ফিজিক্যাল ও ডিজিটাল স্পেসে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় করণীয়

২৪ মে ২০২৬, ০৪:২৬ PM , আপডেট: ২৪ মে ২০২৬, ০৪:২৯ PM
অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামান

অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামান © টিডিসি সম্পাদিত

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন ইদানীং নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে – চার পাঁচ বছরের মেয়ে বা ছেলে শিশু কেউই এই বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ছোট্ট শিশু আছিয়া থেকে রামিসা কার কথা বলবো? অপরাধের ধরণগুলো দেখলে মনে হবে মনুষ্যত্ব নয়, পশুত্ব আমাদের উপর ভর করেছে। তাহলে কি আমাদের নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে? আসলে নৈতিকতা শুধু বই পড়ে শেখানো যায় না, এটি চর্চার বিষয়। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ, রাষ্ট্র - সবাইকে এখানে ভূমিকা রাখতে হবে। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিভাগে কাজ করার সুবাদে কিছু বিষয় উপলব্ধি করেছি, যেগুলো আমাদের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।

আমাদের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আমরা ফিজিক্যাল বা গতানুগতিক স্পেসে অপরাধকে যতটা গুরুত্ব দিই, সাইবার, অনলাইন বা ডিজিটাল স্পেসে ততটা গুরুত্ব দিই না। অনলাইনে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া, ব্যক্তিগত বিষয়কে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য ডিজিটাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া, নারী ও শিশুদের সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি – এগুলো শুধু সাধারণ অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, একটা খারাপ কাজকে প্রমোট করে আরো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। যেমন আপনি একটা মিথ্যা কথা বললেন সেটা অপরাধ কিন্তু সেই মিথ্যা তথ্য যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিরাপত্তার হুমকি হয়, সেটা তখন সাধারণ অপরাধ নয়, গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। নারী ও শিশুদের প্রতি আমাদের ঘৃণ্য মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট দেখলেই বুঝতে পারবেন। সবার আগে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন জরুরি এবং সেটা ফিজিক্যাল ও সাইবার স্পেসে সমানভাবে প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে আমরা ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার আলোকে ‘ইসেফটি, প্রাইভেসি, ডিফেইমেশন রেগুলেশন (ইপিডিআর)’ চালু করতে পারি। অনেকে সাইবার নিরাপত্তা আইনের সাথে এটাকে গুলিয়ে ফেলেন। আসলে এই দুটো বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন কোনো ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি হলে বা সাইবার অ্যাটাক হলে, সেটাকে সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় ধরা যায়। তবে কারোর ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করলে সেটাকে সাইবার নিরাপত্তা আইনে না ফেলে ইপিডিআর আইনে ধরা সমীচীন হবে এবং যথোপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা সহজ হবে।

২০২৫ সালের মার্চে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন বিষয়ক একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা এবং গণমাধ্যমে। সেই তথ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে ৫,৬০০ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর মধ্যে ৩১৮ জন ধর্ষণের পরে হত্যার শিকার হয়েছে। শুধু ২০১৯ থেকে ২০২১ এই তিন বছরে ২,৭৭৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যা গত দশ বছরের মোট সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ১,০১৮ জন শিশু যদিও ২০২২ সাল থেকে এই সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করলেও অপরাধের ধরণ ও ভয়াবহতা বাড়ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রতিবেদন অনুসারে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মাত্র ৩.৫ শতাংশ মামলা আদালত পর্যন্ত যায়, এর মধ্যে মাত্র ০.৩৭% মামলায় শাস্তি হয়, যা এক বা আধা শতাংশেরও কম। তার মানে প্রতি দশ হাজার ধর্ষণে মাত্র ৩৭ জনের শাস্তি হয়। অপরাধ করলে ধরা পড়বে না আর ধরা পড়লে শাস্তি হবে না এমন ধারণা থেকেই ভুক্তভোগী শিশু রামিসার বাবা প্রথমে মিডিয়ায় বলেছিলেন আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। যদিও দেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলার পর রামিসার বাবা এখন ন্যায়বিচারের আশা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রধানমন্ত্রী কয়জন ভুক্তভোগীর বাড়িতে যাবেন? 

এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে ১৭-১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র দুটি জায়গায় ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে – পুলিশের কেন্দ্রীয় বিভাগে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে। দেশে যৌন হয়রানির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, প্রচুর স্যাম্পল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা মাত্র দুটি পরীক্ষাগারে সম্ভব নয়। এটাও বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার একটি কারণ। বর্তমানে শিশু ও নারী নির্যাতন বিচার ৩-৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা হয় না, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তারা প্রতিবাদ করছে। এই ব্যর্থতা শুধু সরকারের, বিচার বিভাগের বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নয়, আমাদের পুরো সিস্টেমের। দরকার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সংকটের মোকাবিলা করা এবং দোষীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।

এখন একটু অস্ট্রেলিয়ায় দেখি কীভাবে সেখানে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। এদের প্রত্যেকটি প্রদেশে যারা বাচ্চাদের (অনূর্ধ্ব ১৮) সাথে কাজ করে, তাদেরকে ‘ওয়ার্কিং উইথ চিলড্রেন চেক’ কার্ড নিতে হয়। বিভিন্ন প্রদেশে এই কার্ডের নাম ভিন্ন থাকলেও মূল উদ্দেশ্য এক – শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এসব দেশে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে তবে শিশুদের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর, ফলে বাচ্চারা অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকে। যেকোনো পেশার লোকজন যেমন শিক্ষক, গবেষক, নার্স, ডাক্তার, দারোয়ান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান যাদের শিশুদের সাথে ইন্টারেকশন করতে হয়, তাদের প্রত্যেককে নিজ পেশায় যোগ দেওয়ার আগে চিলড্রেন চেক কার্ড নিতে হয় যা দেশের পুলিশ ডেটাবেজ ও চাইল্ড সেক্স অফেন্ডার ডেটাবেজের সাথে চেক করে অত্যন্ত স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়। সাধারণ স্কুলের শিক্ষক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের নামে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারা আর কখনোই শিশুদের সাথে ইন্টারেকশন হয় এমন চাকরি পায় না এবং তাদের জন্যে অন্য চাকরি পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়। 

আমরা চিলড্রেন চেক কার্ডের বিষয়টি ভেবে দেখতে পারি। কাজের সুবাদে আমি অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন স্কুল ভিজিটে যাই, তখন চিলড্রেন চেক কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হয় যতক্ষণ স্কুলে থাকি এবং এটা যেকোনো ভিজিটরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রথমে বিষয়টি আমার কাছে মনে হতো এটা করার কি দরকার? এখন বুঝতে পারি এটার গুরুত্ব – নার্সারি থেকে হাইস্কুল সব শিক্ষক, কর্মচারী, ভিজিটরের এটা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং প্রতি বছর নবায়ন করতে হবে। আমার এক পরিচিত ইটালিয়ান অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী আছে, সে একদিন বলছিল যে সে বাড়িতে বাচ্চাদের গান শেখায় এবং তাকেও এই চিলড্রেন চেক কার্ড নিতে হয়েছে। কোনো যৌন হয়রানির সাথে যুক্ত এমন লোক এই কার্ড পাবে না, ফলে কখনোই শিশুদের সাথে কাজে যুক্ত হতে পারবে না। শিক্ষকদের যদি আদর্শ ও নৈতিকতা না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী বা সমাজের অন্যদের থেকে ভালো কিছু আশা করা কঠিন।

আমেরিকায় তো আরো কঠোর একটা ব্যবস্থা আছে। অস্ট্রেলিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সেক্স অফেন্ডার ডেটাবেজ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে আমেরিকায় সেটা আছে। তাদের ‘ন্যাশনাল সেক্স অফেন্ডার পাবলিক ওয়েবসাইট’ আছে যেখান থেকে সাধারণ মানুষ হতে শুরু করে সবাই নির্দেশনা নিতে পারে। আমাদের দেশে জাতীয় পর্যায়ে এ ধরনের ওয়েবসাইট চালু করতে পারলে নারী ও শিশু নির্যাতন অনেকাংশে কমতে পারে। স্কুলে চাকরি দিতে গেলে, মাদ্রাসায় হুজুর রাখতে গেলে, গৃহ শিক্ষক রাখতে গেলে, বাসা ভাড়া দিতে গেলে, এতিমখানায় কেয়ারটেকার রাখতে গেলে, দারোয়ান রাখতে গেলে অবশ্যই অনলাইনে চেক করে নিয়োগ দিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও জাতীয় পর্যায়ে সেক্স অফেন্ডার ন্যাশনাল ডেটাবেজ আছে। আমাদের এ ধরনের একটি ডেটাবেজ এবং পাবলিক ওয়েবসাইট থাকা এখন সময়ের দাবি।

নারী ও শিশু নির্যাতন শুধু একটি আইনি বা সামাজিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের মানবিক ও নৈতিক সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র - সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, ডিজিটাল সচেতনতা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার মতো দেশগুলোর কার্যকর উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও বাস্তবসম্মত ও প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ শিশু ও সম্মানিত নারীই একটি সভ্য, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।

লেখক: স্কুল, কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

ট্যাগ: মতামত
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল নিয়ে বিতর্ক, সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
অশ্রুসিক্ত মেসি, আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
বিতর্কিত গোলে ইতিহাস গড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
গোল নিয়ে তীব্র বিতর্ক, মিশরের প্রতিবাদ
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে মিশরকে স্তব্ধ করল আর্জেন্টিনা
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
এবার কক্সবাজার জেলার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
  • ০৮ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence