ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ: সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৬ PM , আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৮ PM
 এম এ মতিন

এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার বিশ্বে এখন সর্বোচ্চ। দেশের খেলাপি ঋণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর (২০২৪) শেষেও বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ২০ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি ছিল। এর মধ্যেই ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নজিরবিহীন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের যে হার, সেটি এখন গোটা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এমনকি কোনও দেশের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি পাওয়া যায়নি। গত কয়েক বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দায় থাকা দেশগুলোর খেলাপি ঋণের হারও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দেড় দশকে আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ার পাশাপাশি ঋণ গণনার নীতি পরিবর্তন, সুদহার বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে খেলাপি ঋণ এতটা বাড়তে পেরেছে। এখানে নিকট অতীতের ঋণ খেলাপির কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হল যেগুলো পাঠকের মনকে নাড়া দিবে বৈ কি? 

২০০৭ সালে উইকিলিকস কর্তৃক বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের একটি তারবার্তা প্রকাশ্যে আসে যাতে অভিযোগ করা হয় সালমান এফ রহমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণখেলাপি। ওই সময় তার নিকট বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা ছিল প্রায় ৫০,০০০ হাজার কোটি টাকা। ঋণখেলাপিদের ওপর ২০১০ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের ১২৫টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায় যে, ওই সব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকেরা তাদের ব্যাংকঋণের একটা বড়সড় অংশ বিদেশে পাচার করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক খাতে অন্যতম বড় ঋণ কেলেঙ্কারি ধরা পড়ে ২০১৩ সালে যখন হলমার্ক নামের একটি কোম্পানি সোনালী ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করে। পরে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক ইন্ধনে হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় দুদকের পক্ষ থেকে প্রায় ৪০টি মামলা দায়ের করা হয়।

এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ২ লক্ষ ২৫ হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটায়।
সিটি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৭ কোটি ৩ হাজার টাকা ঋণ নেন ফেরদৌস খান আলমগীর। এ টাকা আদায়ে ২০১২ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে ব্যাংকটি। পরে ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর গ্রেফতার হন তিনি।

ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংকে ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি ঋণের নামে আত্মসাৎ করে। যে ঘটনায় ক্রিসেন্ট গ্রুপের কর্ণধার এম এ কাদেরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে দুদক। জানা যায়, জনতা ব্যাংক থেকে শুধু ক্রিসেন্ট গ্রুপই নয়, অ্যাননটেক্স ও থারম্যাক্স গ্রুপ মিলেও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যায়। অ্যানন টেক্সের কর্ণধার ইউনুস বাদল আমদানির নামে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন।

২০১২ সালে বেসিক ব্যাংক থেকে খাদিজা অ্যান্ড সন্স, মেসার্স সিমেক্স লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জালিয়াতি করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এসব ঘটনায় মোট ৫৬টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে মাত্র দুটি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হলেও বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।

প্রায় ১২০০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপির জন্যে বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডিসহ ১২ জনের নামে রমনা থানায় ২০১৩ সালের ২৯ মার্চ মামলা করেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ইস্কাটন শাখার এক কর্মকর্তা। এ মামলায় ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর ব্যাংকটির তৎকালীন ডেপুটি ম্যানেজার ও জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট, ভাইস প্রেসিডেন্টসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এ মামলায় ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর দুজনকে বিচারিক আদালত জামিন দিলে সেই জামিন বাতিল চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাইকোর্টে আবেদন করে। পরে দুদকের উদ্দেশ্যে আদালত জানায়, ঋণখেলাপিরা আইনের চেয়ে শক্তিশালী নয়। তাহলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছে, আপনারা ধরছেন না কেন? যারা অর্থশালী তারা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে? দুদক রাঘববোয়ালদের নয়, শুধু চুনোপুঁটিদের ধরতে ব্যস্ত আছে।

প্রাইম ব্যাংকের লালদিঘী পাড় শাখা থেকে ৩১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় ন্যাশনাল আয়রনের মালিক হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাদি হয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। তিনি অপর একটি প্রতিষ্ঠান রুবাইয়া ভেজিটেবল অয়েল-এর নামে একই ব্যাংক থেকে ৩৯ কোটি টাকা ঋণ নেন। ঋণ পরিশোধ না করায় ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাদি হয়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা দুটি বর্তমানে সাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে।

এম অ্যান্ড জেড করপোরেশন-এর মালিক সৈয়দ জুনায়েদুল হক প্রাইম ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিলেও পরিশোধ করেনি। টাকা আদায়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালে মামলা দায়ের করলেও তা সাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট এলাকার মেসার্স আকতার এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটার মোহাম্মদ নূর উন নবীর বিরুদ্ধে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তিন মামলায় প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার মামলা দায়ের হয়।

২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ বছরেই ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন পি কে হালদার। তবে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর দুদক সে এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মোট ৩৪টি মামলা দায়ের করে।

অর্থঋণ আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার লঙ্ঘন করে চট্টগ্রামে উত্তরা ব্যাংক এক ঋণখেলাপির ৮৯ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করে শুধু মূল ৩৭ কোটি টাকা পাঁচ বছরে পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে বলে জানায় আদালত।

গোপালগঞ্জে গোবরা ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থী ১১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৪ টাকার ঋণখেলাপি করেও চেয়ারম্যানপ্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্ট থেকে জানা যায়। বিষয়টি জানজানি হওয়ার পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

এ সব ঋণ খেলাপিদের বিপরীতে যে ঘটনা বিবেকবানদের নাড়া দিয়েছে তা হলো - ঈশ্বরদী উপজেলার ৩৭ জন প্রান্তিক কৃষক সমবায় ব্যাংক থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার ঋণ গ্রহণের ঘটনা। জানা গিয়েছে -  ঋণ শোধ করার পরও তা পরিশোধ না দেখিয়ে ঋণখেলাপির মামলা দায়ের এবং সেই সূত্রে গ্রেফতারের অভিযোগ উঠে। ১২ জন কৃষককে এজন্য জেলহাজতে পাঠায় আদালত। বাকি ২৫ জন কৃষক গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। মামলার সূত্রানুযায়ী সমবায় ব্যাংক ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছিল ৩৭ কৃষককে। এ ঋণ পরিশোধ না করায় ২০২১ সালে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কৃষকদের হয়রানি বন্ধ করে বড় বড় ঋণখেলাপিকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের শত শত কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে, বড় বড় ঋণখেলাপি জনগণের টাকা মেরে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর অল্প কিছু টাকার জন্য পাবনার ঈশ্বরদীতে কৃষকদের জেলে পাঠানো হয়।  সিপিবি আরেক বিবৃতিতে জানায়, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয় ছাড়া টাকা পাচার, ব্যাংক লোন, ঋণখেলাপির নামে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটতে পারে না।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেশের ২০ শীর্ষ ঋণ খেলাপির নাম প্রকাশ করেছেন। এই ২০ টি কোম্পানির মধ্যে ৫ টিই হলো এস আলমের মালিকানাধীন কোম্পানী। কোম্পানীগুলো হলোঃ 
এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড এবং এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো), গ্লোবাল ট্রেডিং কারপারেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, ইনফাইনাইট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়াৰা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়াৰা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (সিটিসেল), কর্ণফুলী ফুডস প্রাইভেট লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড। এদের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ঙ্কোটি টাকা।

ব্যাংক যে টাকা ঋণ খেলাপিদের ধার দিয়েছে এই টাকা কার?
এই টাকা সাধারণ আমানতকারীদের।এই টাকা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, বেতন এবং বিভিন্ন ডিপিএস বা স্থায়ী আমানতের টাকা। এই টাকা ছোটবড় বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের। বিভিন্ন কোম্পানির চলতি হিসাবে জমা থাকা দৈনন্দিন লেনদেনের অর্থ। রয়েছে ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন যা ব্যাংকের মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ করা নিজস্ব মূলধন এবং আগের জমানো মুনাফা। ব্যাংক ব্যবস্থা মূলত সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের আমানত গ্রহণ এবং সেই অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণের মাধ্যমে লাভজনকভাবে পরিচালিত হয়। ব্যাংক যে টাকা ধার দেয় তা মূলত দেশের সাধারণ আমানতকারী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে জমা রাখা টাকা। 

সুতরাং ব্যাংকের উপর উপর সাধারণ গ্রাহকদের অধিকার রয়েছে। ব্যাংক কোম্পানী আইনে এই অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে যখন ব্যাংক লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং গ্রাহকের জমানো টাকা ফেরত দিতে অপারগ হয় তখন ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতি তৈরি হয় এবং দেশের অর্থ ব্যবস্থার ‘রক্ত প্রবাহ’ ব্লাড স্ট্রিম’ বলে পরিচিত ‘ব্যাংক আমানতের’ (Bank Deposit) এর ঘাটতি তৈরি হয়। ফলত নগদ অর্ট প্রবাহের (Liquidity crisi) সমস্যা দেখস দেয়। যেমনটা দেখা যাচ্ছে দেশের  ব্যাক্তি মালিকনাধীন যে ৫ টি ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক (এক্সিম, ইউসিবি, ফার্ষ্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকও ফার্মার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক) এর ক্ষেত্রে। এই ব্যাংকগুলোর গ্রাহকগণ নিজের কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে ব্যাংকের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে আজ নিজ প্রয়োজনে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। 

যাদের কারণে গ্রাহকদের এই দুর্ভোগ তারা কি দেশের আইনের ঊর্ধ্বে? 
বাংলাদেশের ব্যাংকিং আইনে (প্রধানত ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১) ঋণখেলাপি রোধ, তাদের চিহ্নিতকরণ এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, 

ঋণখেলাপি: নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ঋণের কিস্তি বা সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কোনো ঋণগ্রহীতা খেলাপি হিসেবে গণ্য হন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী ঋণের স্থবিরতার সময়কালভেদে একে সাব-স্ট্যান্ডার্ড, ডাউটফুল এবং ব্যাড/লস হিসেবে শ্রেণিকৃত করা হয়। 

ইচ্ছাকৃত খেলাপি: ব্যাংক-কোম্পানী আইনে ইচ্ছাকৃত বা উইলফুল খেলাপিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার বিধান রয়েছে—যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ না করা, তহবিলের অপব্যবহার বা জালিয়াতি করার প্রমাণ থাকে। 

আইনি নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তি
নতুন ঋণ ও লাইসেন্স প্রাপ্তিতে নিষেধাজ্ঞা: খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নতুন করে কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষিত হন। এছাড়া খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন লাইসেন্স বা ব্যবসা পরিচালনায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। 

কোম্পানির পরিচালক পদে অযোগ্যতা: কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের কেউ ঋণখেলাপি হলে তিনি কোনো ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালক পদে থাকতে পারেন না বা নতুন করে পরিচালক হতে পারেন না। 

ভোট বা নির্বাচন সংক্রান্ত অযোগ্যতা: সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিরা আইনগতভাবে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। 
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও আইনি ব্যবস্থা: ঋণ আদায়ে অর্থ ঋণ আদালত আইন অনুযায়ী খেলাপিদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা ও সম্পত্তি নিলাম বা বাজেয়াপ্ত করার আইনি ক্ষমতা ব্যাংকের রয়েছে।

ঋণ খেলাপি সংকট কেন সৃষ্টি হয়? 
সমসাময়িক অর্থনীতিবিদগণ এর কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এর মধ্যে ছয়টি কারণ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সেগুলো হলোঃ অদক্ষ ও অসৎ ব্যাংকের শাখা কর্মকর্তা ও কর্মচারী, খেলাপিগ্রাহক, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অদূরদর্শিতা, রাজনৈতিক বিবেচনা, আইনগত দুর্বলতা ও সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এসব কারণেই দেশে আজ দিন দিন ঋণখেলাপি বেড়ে চলেছে। কিন্তু এর কোনো স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হচ্ছে না। 

১। শাখা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা
ঋণ খেলাপির জন্যে প্রাথমিক পর্যায়ে দায়ী হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা কর্তৃপক্ষ। কারণ – যে কোন ঋণের প্রস্তাব তৈরি ও প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করে শাখা কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশেনা রয়েছে। এ সকল নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে এবং শাখা কর্মকর্তাগণ নিজেদের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হলে এবং বাইরের যে কোনো চাপের কাছে মাথানত না করলে প্রদত্ত ঋণ খেলাপি হওয়ার কথা নয়। ঋণখেলাপি সৃষ্টির পেছনে ব্যাংক কর্তৃপক্ষেরও দায় কম নেই। তারা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ দিয়ে দেয়। গ্রাহক থেকে তারা পর্যাপ্ত জামানতও রাখে না। এছাড়া ব্যাংগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যে কে কার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করতে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, ব্যাপকভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ প্রদান, ঋণের টাকা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ না করা এবং সুদ ও ঋণভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনার কারণেও খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়।

২। খেলাপি গ্রাহক
ঋণখেলাপি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে খেলাপি গ্রাহক। এর কারণ হলো, দেশে এমনভাবে নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে যে মানুষের মাঝে এখন ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেয়ার মানসিকতাই শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া গৃহীত ঋণকে অনৈতিক খাতে বিনিয়োগ, ঋণ দিয়ে ব্যবসা না করে স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ, আর্থিক বিষয়ে জ্ঞানের অভাব ও হালাল-হারামের জ্ঞান না থাকার কারণে তারা ঋণ ফেরত দেয় না।

৩। কেন্দ্রীয় ব্যাংক
দেশে ঋণখেলাপি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও দায় আছে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বই হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরে সঠিক প্রক্রিয়ায় ঋণ বা বিনিয়োগ বিতরণ হচ্ছে কিনা, সঠিকভাবে তা উসুল হচ্ছে, এসব বিষয়ে তদারকি করা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। উল্টো আরো খেলাপিঋণ নীতিমালা শিথিল করেছে। ঋণ পুনঃতফসিল নীতি, অবলোপন নীতি, খেলাপি ঋণের সময়সীমা বাড়ানো ইত্যাদি নানা উপায়ে কেবল শিথিলতাই প্রদর্শন করেছে। অথচ তাদের দায়িত্ব ছিল এসব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সেজন্য গ্রাহকরা খেলাপিতে উৎসাহিত হয়েছে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্বার্থে খেলাপিঋণ শিথিল করা, রাজনৈতিক স্বার্থকে মূল্যায়ন করা এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থায় না নেয়ায় দিন দিন খেলাপি বেড়েই চলেছে।

৪। রাজনৈতিক বিবেচনা
ঋণখেলাপি সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও অন্যতম প্রধান দায়ী। কারণ, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় বসে জনতার আমানত সুরক্ষা না করে তা লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত করে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমনও সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যা বাস্তবে জনতার স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সমর্থন প্রদান করে। এতে রাজনৈতিক আশ্রয়েই অনেক ঋণ খেলাপি সৃষ্টি হয়। তখন রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

৫। আইনগত দুর্বলতা
দেশে ঋণখেলাপি সৃষ্টির পেছনে আইনগত দুর্বলতাও অনেকাংশে দায়ী। যেকোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা হয় চোরাই পথ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু ঋণখেলাপির আইনের মাধ্যমে ঋণখেলাপি তো বন্ধই হয় না। উল্টো ঋণখেলাপির অবারিত সুযোগ করে দেয়। অবলোপননীতি, ঋণ পুনঃতফসিলকরণ ইত্যাকার নিয়ম এর একেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এছাড়া ব্যাংক পরিচালক সংক্রান্ত নীতি ও আইনেও রয়েছে এর দুর্বলতা। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ২০ বা তারও অধিক পরিচালক রয়েছে। সেখানে স্বতন্ত্র বা আমানতকারীদের পক্ষ থেকে মাত্র তিনজন পরিচালক থাকেন। এতে সিন্ডিকেট তৈরি করে ঋণ খেলাপি করা সহজ হয়ে দাঁড়ায়। 

খেলাপি ঋণ প্রতিরোধ ও হ্রাসের জন্যে নানাবিদ পরিকল্পনার কথা বলা হয়। এগুলোর মধ্যে নিম্নোল্লিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারেঃ  
১। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা (০-৬ মাস): দ্রুত সমাধান ও চাপ তৈরি
- ঋণ পুনরুদ্ধার অভিযান: প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মাসিক আদায়ের টার্গেট নির্ধারণ করে শীর্ষ ১০০ খেলাপির তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭(ক) ধারা (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) জারির প্রক্রিয়া শুরু করা।
- এককালীন প্রণোদনা: যারা স্বেচ্ছায় ৫০%-এর বেশি ঋণ পরিশোধ করবে, তাদের বাকি অংশে সুদ মওকুফ ও জরিমানা মাফের সুযোগ দেওয়া (শুধুমাত্র ৩ মাসের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে) ।
- তথ্য কেন্দ্র জোরদার করা: সিবিএ (CIP) রিপোর্ট হালনাগাদ করে নতুন ঋণ দেওয়ার আগে গ্রহীতার পরিবার, কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব ঋণ পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা।
- অনলাইন সম্পদ ট্র্যাকিং: জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিন নম্বরের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব, গাড়ি ও জমি ক্রয়–বিক্রয়ের অনলাইন সংযোগ ঘটিয়ে খেলাপিদের অপ্রদর্শিত সম্পদ শনাক্ত করা।

২। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (৬ মাস–২ বছর): কাঠামোগত সংস্কার
- স্বতন্ত্র ঋণ আদায় সংস্থা (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি): রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋন সম্পত্তি কিনে নিয়ে তা নিলামে বিক্রির জন্য একটি পেশাদার সংস্থা গঠন। (ভারতের 'ARC' মডেল অনুসরণীয়)।
- বিশেষ ট্রাইব্যুনালের গতি বৃদ্ধি: ঋণ আদালতের ডিজিটাল পোর্টাল তৈরি করে প্রতিটি মামলার অবস্থা অনলাইনে দেখানো এবং নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ ১২০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ।
- ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক: প্রতিটি ব্যাংকের ঋণ কমিটিতে অর্থনীতিবিদ ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগ, যারা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে প্রযুক্তিগত মানেই ঋণ অনুমোদন দেবেন।
    - ঋণ পুনঃতফসিলের নিয়ম কঠোর করা: কেবল প্রকৃত সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পুনঃতফসিল, বারবার একই সুযোগ দেওয়া বন্ধ।

৩। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (২-৫ বছর): আচরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন
- জাতীয় ক্রেডিট সংস্কৃতি পরিবর্তন: স্কুল-কলেজে আর্থিক সাক্ষরতা পাঠ্যসূচি চালু, যাতে ঋণ শোধের দায়িত্ববোধ শিশুবেলা থেকেই গড়ে ওঠে।
- "সু-ঋণগ্রাহীতা" ব্যাংকিং: ৫ বছর ধরে নিয়মিত ঋণ শোধকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করপোরেট কর ছাড়, সরকারি ক্রয়তালিকায় অগ্রাধিকার এবং রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা।
-  ব্যাংক একীভূতকরণ ও পুনর্গঠন: দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সাথে শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকের মার্জার (যদি সম্ভব) অথবা তাদের কার্যক্রম সীমিত করে শুধুমাত্র কৃষি ও এসএমই খাতে সীমাবদ্ধ রাখা।
-  বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): আদালতের বাইরে চুক্তির মাধ্যমে ঋণ পুনর্গঠনের জন্য স্থায়ী মধ্যস্থতা বোর্ড গঠন, যা দ্রুত ও মিতব্যয়ী।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

ট্যাগ: মতামত
৬ দাবির পর ৪ দাবি নিয়ে ফের উপাচার্যের কাছে পাবিপ্রবি ছাত্রদল
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সীতাকুণ্ডে সংঘর্ষ ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উগ্রবাদ-অসহিষ্ণুতা সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষণার আহ্বান ইউজ…
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইনে ইলিশ বিক্রির নামে প্রতারণা, নড়াইল থেকে আরও ৪ জন গ্…
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একযোগে ১০ এএসপিকে বদলি, প্রজ্ঞাপন জারি
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সূর্যের হাসি ক্লিনিকে চাকরি, আবেদন ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
  • ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9