বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক পরিবর্তনের কৌশল: আইন, বাস্তবতা ও জনসচেতনতার চ্যালেঞ্জ

১০ মে ২০২৬, ১০:১৫ PM
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক পরিবর্তনের কৌশল: আইন, বাস্তবতা ও জনসচেতনতার চ্যালেঞ্জ

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক পরিবর্তনের কৌশল: আইন, বাস্তবতা ও জনসচেতনতার চ্যালেঞ্জ © প্রতীকী ছবি ও এআই সম্পাদিত

বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার, শিক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে এখনো টিকে আছে বাল্যবিবাহ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার সনদ, নারী উন্নয়ন নীতি সবকিছু থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর বহু দেশে আজও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের এমন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাকে তারা নিজেরা বেছে নেওয়ার সুযোগও পায় না। এই বাস্তবতা শুধু দরিদ্র বা অনুন্নত দেশের সমস্যা নয়; এটি এখন বৈশ্বিক মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

ফ্রান্সিসকো আই. ভেগা-গোমেজ ও এম. মার্সিডিজ গালান-লাদেরোর গবেষণাভিত্তিক কেস স্টাডি “The Role of Social Marketing in a Controversial Cause: The Eradication of Child Marriage” আমাদের দেখায় বাল্যবিবাহ কেবল আইনি অপরাধ নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র আইন করে নয়, সামাজিক বিপণন, সচেতনতা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও সামাজিক মনোভাবের রূপান্তরের মাধ্যমেই এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশ: অগ্রগতির মধ্যেও উদ্বেগজনক বাস্তবতা
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশগুলোর একটি। ইউনিসেফ, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার অনেক ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশেরও বেশি।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্কুল বন্ধ, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সামাজিক অনিরাপত্তার কারণে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা জানিয়েছে, মহামারির সময়ে হাজার হাজার কিশোরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেকে অল্প বয়সেই বিয়ের শিকার হয়।
বাংলাদেশ সরকার বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করেছে, যেখানে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ নির্ধারণ করা হয়েছে। জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি চালু হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় সবকিছু থাকার পরও কেন বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

আইন আছে, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন কেন?
বাল্যবিবাহের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। অনেক দরিদ্র পরিবার মনে করে মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিলে পারিবারিক ব্যয় কমবে, সামাজিক দায় হ্রাস পাবে এবং তার ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। অনেক অঞ্চলে এখনো এমন ধারণা প্রচলিত যে কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে যৌতুকের পরিমাণও তুলনামূলক কম লাগে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট অনেক পরিবারকে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।

এর পাশাপাশি সামাজিক সম্মান রক্ষার মানসিকতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যার অপপ্রয়োগ, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, যৌন হয়রানির ভয় এবং মেয়েদের ‘অর্থনৈতিক বোঝা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাল্যবিবাহকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

আচরণগত তত্ত্ব (Theory of Planned Behavior) অনুযায়ী মানুষের সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না; সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে অনেক পরিবার বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক সমালোচনা, অনিরাপত্তা ও প্রচলিত মানসিকতার কারণে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ভুয়া জন্মনিবন্ধন, গোপনে রাতের বিয়ে এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নীরবতার কারণে বহু ঘটনা প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যায়। কোথাও কোথাও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন, ফলে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না।

স্থানীয় নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে
বাস্তবতা হলো বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বেশি ঘটে গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে। তাই এর সমাধানও স্থানীয় পর্যায় থেকেই শুরু করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, ওয়ার্ড প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

যে এলাকায় বাল্যবিবাহ হবে, সেই এলাকার জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা যেতে পারে। প্রয়োজনে তারা বাল্যবিবাহ মামলার অভিযোগকারী, সাক্ষী কিংবা আইনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে যুক্ত হতে পারেন।

শুধু সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়ে নয়, স্থানীয় সরকারকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করতে হবে, যেখানে শিক্ষক, ইমাম, নারী নেত্রী, কিশোরী ক্লাব, এনজিও প্রতিনিধি ও প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করবে।

বাল্যবিবাহ: স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতির জন্য হুমকি
বাল্যবিবাহের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাজীবনের ওপর। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অপুষ্টি, বিভিন্ন সংক্রমণ এবং এমনকি এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মায়েদের সন্তান জন্মদানের জটিলতা প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বিয়ের পর অধিকাংশ কিশোরীকে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়, যার ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল অবস্থায় থেকে যায় এবং দারিদ্র্যের চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান থাকে। নারীবাদী তত্ত্ব (Feminist Theory) অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ এমন একটি পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন, যেখানে মেয়েদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সীমিত করে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরশীলতার মধ্যে রাখা হয়। বিপরীতে গবেষণা বলছে একটি মেয়ে অন্তত মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারলে তার অল্প বয়সে বিয়ের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বাল্যবিবাহের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে যায়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং দারিদ্র্য আরও স্থায়ী রূপ নেয়। ফলে বাল্যবিবাহ কেবল একটি সামাজিক সংকট নয় বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও একটি বড় অন্তরায়।

বিশ্ব পরিস্থিতি: সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন বিশ্বে প্রায় ২৫ হাজার মেয়েকে বাল্যবিবাহে বাধ্য করা হয়। নাইজার, চাদ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, ভারত ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে পরিচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে যুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটের সময় বাল্যবিবাহ বাড়ে। সিরীয় শরণার্থী শিবিরে, ইয়েমেনে কিংবা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিরাপত্তা ও দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বেড়েছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা গেছে। অনেক পরিবার নিরাপত্তা, সামাজিক ভয় কিংবা অর্থনৈতিক চাপে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিতে চেয়েছে। ফলে এটি কেবল সাংস্কৃতিক নয়; সংকট, যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

রোহিঙ্গা কিশোরীদের বিয়ে: নিরাপত্তা নাকি আরেক শোষণ?
অনেক অভিভাবক যুক্তি দেন শরণার্থী জীবন, দারিদ্র্য ও অনিরাপত্তার মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দিলে তারা সুরক্ষা পাবে। কিন্তু বাস্তবে এই বিয়েগুলোর অধিকাংশই মেয়েদের শিক্ষা, স্বাধীনতা ও শারীরিক নিরাপত্তা কেড়ে নেয়।

বাল্যবিবাহ কখনোই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং তা মেয়েদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ঠেলে দেয়। অল্প বয়সে গর্ভধারণ, পারিবারিক সহিংসতা, স্বামীর বয়সগত আধিপত্য ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা তাদের জীবনের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

সংস্কৃতি ও ধর্মের নামে কি সব গ্রহণযোগ্য?
বাল্যবিবাহের পক্ষে প্রায়ই ‘সংস্কৃতি’, ‘ধর্ম’ কিংবা ‘পারিবারিক সম্মান’-এর যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রথা যদি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তবে তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। মানবাধিকার তত্ত্ব (Human Rights Theory) অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। সেই বিবেচনায় বাল্যবিবাহ কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।

ধর্মীয় মূল্যবোধের মূল উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, কোনো ধরনের শোষণকে উৎসাহ দেওয়া নয়। তাই ধর্মীয় নেতাদের উচিত মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। বাস্তবে দেখা যায় গ্রামীণ সমাজে অনেক মানুষ এনজিও বা প্রশাসনের তুলনায় স্থানীয় ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে সচেতনতা তৈরিতে তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বিপণন: পরিবর্তনের নতুন অস্ত্র
গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক বিপণনের কার্যকারিতা। নরওয়ের এনজিও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত “Thea’s Blog” প্রচারণাটি এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে ১২ বছর বয়সী একটি মেয়ের কল্পিত ব্লগ তৈরি করা হয়, যেখানে সে তার আসন্ন বিয়ে, ভয়, অস্বস্তি ও মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। মেয়েটির হবু স্বামীর বয়স ছিল ৩৭ বছর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক জনমত তৈরি করে। হাজার হাজার মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে, পুলিশকে অভিযোগ জানায় এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে জানা যায় এটি ছিল সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সামাজিক বিপণন প্রচারণা।

এই উদ্যোগটি দেখিয়েছে কেবল পরিসংখ্যান নয়, মানুষের আবেগ ও বিবেককে স্পর্শ করতে পারলে সামাজিক পরিবর্তন অনেক দ্রুত সম্ভব। সামাজিক বিপণন তত্ত্ব (Social Marketing Theory) অনুযায়ী আচরণ পরিবর্তনে তথ্যের পাশাপাশি আবেগ, সামাজিক প্রভাব এবং ইতিবাচক বার্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের বাস্তবধর্মী নাটক, শর্টফিল্ম, কমিউনিটি থিয়েটার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং স্কুলকেন্দ্রিক কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কী ধরনের প্রচারণা কার্যকর হতে পারে?
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহবিরোধী প্রচারণা হতে হবে বাস্তবমুখী, স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর এবং কমিউনিটিভিত্তিক। গ্রাম পর্যায়ে কিশোরী ক্লাব গঠন করে মেয়েদের অধিকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। স্থানীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যবহার করে নাটক, পথনাটক বা লোকজ পরিবেশনার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও আবেগকে প্রভাবিত করা সম্ভব।

স্কুল পর্যায়ে বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক আলোচনা পরিচালনা করলে সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে।
সমাজবিজ্ঞানী এভারেট রজার্সের Diffusion of Innovation Theory অনুযায়ী নতুন সামাজিক ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যখন সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও গণমাধ্যম সেটিকে সমর্থন করে।

এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ যেমন মোবাইল ফোনভিত্তিক হেল্পলাইন, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভিডিও প্রচারণা সচেতনতা ও দ্রুত প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপ, মানবাধিকারভিত্তিক আলোচনা, অনলাইন ক্যাম্পেইন এবং বৈশ্বিক সংহতির মাধ্যমে অর্থায়ন ও সহায়তা বৃদ্ধি করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

প্রযুক্তি ও হেল্প অ্যাপ: নতুন সম্ভাবনা
বর্তমানে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন হেল্প অ্যাপ চালু হয়েছে। গবেষণার আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যদি এমন অ্যাপ থাকে যেখানে কিশোরীরা গোপনে অভিযোগ করতে পারে, স্থানীয় প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাঠানো যায় কিংবা স্কুল কমিউনিটি পর্যায়ে সতর্কতা দেওয়া যায়, তবে অনেক বাল্যবিবাহ আগেই ঠেকানো সম্ভব।

তবে প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে যখন তার সঙ্গে সামাজিক আস্থা, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ের সক্রিয়তা যুক্ত থাকবে।
সমাধান কোথায়?

বাল্যবিবাহ রোধের বাস্তব সমাধান কোনো একক ব্যবস্থায় নেই। আইন, শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রথমত মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত দরিদ্র পরিবারকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত সামাজিক বিপণনের মাধ্যমে মানুষের মানসিকতা বদলাতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা সমাজকে বুঝতে হবে একটি মেয়ে কোনো বোঝা নয়। সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমান সম্ভাবনাময় নাগরিক। তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে তার স্বপ্ন, শিক্ষা ও স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া শুধু ব্যক্তিগত অন্যায় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার শামিল।

উপসংহার
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল নারী অধিকার রক্ষার আন্দোলন নয়; এটি মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নের লড়াই। বাংলাদেশ আইন করেছে, নীতি নিয়েছে, সচেতনতা বাড়িয়েছে, কিন্তু এখন প্রয়োজন বাস্তব ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ।

সামাজিক বিপণনের শক্তি, স্থানীয় নেতৃত্বের জবাবদিহি, নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

কারণ একটি মেয়ের শৈশব, শিক্ষা ও স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে জাতীয় সেমিনার ও শিক্…
  • ১০ মে ২০২৬
আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের ৯ম ম…
  • ১০ মে ২০২৬
মাইলস্টোনের দুই ছাত্র ১৭ দিন ধরে নিখোঁজ, বাসায় রেখে গেছে মু…
  • ১০ মে ২০২৬
শিক্ষকদের ন্যায় কর্মচারীদেরও বদলি চালুর আশ্বাস অধ্যক্ষ সেলি…
  • ১০ মে ২০২৬
মাসের ১০ তারিখেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বেতন পায়নি, দায় কার?
  • ১০ মে ২০২৬
রেলক্রসিং ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে গেল ট্রাক,চালক নিহত
  • ১০ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9