এম এ মতিন © টিডিসি সম্পাদিত
দেশে শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা কেন বলা হচ্ছে? দেশের শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থা কি ঈপ্সিত পর্যায়ে নেই? শিক্ষা নিয়ে দেশবাসী ও সরকার কি বিব্রত? স্বাধীনতা অর্জনের বিগত ৫৪ বছরে এত শিক্ষা কমিশন গঠন ও তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষা সংস্কারের কাজ কতটা সফল হয়েছে? গুণগত শিক্ষা প্রদানে আমরা কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি? তিন স্তরের (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কী? শিক্ষায় অনুদান প্রদানকারী প্রথম সারির উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ –এর মূল্যায়নে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলংকার চেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫ম শ্রেণি পাশ একজন ছাত্র বিজ্ঞান, গণিত ও ভাষা বিষয়ে যা জানে – শ্রীলংকা কিংবা ভারতের ৩য় শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীরা তার চেয়ে ভালো জানে। এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এতে মোট সাত লাখ প্রার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮,৫৭,৩৪৪ জন। অকৃতকার্যের হার পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ।
এবারের সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পরিসংখ্য্যান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি জলজ্যান্ত সতর্ক সংকেত। এই সংকেত আমাদের চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার দৈন্যদশা! বিগত ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জাতীয় গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮.৮৩ শতাংশে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের রেকর্ড। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ৫ লাখ ৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। বিগত উচ্চমাধ্যমিক (HSC) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে একটি বড় ধরনের ফল বিপর্যয় বা পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ব্যাপক পতন লক্ষ করা গেছে। তদুপরি আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতার যে পরাকাষ্ঠা তা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেও অনুমান করতে পারি, যেখানে শতকরা মাত্র ১০ জন পাশ করে ও ৯০ জন ফেল করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় আজ অব্দি বিশ্বের ৫০০ উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি। এই বৈশ্বিক র্যাংকিং এ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যলয় না আসতে পারাকে উচ্চশিক্ষার বিরাট ঘাটতি বলে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন। যদিও দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় উল্লিখিত বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং তালিকায় প্রতি বছর স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়। অথচ ১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সরকারি ও বেসরকারি) এক বিরাট বহর এর খরচ বহন করে চলছে এই দেশের সাধারণ মানুষ যেগুলো থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। আর আমাদের শিল্পমালিক উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা তাঁদের প্রতিষ্ঠান চালাতে উপযুক্ত কর্মী দেশে খুঁজে পাচ্ছেন না। কর্মকর্তা ভাড়া করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। আর বিরাট অংকের বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে বিদেশে!
শিক্ষার এহেন দুরবস্থার মধ্যে বি এন পি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। অতিবাহিত হতে চলেছে প্রায় ৯ মাস। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সচেতন অংশ আশা করেছিলেন যে, বি এন পি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর শিক্ষার সকল স্তরে বিদ্যমান সংকট, সমস্যার আদ্যোপান্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্যে দেশি-বিদেশি (ডায়াস্পোরা) বিজ্ঞ পন্ডিতজনদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি/কমিশন গঠন করবেন এবং ঐ কমিটি/কমিশনের সদস্যগণ দেশে বিদ্যমান শিক্ষার উপরোল্লিখিত সমস্যাবলী মোকাবেয়ায় সক্ষম একটি শিক্ষানীতি/শিক্ষা আইন প্রণয়ন করবেন, যা মহান সংসদে বিস্তারিত আলাপ আলোচনার পর অনুমোদির হবে এবং তৎপর শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করবে।
কিন্তু বিগত ৮ মাসে আমরা যা দেখলাম তাতে হতাশ না হয়ে উপায় নেই। আমরা দেখলাম, বিজ্ঞ কমিটি/কমিশন প্রণীত সিদ্ধান্ত/সিদ্ধান্তাবলী বাস্তবায়নের পরিবর্তে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এর বাইরের বিশিষ্ট ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন মতামত দিয়ে চলেছেন।
উদাহরণতঃ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী (২১ -২২ আগস্ট ২০২৬) ‘ভাইস চ্যান্সেলর’স ডায়ালগ অন শেপিং দি ফিউচার অব হাইয়ার এডুকেশন’ শীর্ষক সন্মেলনের আলোচনায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উচ্চশিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নতুন বিভাগ ও বিষয় চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন একইসঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সুপারিশ না করার জন্য তিনি ইউজিসি চেয়ারম্যানেকে পরামর্শ দেন।
একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন বিষয়বস্তু যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী ছাড়া দেশের অগ্রগতি টেকসই হবে না। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থসামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী স্নাতক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. মাহদী আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ভাষা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে।
তিনি শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উচ্চশিক্ষার মানোণ্ণয়নে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইকোসিস্টেম হাব, ইঙ্কিউবেশন সেন্টার এবং সমন্বিত স্টারট-আপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায় সরকার।
অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে (২২-০৮-২০২৬) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি তার ভাষণে বলেন, ‘দেশের মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুজে বের করা হবে এবং সেগুলো বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অবশ্য তিনি দেশে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে অচিরেই একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যলয় প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে জানান।
এর আগে (১৭-০৮-২০২৬) শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত বসিলার ফিরোজা বাশার আইডিয়েল স্কুল ও কলেজে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের এক সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার বক্তৃতায় বলেন, বসিলায় একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর নির্বিচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও এ অতিসম্প্রতি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।
এ ছাড়া দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংসদ সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেছেন, প্রতিটি সংসদীয় আসনে দুটি করে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হবে এবং শিক্ষার মান ক্যাডেট কলেজের সমপর্যায়ে রাখার লক্ষ্য থাকবে।
লক্ষণীয়, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী নূতন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না দেয়ার জন্যে ইউ জি কে উপদেশ দিয়েছেন। অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রী দেশে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলছেন। আর এক মন্ত্রী স্থান উল্লেখ করে নূতন আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন।আর একজন সংসদ সদস্য দেশে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ কলেজ স্থাপনের কথা বলেছেন। এমনটি হতো না যদি দেশে শিক্ষা বিষয়ক একটি কমিশন কার্যকর থাকতো। কেননা, শিক্ষা বিষয়ে এ ধরণের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতো ঐ কমিশনের।
এরই মধ্যে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত ২৮ জুলাই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন এবং একটি পর্যালোচনা সভায় অংশ নেন। এতে তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষক দক্ষতা ও শিক্ষা খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উন্মুক্ত মতামত ও প্রস্তাবনা দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়ন, আকর্ষণীয় পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ১৫ দফা অনুশাসন বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে শিক্ষা প্রশাসন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কর্মপরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন চালু, মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত, প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে পাঠদান তদারকি, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পদক ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো এবং ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন
১. শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো।
২. শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন এবং শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কাজ থেকে মুক্ত রাখা।
৩. শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন।
৪. দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীরা যেন সেরা শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে ডেডিকেটেড ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই।
৫. প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান অনলাইনে তদারক করা।
৬. শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন।
৭. ডেডিকেটেড প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত ভবন শিক্ষক প্রশিক্ষণে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই।
৮. গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ এবং শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৯. ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শিক্ষকদের পদক ও পুরস্কারের মাধ্যমে পাঠদান ও নেতৃত্বগুণ বিকাশে উৎসাহিত করা।
১০. শ্রমবাজারের চাহিদা এবং শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য ও আগ্রহ অনুযায়ী কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো।
১১. শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে কেন্দ্রীয় গবেষণা ডাটাবেজ গড়ে তোলা এবং স্থানীয় চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া।
১২. শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে আকর্ষণীয়ভাবে পাঠদান করছেন কি না, তা নিশ্চিত করা।
১৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া।
১৪. প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, যাতে শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
১৫. প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ভালো চর্চা ও সফল অভিজ্ঞতা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে শিক্ষকদের ‘এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের’ ব্যবস্থা করা।
|
মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। সম্প্রতি একটি বৈঠক করে প্রতিটি উইংকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। চলমান কাজসহ একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর এই ১৫ দফা শিক্ষা বিষয়ক অনুশাসন বাংলাদেশের সকল স্তরের শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনয়ন করতে সক্ষম হবে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার যে ফল বিপর্যয় আমারা দেখেছি জাতি তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তবে অতীতের ফ্যাসিষ্ট আমলের মত যেন না হয়। যেখানে পরীক্ষকদের বোর্ড অফিসে ডেকে এনে নম্বর বাড়িয়ে নেয়া হতো আর পাশের হার দেখানো হতো আকাশচুম্বী। এই নির্দেশনার মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের ৪৫ হাজার পদ অচিরেই পূরণ হবে। সেই সাথে প্রধান শিক্ষকের ৩৪, ১৫৯ টি শূন্য পদ। উল্লেখ্য, দেশের অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের সমন্বয় এবং সামগ্রিক একাডেমিক নেতৃত্বে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি। এ ছাড়া এবতেদায়ী মাদ্রাসার ৯,১১৪ টি শিক্ষক পদের মধ্যে খালি পড়ে থাকা ২,৬০০ পদ অচিরেই পূরণ হবে। উন্নয়ন সহযোগীরা যেন এ কথা বলতে না পারেন যে, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে নিচে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোর মধ্যে নামীদামি, ঐতিহ্যবাহী অন্তত ২/৪টি বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি, বুয়েট, বি এ ইউ) বৈশ্বিক র্যাংকিং এ ৫০০ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে এই অনুশাসন অনুপ্রেণা যোগাবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে সক্ষম হবে যাতে তারা আমাদের শিল্পপতি/উদ্যোক্তাদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হন এবং বাইরে থেকে লোক আমদানি করতে না হয়। |
|
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইলঃ [email protected]