অধ্যাপক ড. মো: হাছান উদ্দীন © টিডিসি সম্পাদিত
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক স্টার্টআপ ও ক্রিয়েটর ইকোনোমি দ্রুত কোটি কোটি ডলারের আয় করছে; একই সুযোগ বাংলাদেশেও আছে, কিন্তু আমরা সেটি পর্যাপ্তভাবে কাজে লাগাচ্ছি না। বিষয়টি কেবল প্রযুক্তির অভাব নয়, মূলত অভাব একটা সংগঠিত, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত ক্ষমতার। অনেকে ইউটিউবে বা অন্যান্য সামাজিক প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি করে আয় করছেন, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্থায়ী ও সম্মানজনক অবস্থান অর্জনের জন্য প্রয়োজন পেশাগত কারিকুলাম, এআই টুলস এর চর্চা এবং উচ্চমানের ইংরেজি কনটেন্ট তৈরি দক্ষতা। এই তিনটি দিককে একসঙ্গে শক্ত করে উঠলেই ভার্চুয়াল ইন্ডাস্ট্রি থেকে বড় আকারে বৈদেশিক মুদ্রা ও কর্মসংস্থান আসতে পারে। ভালো কনটেন্ট তৈরি মানে কেবল শুটিং বা এডিট করা নয়, এটি একটি সমন্বিত পেশা। গল্প বলার কৌশল, দর্শক মনোবিজ্ঞান, কপিরাইট সচেতনতা, সাবটাইটেল ও লোকালাইজেশন, এসইও বা প্ল্যাটফর্ম অ্যালগরিদম বোঝা, এবং এআই ভিত্তিক টুলস (স্ক্রিপ্ট জেনারেশন, ভয়েস সিংথেসিস, অটোমেটেড এডিটিং, ছবি/ভিডিও জেনারেশন ইত্যাদি) দক্ষতার সমন্বয় জরুরি। এসব না থাকলে ক্রিয়েটররা সহজেই ‘শক ভিত্তিক’ বা অপমানজনক কনটেন্টে চলে যায়, যা ব্যক্তিগত মর্যাদা বিনষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন করে তোলে।
ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল ইন্ড্রাস্ট্রি করতে হলে আমাদের কিছু পদক্ষেপ এখনই নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, “AI Content Academy”র মতো একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কাঠামো দ্রুত গঠন করা যেতে পারে, যেখানে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, জেনারেটিভ মিডিয়া, ভিডিও প্রোডাকশন, সাবটাইটেলিং ও লোকালাইজেশন, ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি ও মনিটাইজেশন ইত্যাদি মডিউল থাকবে। দ্বিতীয়ত, অবশ্যই ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইংরেজি Focused কোর্স চালু করতে হবে; সরকার যে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে, সেটির সঙ্গে এই কারিকুলামকে সংযুক্ত করলে আন্তর্জাতিক মার্কেটে প্রবেশ আর সহজ হবে। তৃতীয়ত, জেলাভিত্তিক ট্রেইন দ্য ট্রেইনার মডেল গ্রহণ করলে দ্রুত স্কেল করা সম্ভব; প্রত্যেক জেলায় কম্পিউটার ল্যাব, অনলাইন অ্যাক্সেস ও প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক থাকলে হাজার হাজার কনটেন্ট নির্মাতা হাতে কলমে দক্ষতা অর্জন করবে। চতুর্থত, সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বে মার্কেট কানেকশন ও প্লেসমেন্ট সার্ভিস রাখতে হবে এবং ইউটিউব, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম এবং বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে সরাসরি লিংক তৈরি করতে হবে যাতে প্রশিক্ষিত ক্রিয়েটরদের জন্য কাজ সহজে আসে।
একজন যোগ্য ক্রিয়েটর যখন সফল হবে, তার অর্জিত আয়ই প্রথম ধাপ তারপর শুরু হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি: সে সহকর্মী ভাড়ায়, নতুন ট্যালেন্ট নেবে এবং ধীরে ধীরে ছোট্ট দল বা সিন্ডিকেটেড স্টুডিও গড়ে উঠবে। এই স্টুডিওগুলো তুলনামূলকভাবে কম খরচে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের কাজ গ্রহণ করবে এবং মানসম্মত কনটেন্টের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা আনবে। পোশাক বা ফার্মাসিউটিক্যালের মতো ভারী শিল্পে যেখানে বড় প্ল্যান্ট, জটিল লজিস্টিক ও বিপুল বিনিয়োগ লাগে, ভার্চুয়াল ইন্ডাস্ট্রি এগুলো ছাড়াই দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে, প্রয়োজন শুধু দক্ষ মানুষ, ভালো ইন্টারনেট এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ। এই সহজ কিন্তু শক্তিশালী চেইনটাই দেশের অর্থনীতিতে নতুন শক্তি জাগিয়ে তুলবে।
বর্তমান সরকারের লক্ষ্যমাত্রা এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির, কিন্তু কেবল ভৌত শিল্পের ওপর নির্ভর করে তা অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ভার্চুয়াল ইন্ডাস্ট্রি বছরের মধ্যে কয়েক কোটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ খুলে দিতে পারে; পাশাপাশি লাখো ছোট এজেন্সি, স্টুডিও ও সাপোর্ট সার্ভিসও গড়ে উঠবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি অর্থায়ন, নীতিগত সহজলভ্যতা, উপযুক্ত কর প্রণোদনা এবং দ্রুত পাইলট প্রোগ্রাম চালু করে সফল মডেলগুলো জেলা পর্যায়ে পরীক্ষা করে তা জাতীয় পর্যায়ে প্রসার করেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
গত ছয় মাসে, জনাব তারেক রহমানের বর্তমান বিএনপি সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ নিয়েছে। ১০ জুন ২০২৬ তারিখে ইউনেস্কোর সাথে যৌথভাবে দায়িত্বশীল এআই গভর্ন্যান্সের উপর একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায়, ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সহায়তায় এআই গবেষণা ও প্রতিযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যা তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে আগামী দিনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এক বিরাট পদক্ষেপ। বর্তমান সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এআই, ইলেকট্রনিক্স এবং যুব উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে জেলা পর্যায়েও এআই প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রসার হবে, যেখানে প্রায় ১১,২০০ জন শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। এছাড়াও দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪.১ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর বিশাল জনশক্তিকে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউট গঠন। এই উদ্যোগটি বর্তমানে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, যা দেশের ভাষা শিক্ষার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে। এই নতুন ইনস্টিটিউট স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল বাংলা এবং ইংরেজি নয়, বরং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভাষাও শেখার সুযোগ পাবে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার পথ খুলে দেবে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করবে। বর্তমান সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করবে। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলি, যদিও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, দেশের ডিজিটাল স্কিলিং এবং এআই-শক্তিশালী জনবল গঠনে এক বাস্তব সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। এই উদ্যোগগুলিকে দ্রুত পাইলট প্রকল্প হিসেবে জেলা পর্যায়ে চালু করে নাগরিকদের কাছে মানসম্মত প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিলে এর সুফল দ্রুতই দৃশ্যমান হবে। তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার এই প্রচেষ্টা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এবং সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভার্চুয়াল ইন্ডাস্ট্রি হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বিশাল উৎস। যদিও এই খাতটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে সঠিক পরিকল্পনা, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাময় শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। "AI Content Academy"-এর মতো প্রশিক্ষণ কাঠামো গঠন, ইংরেজি ভাষার উপর জোর দেওয়া, জেলা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডেল এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত মানবশক্তি তৈরি করা সম্ভব। পোশাক বা ফার্মাসিউটিক্যালের মতো ভারী শিল্পের উপর নির্ভরতা কমিয়ে, এই খাতটিকে কাজে লাগিয়ে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যেতে পারে। বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো, যেমন - দায়িত্বশীল এআই গভর্ন্যান্সের উপর প্রশিক্ষণ, এআই গবেষণা ও প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন, এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, উপযুক্ত বিনিয়োগ এবং দ্রুত পাইলট প্রোগ্রাম চালু করে জাতীয় পর্যায়ে এর প্রসার ঘটানো। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ভার্চুয়াল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং বিশ্ব মঞ্চে নিজের স্থান করে নেবে।
লেখক: ট্রেজারার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সাবেক চেয়ারম্যান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]