স্বপ্ন থেকে সাফল্যে: পাবিপ্রবি নিয়ে উপাচার্যের আগামীর পরিকল্পনা

১৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:১২ PM
লেখক ও উপাচার্য

লেখক ও উপাচার্য © টিডিসি সম্পাদিত

প্রারম্ভিক কথা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ সাধন এবং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৮ সালের ৫ জুন ৩০ একর জায়গার ওপর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) যাত্রা শুরু করে। উচ্চশিক্ষায় এদেশের মানুষকে সমৃদ্ধ করার জন্য ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১০৫ বছরে বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক এবং ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এক সময়ের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত উত্তরাঞ্চলের মানুষকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। 

পাবনা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে রাজাপুর নামক স্থানে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) গণিত এবং ব্যবসায় প্রশাসন এই চারটি বিভাগ, ১৮০ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক এবং ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। 

এখন যা আছে
বর্তমানে ২১৩ জন শিক্ষক, ১৭৩ জন কর্মকর্তা এবং ১৫৮ জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন প্রায় ৬ হাজার। প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলক নবীন হলেও শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে আগাচ্ছে।

বর্তমানে ৫টি অনুষদের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি বিভাগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভাগগুলো: বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, ফার্মেসি, রসায়ন, ও পরিসংখ্যান বিভাগ; প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্য এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ; ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবসায় প্রশাসন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ; মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে অর্থনীতি, বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, লোকপ্রশাসন এবং ইতিহাস বিভাগ আর জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ। ২০২৫ সালে ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন অ্যান্ড অন্টোপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট নামে ১টি ইনস্টিটিউট, রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজি ট্রান্সফার সেল ও সেল ফর ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন নামে ২টি সেল গঠন করা হয়।

আরও পড়ুন: ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ: সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

আছে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো
বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরাতন অ্যাকাডেমিক ভবনসহ ১২তলা দুটি অ্যাকাডেমিক ভবন, ১০তলা প্রশাসনিক ভবন, চারটি হল, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, আনন্দ সরোবর নামে দৃষ্টিনন্দন একটি লেক, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কনভেনশন হল, শিক্ষক-কর্মকর্তা ক্লাব, টিএসসি ভবন, ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় মসজিদ, মন্দির, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন, আধুনিক কনফারেন্স ভবন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যানবাহন ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক একটি ভিডিও কনফারেন্স রুম, স্বাধীনতা চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ নানা স্থাপনা। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের দ্বারা বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক সংগঠন ও ক্লাব গড়ে উঠেছে। পাবিপ্রবিতে আছে ‘পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব’।

বিশ্ববিদ্যালয়টি এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পাবনার অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এর আশেপাশে দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি ও উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এই এলাকায় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং যোগাযোগসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি হয়েছে। 
উপাচার্যের ভাবনা ও আগামী দিনের পরিকল্পনা: সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) স্কুল অব এগ্রিকালচাল অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (এসএআরডি)-এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও কোষাধ্যক্ষ ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম। সম্প্রতি এ বছরের ১৬ মে তিনি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি মানবিক, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা, গবেষণা, ইনোভেশন ও সমাজসেবার হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাজারের চাহিদাসম্পন্ন বিভাগ খোলা হবে। শিক্ষার্থীদেরকে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নিজস্ব সংস্কৃতিতে উৎসাহিত করা হবে। সেই সাথে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হবে। সর্বত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মুক্ত চিন্তার জায়গা। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও ইতিবাচক ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে আমরা কাজ করব। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হবে। এর জন্য বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা, ক্যারিয়ার নেটওয়ার্কিং এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে।

শিক্ষার মান বাড়াতে গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় পাবিপ্রবিকে সবুজ ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলা হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বোপরি, পাবনাবাসীর সহায়তায় বিশ^বিদ্যালয়কে আরও সুন্দরভাবে গড়ে তোলা হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। তিনি আরও যোগ করে বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ করা হবে। গুণগত শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের এমন আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে; যেখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তির সান্নিধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

একটি আধুনক ক্যাম্পাস গড়ে তোলার জন্য আরও জমি অধিগ্রহণ করা হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই স্থান বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আধুনিক ও গুণগত মানসম্পন্ন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কমপক্ষে ১০০ একর জায়গা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরও ৪৫ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান আছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড আরও বেশি উৎসাহিত করা হবে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রম অতীব জরুরি। আমাদের সম্পদ সীমিত, সেটাকে সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজে লাগিয়ে সুফল পেতে হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিক্ষা ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলার জন্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আছে কিছু সমস্যা
তিনি বেশকিছু অসুবিধার কথাও বলেন, আমাদের শিক্ষক স্বল্পতা আছে, শুধুমাত্র একটি খেলার মাঠ বাদে উন্মুক্ত জায়গা নেই, মেডিকেল সেন্টারে সুযোগ সুবিধা অপ্রতুল, আইটি সুযোগ কম। এ ছাড়াও অন্যান্য ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধান করার চেষ্টা করব। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করেছে কিন্তু এখনো সমাবর্তন করা যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে আমরা কাজ করছি এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আয়োজন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শেষ কথা
একদল তরুণ মেধাবী জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পর্যায়ক্রমে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থান করে নিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার সুনাম অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানের উজ্জ্বল এক মানদণ্ডে পৌঁছাবে এই প্রত্যাশা।

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ: মতামত
সরকারের ১৮০ দিন: শিক্ষায় একগুচ্ছ উদ্যোগের কথা জানালেন শিক্ষ…
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
দেশে আরও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলের ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলের দাবি ৭৪ ব…
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
‘কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের ভাইভা’
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
স্বপ্ন থেকে সাফল্যে: পাবিপ্রবি নিয়ে উপাচার্যের আগামীর পরিকল…
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ভর্তি নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
  • ১৭ আগস্ট ২০২৬
nextjobzimage