ক্যাম্পাসে সংঘাত ও আধিপত্যের রাজনীতি: ক্ষুণ্ণ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

মুহাম্মাদ ড. মুঈনুদ্দীন মৃধা

মুহাম্মাদ ড. মুঈনুদ্দীন মৃধা © টিডিসি সম্পাদিত

জুলাই বিপ্লবের পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে ছাত্ররাজনীতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, মিছিল-পাল্টা মিছিল এবং ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা যে শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানভিত্তিক পরিবেশ প্রত্যাশা করেছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকেই কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছিল। তবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষ করে রংপুর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদরাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের ঘটনাগুলো ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

৩ আগস্ট বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার আলোকচিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইসলামী ছাত্রশিবির। সেটাকে  কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। আয়োজকদের দাবি ছিল, তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি পালন করছিল। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত কিছু ব্যানার নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। বিষয়টি প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত—এমন মতও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। ছাত্রদল শিবিরের ঊপর হামলা করে। শুরু হয়  দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ এবং কিছু সময়ের জন্য সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। এতে, বেশ কিছু শিবির নেতা কর্মী আহত হয়। 

পরদিন ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা আবাসন, চিকিৎসাসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসংক্রান্ত দাবিসহ প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে ছাত্রদল বাধা দেয়। সেখান থেকে নিবার্চিত জিএস ও বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি কে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে।  এরপর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। একই দিনে সরকারি আলিয়া মাদরাসা ও ঢাকা কলেজেও  শিবিরের উপর হামলা করে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদলকে হামলা করতে দেখা যায়। আহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য থাকলেও  আহতদের আধিকাংশ শিবিরের নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে।

আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, আহত শিবির নেতা-কর্মীদের চিকিৎসাকেন্দ্রেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া মানবিক ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

৫ আগস্ট সংঘর্ষের বিস্তার ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, পাবনা ও বরিশালে সংঘর্ষের নিউজ পাওয়া যায়। কোথাও সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধ, কোথাও র‌্যালিতে বহিরাগত উপস্থিতির অভিযোগ, আবার কোথাও আলোচনা সভা পণ্ড হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে হল দখল, ভিন্নমত দমন ও শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠে। সেই অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে সহিংসতার সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসতে পারে।

যদিও ছাত্রদলের নেতারা দাবি করছেন, তারা ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে অবস্থান নিয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা  তাদের উপর হামলা করছে। এতে ছাত্রদলের সাথে নিষেধ ছাত্রলীগে একাত্রিত হয়ে হামলা করে। 

শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো মতের ভিন্নতা প্রকাশের জায়গা, সহিংসতার নয়। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান হতে হবে আলোচনা, বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কোনো ছাত্রসংগঠন যদি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ইতিমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফয়েজ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন—সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা দরকার।

২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা কোনো ছাত্রসংগঠনের জন্যই সহজ হবে না। এখনকার শিক্ষার্থীরা জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়া, হল নিয়ন্ত্রণ বা ভিন্নমত দমনের রাজনীতি সহজে মেনে নেবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর বিভিন্ন বিভাগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই পরিস্থিতি শান্ত করতে হলে প্রথমত, সব সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহিরাগত প্রবেশ ও শক্তি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল শক্তি হলো সহনশীলতা; সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হয়, অস্ত্র- লাঠি দিয়ে নয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন সংঘাত, দখলদারি ও দলীয় প্রভাবের ভার বহন করেছে। সাম্প্রতিক ইতিবাচক পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা যেন আবার সহিংসতার চক্রে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক ও মানবধিকার কর্মী, লন্ডন

সবধরণের ফুটবল থেকেই বিদায়ের ইঙ্গিত দিলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
ডাকসু ১১ মাসে যে কাজ করেছে, তা ১০৫ বছরেও হয়নি: সাদিক কায়েম
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
অ্যাকাউন্টস বিভাগে নিয়োগ দেবে এসএমসি
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
খুবিতে শুরু হয়েছে ২০তম নৈয়ায়িক আন্তঃডিসিপ্লিন বিতর্ক প্রতিয…
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
আশুলিয়ায় ৫ বছরের শিশু তাসিন হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
ক্যাম্পাসে সংঘাত ও আধিপত্যের রাজনীতি: ক্ষুণ্ণ হচ্ছে শিক্ষার…
  • ২১ আগস্ট ২০২৬