অধ্যাপক ড. মোঃ আখতার হোসেন খান © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (BAC) নামটি পরিচিত হলেও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনও জানেন না BAC কী, কেন এর প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতে এর ভূমিকা কী হতে পারে। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক প্রোগ্রামের শিক্ষার মান, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ গভীরভাবে সম্পর্কিত। সহজভাবে বললে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা তার কোনো একাডেমিক প্রোগ্রাম নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী চলছে কি না, শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে কি না এবং প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে নিজের মান উন্নত করছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের জাতীয় ব্যবস্থাই হলো অ্যাক্রেডিটেশন। আর এই জায়গাতেই বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের গুরুত্ব।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, নতুন নতুন বিষয় ও প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ এখন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই বিস্তারের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে এসেছে- আমরা কি শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াচ্ছি, নাকি একই সঙ্গে শিক্ষার মানও নিশ্চিত করতে পারছি? এই প্রশ্নটি এখন আর শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন নয়। এটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিদাতা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রেরও প্রশ্ন। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো বা কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রশ্ন হলো তারা কী শিখল, কী দক্ষতা অর্জন করল এবং সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে তারা কতটা অবদান রাখতে পারল।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। সেই প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৭ প্রণয়ন করা হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। অ্যাক্রেডিটেশন শব্দটি অনেকের কাছে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি আসলে খুব সহজ। ধরা যাক, একটি বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করছে যে তার একটি নির্দিষ্ট একাডেমিক প্রোগ্রাম মানসম্পন্ন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে কীভাবে এই মান নির্ধারিত হলো? সেখানে কি পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক রয়েছেন? কারিকুলাম কি সময়োপযোগী? শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আছে কি? শিক্ষাদান পদ্ধতি কতটা কার্যকর? পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা যথাযথ কিনা? গবেষণার সুযোগ কেমন? শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত কী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছে?
অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া মূলত এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কাজ শুধু একটি সনদ দেওয়া নয়। এর বৃহত্তর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় গুণগত মানের একটি স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করা। অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক প্রোগ্রাম প্রথমে নিজের কার্যক্রম ও সক্ষমতা মূল্যায়ন করে। একে বলা হয় Self-Assessment বা স্ব-মূল্যায়ন। এরপর নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বাহ্যিক মূল্যায়ন করা হয়। এসব মূল্যায়ন ও তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে অ্যাক্রেডিটেশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অর্থাৎ এটি মূলত একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া-নিজেকে জানা→দুর্বলতা চিহ্নিত করা→উন্নয়নের পরিকল্পনা করা→বাস্তবায়ন করা→আবার মূল্যায়ন করা।
এ কারণেই অ্যাক্রেডিটেশনকে কোনো এককালীন পরীক্ষা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি মূলত ধারাবাহিক মানোন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। অ্যাক্রেডিটেশনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিজেদের আরও উন্নত করার একটি সুযোগ। একটি আয়নার কথা ভাবা যেতে পারে। আয়না কারও সৌন্দর্য তৈরি করে না; শুধু বাস্তব চিত্রটি দেখায়। কোথায় ভালো, কোথায় ঘাটতি তা দেখার সুযোগ দেয়।
অ্যাক্রেডিটেশনও অনেকটাই তেমন। এর উদ্দেশ্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে ছোট করা নয়; বরং একটি প্রতিষ্ঠানকে তার নিজস্ব সম্ভাবনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করা।
অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হওয়ার কথা শিক্ষার্থীদের। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন সে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য কয়েক বছর সময় ব্যয় করে না; সে তার ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করে। অভিভাবকরাও সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের জন্য অর্থ ও সময় ব্যয় করেন। তাই তাদের জানার অধিকার রয়েছে তারা যে প্রতিষ্ঠানে পড়ছে, সেখানে শিক্ষার মান কেমন।
একটি মানসম্পন্ন একাডেমিক প্রোগ্রামের অর্থ হলো যোগ্য শিক্ষক, যুগোপযোগী কারিকুলাম, কার্যকর শিক্ষাদান, যথাযথ মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের প্রতি গুরুত্ব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা, যারা শুধু একটি সার্টিফিকেট নিয়ে বের হবে না; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।
বর্তমান বিশ্বে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। চাকরির বাজারে প্রয়োজন দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও শিক্ষাদান পদ্ধতিকে কর্মবাজারের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি। অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া একাডেমিক প্রোগ্রামের শিক্ষার ফলাফল, কারিকুলাম, শিক্ষাদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়। এর ফলে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মজগতের মধ্যে সম্পর্ক আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষা কোনো দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, শিক্ষক ও গবেষকরা আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশ নিচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে এবং বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারেও প্রবেশ করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এখন সময়ের দাবি। এখানেই BAC-এর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব। একটি শক্তিশালী জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গুণগত মান নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করে কিংবা একজন বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট যখন আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে প্রবেশ করতে চায়, তখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা এই আস্থা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ক্রেডিট ট্রান্সফার, যৌথ শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু BAC-এর নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তরিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে অ্যাক্রেডিটেশনকে কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা পরীক্ষা হিসেবে না দেখে নিজেদের উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের Institutional Quality Assurance Cell (IQAC) কে আরও কার্যকর করতে হবে। তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা, কারিকুলাম আধুনিকীকরণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশাসন এবং শিল্প ও কর্মজগতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Quality Assurance বা গুণগত মান নিশ্চয়তাকে কাগজে- কলমের একটি প্রক্রিয়া না বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন একাডেমিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, অ্যাক্রেডিটেশন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নয়। এটি উন্নয়নের একটি হাতিয়ার। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার কোনো দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারে, সেটিই তার জন্য উন্নতির প্রথম সুযোগ। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়; শুধু বেশি গ্র্যাজুয়েট নয়, দক্ষ গ্র্যাজুয়েট; শুধু জাতীয় স্বীকৃতি নয়, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল হয়তো এখনও দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তার মান নিয়ে আমি গর্বিত। আমরা এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যাদের ডিগ্রি শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বিশ্বদরবারেও সম্মানের সঙ্গে বিবেচিত হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে উচ্চশিক্ষা হবে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নৈতিকতার শক্তিশালী ভিত্তি। এই লক্ষ্য অর্জনের যাত্রায় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল