুন্দর লাগার জন্য বাঙ্গালি নারীকে শাড়িই পরতে হবে। কেন?..... মেয়েদের জন্য সৌন্দর্যটাই সবকিছু, এসব কিছু যদি পাশের বাড়ির সংকীর্ণমনা স্বল্প পড়ুয়া ভাবী বলেন, কানে লাগে না। কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মতো একজন ব্যক্তিত্ব দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে সরকারি না হলেও যখন অনেকটা এভাবেই শোনার মত করে বিষয়গুলো লিখেন, তখন ভীষণ অবাক হতেই হয়।

তৃতীয়ত, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আসা বিভিন্ন পোষাককে নিয়ে সমালোচনা তার মতন একজন শিক্ষিত-জ্ঞানী মানুষের কাছ থেকে কি আদও আশা করা যায়? হ্যা, অবশ্যই আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে আমাদের প্রাধান্য দেয়া এবং প্যাশ্চাত্য সংস্কৃতি বিমুখতায় কাজ করা উচিত। তবে, সেটা নিন্দা করে নয়।

চতুর্থত, অধ্যাপক সায়ীদ স্যার তার লেখায় ‘রমণীয়’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরোপিত শব্দ। নারীর জন্যে এটি অবমাননাকর। এটি এসেছে ‘রমণ’ শব্দ থেকে। রমণ মানে ‘রতিক্রিয়া’ বা যৌনমিলন। রমণীয় মানে যৌনসঙ্গীনী। যৌনতার বাইরে নারীসত্তার আর কোনো উপযোগ কি নেই তাহলে?

পুরুষের কামতাড়িত মনোভূমিতে নারীর যৌনতাকেন্দ্রিক অধিষ্ঠান একালে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না বলে শব্দটির ব্যবহার সচরাচর দেখা যায় না। রমনসুখপ্রিয় পুরুষদের থেকে স্যার আলাদা হতে পারলে খুশি হতাম।

পঞ্চমত, শাড়ির ফাঁকে দেহবাড়ির কোন অংশের কোন ভাঁজ উকি দেয় সেটি নিয়ে কামনার্ত রসবিলাস করাই যায় কিন্তু বাঙালি নারীর শাড়ি নিয়ে বিড়ম্বনার দিকটিও উপেক্ষার নয়। আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগেও বাংলার অধিকাংশ নারীর ছায়া (পেটিকোট)-ব্লাউজ পরার সামর্থ্য ছিল না। শাড়ির মাপও এখনকার মতো সাড়ে বারো হাত ছিল না। সাড়ে নয় হাতি শাড়ি পেঁচিয়ে নারীরা দৈনিন্দিন কাজ করতে গিয়ে প্রতিটি মূহূর্তে ছিল আড়ষ্ট, বিব্রত। বুক ঢাকতে পিঠ উদোম হওয়া ঠেকাতে তাদের কত কসরৎ-ই না করতে হতো।

সংক্ষিপ্ত শাড়ি মাথায় উঠানো গেলেও আটকে রাখা যেত না। তাই মহিলাদের দেখা যেত দাঁত দিয়ে আঁচলের কোণা কামড়ে ধরে রাখতে। বছরে দুটো মোটা শাড়ি দিতে পারা ছিল স্বামীর বিশেষ যোগ্যতা। শাড়ির প্যাঁচে উদর-পাঁজরের প্রদর্শনী করে কিছু নারী যে নিজেকে আবেদনময়ী করে তুলতে চায় না, তা নয়।

কিন্তু সেই প্রদর্শনপ্রিয় নারী মানেই তো বাঙালি নারী নয়। নারী মানে আমার মা, আমার বোন, আমার স্ত্রী, আমার আত্মজা। আমি কি সবার শাড়িমোড়ানো দেহবল্লরীর প্রদর্শন উপভোগ করব? শাড়ি সেই পোশাক যার আঁচলের ছোঁয়ায় আমার মা আমাকে মানুষ করেছেন, দিয়েছেন স্বর্গসুখ।

তবে, আশার আলো হলো-সব কথাশেষে তিনি একটি কথা বলেছেন সেটি হলো — ‘আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি।’

বাঙালির শাড়ির ইতিহাস নতুন বাঁকের সন্ধান পায় মূলত মোঘল সাম্রাজ্যের শুরুতে ৷ তুর্কি, আফগান, মোঘল সংস্কৃতির প্রভাবে বাঙালি মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রেও বিস্তর পরিবর্তন ঘটে। তখনই প্রচলন হতে থাকে রং-বেরংয়ের শাড়ির। তখনকার বাঙালি নারীদের পছন্দের শাড়ি ছিল লাল ডুরে। আজকে যেটাকে আমরা বলি চোলি বা কাঁচুলি, সেই সময় মেয়েদের কাছে তা পরিচিত ছিল আঙ্গিয়া নামে।

সেই সময়ের শাড়ি পরার ঢং আর কাঁচুলিকে ঘিরে নানারকম বিষয় সাহিত্যেও আবর্তিত হয়েছে। তবে এ শাড়ি সাধারণের কাছে আরো বেশি বর্ণময় হয়ে উঠলো যখন শাড়ির ধরণটা বদলে শাড়ি হয়ে উঠলো ষোল হাতের। সে সময় সারাবিশ্বের বিস্ময় হয়ে তৈরি হলো ঢাকাই মসলিন।

শেষে দেখা গেল এ বিস্ময়ই কাল হয়ে উঠলো। বাংলার জন্য, শাড়ির টানে ইউরোপীয় বণিকরা দল বেঁধে ছুটে এলো ব্যবসা ফাঁদতে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় শাড়ির বিবর্তনে মসলিনের উত্‍পত্তি এদেশে বিদেশী-সাম্রাজ্য গেড়ে বসার অন্যতম নেপথ্যের কারণ। তাই, বাঙালি নারীদের উচিত তাদের এ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখা।

লেখক: শিক্ষার্থী, উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
  • ১২ মে ২০২৬
পরিবারের প্রতি ‘ক্ষোভ’ থেকেই মাকে হত্যা, আদালতে সেই ছেলের স…
  • ১২ মে ২০২৬
বোরহানউদ্দিনে মাদ্রাসাছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ১২ মে ২০২৬
সলিমুল্লাহ মেডিকেলে আবাসন সংকট নিরসনের দাবি ছাত্রশিবিরের
  • ১১ মে ২০২৬
আড়াই বছরের শিশুসহ মা কারাগারে, ফটকে দাঁড়িয়ে আছে স্কুল পড়ুয়া…
  • ১১ মে ২০২৬
ময়মনসিংহে যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরির কারখানা সিলগালা
  • ১১ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9