মাহাদী-উল-মোর্শেদ © টিডিসি ফটো
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। স্বৈরাচারের পতন আর মুক্ত হওয়ার আনন্দের আড়ালে দেশের তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে কিন্তু চেপে বসেছে এক নীরব অথচ ভয়ংকর সংকট জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। রাজপথের লড়াই, বুলেটের শব্দ, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা আর সহপাঠীর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখার যে ভয়াবহ ট্রমা, তা তরুণ সমাজকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার কিংবা অর্থনীতি ঠিক করা নিয়ে চারিদিকে কত আলোচনা, অথচ উচ্চশিক্ষার আঙিনায় জমা হওয়া এই মানসিক ভাঙন যেন কারও চোখেই পড়ছে না। অথচ একটা কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একটা প্রজন্মকে পেছনে ফেলে কোনো দেশই কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।
উচ্চশিক্ষার এই চকচকে ক্যানভাসের পেছনে কতটা ক্ষত লুকিয়ে আছে, তা ২০২৫ সালে রচিত ‘সেন্টার ফর সাইকোলজিক্যাল হেলথ’ এর গবেষক সাদিয়া শারমিন ও ‘সেন্টার ফর রিসার্চ ইন মাল্টিডিসিপ্লিন - সিআরএম’ এর প্রধান গবেষক মাহাদী-উল-মোর্শেদের যৌথ গবেষণায় খুব স্পষ্টভাবেই ভেসে উঠেছিল। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এই গবেষণার তথ্য বলে, ৭৭% এর মত নারী শিক্ষার্থী (৭৬.৫২%) এবং ৭৩% এর কাছাকাছি পুরুষ শিক্ষার্থী (৭২.৯০%) মারাত্মক মানসিক চাপে ভুগছেন। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের (পিটিএসডি) অবস্থা আরও করুণ; ৫৭.৫% নারী এবং ৪৮.৩১% পুরুষ শিক্ষার্থী গুরুতর পিটিএসডিতে আক্রান্ত। হতাশার দিক থেকে ৩৫.৪% নারী ও ২১.৬১% পুরুষ শিক্ষার্থী তীব্র বিষণ্নতায় ভুগছেন। তবে উদ্বেগের চিত্রটা সবচেয়ে বেশি ভয় ধরায় অর্থাৎ ৮৬.৭৩% পুরুষ এবং ৯২.৬৮% নারী শিক্ষার্থী গভীর উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যার মধ্যে ৭১.১২% নারী ও ৬৬.২৮% পুরুষ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ অতিমাত্রায় গুরুতর।
রাজনৈতিক ও সামাজিক এই ট্রমার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের রোজকার কাঠামোগত নানা সমস্যা শিক্ষার্থীদের জীবনকে আরও অতিষ্ঠ করে তুলছে। ২০২৬ সালে মানসিক স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান "বন্ধু" (BONDHU)-র উদ্যোগে পরিচালিত একটি বিস্তৃত গবেষণায় (মোর্শেদ, চৌধুরী, ভূঁইয়া, মরিয়ম, রিয়া, রাফি, আরজু, নুবায়রা, আক্তার, মনিরা, নাজ ও মাহমুদ, ২০২৬; "Socio-demographic Predictors of Depression among University Students in Bangladesh: Evidence from Regression Modeling") শিক্ষার্থীদের এই বিষণ্ণতা আর জঘন্য জীবনযাত্রার চিত্রটা আরও খোলামেলাভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। মোর্শেদ ও অন্যদের এই গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশের প্রায় ৭৪.২% বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ের বিষণ্ণতায় (Depression) ভুগছেন। এর চেয়েও আতঙ্কের বিষয় হলো, প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন (২৫.৮%) ক্যাম্পাসে আসার পর জীবনের কোনো না কোনো সময় নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার, অর্থাৎ আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন। অথচ ২২.৫% শিক্ষার্থী নিজেরা তীব্রভাবে অনুভব করছেন যে তাঁদের পেশাদার কাউন্সেলিং দরকার, কিন্তু লোকলজ্জা আর ভালো সুযোগের অভাবে তারা সেই সাহায্যটুকু পাচ্ছাই না।
শিক্ষার্থীদের এই মানসিক লড়াই শুধু মনের ভেতরেই আটকে নেই, তা তাঁদের শরীর আর দৈনন্দিন জীবনটাকেও তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। ভালো সিজিপিএ আর চাকরির বাজারে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় নেমে তরুণেরা নিজেদের শারীরিক ন্যূনতম চাহিদার কথা যেন ভুলেই গেছেন। মোর্শেদ ও অন্যদের গবেষণার উপাত্ত বলছে, দেশের ৫৫.২% শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাস্তাই করেন না, আর ২৫% শিক্ষার্থী দিনে তিন বেলা ঠিকমতো খাওয়ার সুযোগই পান না। এমনকি ৪৩.৮% শিক্ষার্থী বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু পানি খাওয়া দরকার (দিনে অন্তত দুই লিটার), ততটুকুও পান করছেন না। এই না খাইয়ে থাকা আর দৈনন্দিন নিয়মহীনতা তাঁদের মানসিক অবসাদকে আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাস্তব জীবনের এই চাপ, ট্রমা আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা থেকে একটু মুক্তি পেতে তরুণেরা আশ্রয় খুঁজছেন মোবাইলের স্ক্রিনে, যা সমস্যা কমানোর বদলে উল্টো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৪.৫% শিক্ষার্থী দিনে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পড়ে থাকেন। ঘুম থেকে ওঠার মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে মোবাইল হাতড়ান ৮৭.৪% শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ৫৪% চোখ মেলেই ডুবে যান স্ক্রিনের নীল আলোতে। তবে এই ভার্চুয়াল দুনিয়া তাঁদের বাস্তব মনের একাটা কাটাতে পারছে না, বরং রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখছে; ২২.৮% শিক্ষার্থী ভুগছেন তীব্র অনিদ্রায়।
একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের যান্ত্রিক পড়ালেখার চাপ কেড়ে নিচ্ছে তরুণদের স্বাভাবিক সৃজনশীলতা। তথ্য বলছে, মাত্র ২৬.৩% তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর তাঁদের প্রিয় শখটা টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। বাকি ৬৩.৫% শিক্ষার্থী ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে শখের চর্চা করতে পারছেন না, আর ১০.২% শিক্ষার্থীর জীবন থেকে 'শখ' শব্দটাই হাওয়া হয়ে গেছে। নোট আর পরীক্ষার জাঁতাকলে পড়ে ২৯.১% শিক্ষার্থী দিনে এক ঘণ্টাও নিজের পছন্দের কোনো বই পড়ার সময় পান না। এর ওপর আছে ক্যাম্পাসের অনিরাপত্তা ৩৫.১% শিক্ষার্থী তাঁদের নিজেদের ক্যাম্পাসে নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।
শারমিন ও মোর্শেদ (২০২৫) এবং মোর্শেদ ও অন্যদের (২০২৬) গবেষণায় প্রাপ্ত এসব পরিসংখ্যান কিন্তু নিছক কিছু সংখ্যা নয় এগুলো আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার গলদগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিচ্ছে। বিপ্লবের পর পাওয়া স্বাধীনতাকে যদি আসলেই অর্থবহ করতে হয়, তবে এই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
এই সংকট থেকে বের হতে হলে অবিলম্বে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও সংবেদনশীল কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে। একই সাথে আন্দোলন-পরবর্তী ট্রমা সামলাতে দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। কেবল জিপিএ আর ডিগ্রির পেছনে না ছুটিয়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কাজ আর মুক্তচিন্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ক্যাম্পাসে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। কারণ মনের যত্ন না নিলে কোনো নতুন বাংলাদেশই শেষ পর্যন্ত টিকবে না এই মানসিক নিরাময়ই হওয়া উচিত আমাদের পুনর্গঠনের মূল চাবিকাঠি।
লেখক: গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট