আন্তর্জাতিক জলবায়ু অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে তরুণরা © টিডিসি
দেশব্যাপী কয়েক ধাপের প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও চূড়ান্ত বাছাই প্রক্রিয়া শেষে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ (আইওসিই) ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ দল।
বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জলবায়ুবিজ্ঞান, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে আয়োজিত বাংলাদেশ অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ (বিওসিই) ২০২৬-এর মাধ্যমে দলটি নির্বাচন করা হয়েছে। বিওসিই আয়োজন করেছে সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক (এসএলএসএন) ও জিরো কম্পিটিশনস।
এ বছরের বিওসিই-এর যাত্রা শুরু হয় ১৭ জুলাই ২০২৬ দেশব্যাপী অনলাইন প্রাথমিক বাছাই পর্বের মাধ্যমে। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এই পর্বে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা পরবর্তী আঞ্চলিক বাছাই পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১ আগস্ট ঢাকা ও রাজশাহীতে, ৮ আগস্ট সিলেটে এবং ১০ আগস্ট অনলাইনে। সব মিলিয়ে এই পর্যায়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
আঞ্চলিক পর্ব পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সেরা ৩০০ শিক্ষার্থী জাতীয় পর্বে অংশ নেয়। ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কার্জন হলে অনুষ্ঠিত এই পর্বে শিক্ষার্থীদের ধারণাগত বোঝাপড়া, বিশ্লেষণী দক্ষতা, গাণিতিক ও পরিমাণগত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং পরিবেশভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা বিশ্লেষণের দক্ষতা যাচাই করা হয়। কেবল মুখস্থনির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে এই পর্বে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন ড. মো. হুমায়ুন কবির, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. বি. এম. রাব্বি হোসাইন, ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুজ্জামান মিয়া, ঢাকাস্থ রাশিয়ান হাউসের পরিচালক আলেকজান্দ্রা খ্লেভনয় এবং শিক্ষা প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক মো. দেলোয়ার হোসেন। বিওসিই-এর একাডেমিক উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর এভারেস্ট অভিযানের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। প্রস্তুতি, প্রতিকূলতা মোকাবিলা, দৃঢ়তা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।
জাতীয় পর্ব শেষে ৪০ জন বিজয়ী শিক্ষার্থী চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্বে জায়গা করে নেয়। গত ২৩ আগস্ট থেকে তাদের নিয়ে শুরু হয় জাতীয় বিজয়ীদের প্রশিক্ষণ শিবির। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। এতে বাস্তুবিদ্যা, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ রসায়ন, জলবায়ুবিজ্ঞান, পৃথিবীব্যবস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা - এই ছয়টি প্রধান বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে ২৭ আগস্ট ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত রাশিয়ান হাউস ইন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত দল নির্বাচন পরীক্ষা। এতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও উপলব্ধি, সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি এবং চাপের মধ্যে কাজ করার সক্ষমতাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়।
দেশব্যাপী এই দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়া শেষে আইওসিই ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য পাঁচজন শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছে। তারা হলো - আবু মাহ্জুরাহ আইমান, ফাবিহা নুরজিনা, ইসমাহ আরুশ, এস এম আনফাল হাবিব এবং কামরুন নাহার মেঘা।
বাংলাদেশ দলের দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তাসিন মোহাম্মাদ ও আহনাফ তাহমিদ উদ্দিন। ফেরদৌস আহমেদ বাংলাদেশ দলের পর্যবেক্ষক হিসেবে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ (আইওসিই) জলবায়ুবিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা, টেকসই উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রকেন্দ্রিক একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিযোগিতা। রাশিয়ার সিরিয়াসে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশের জাতীয় দল তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও প্রকল্পভিত্তিক বিভিন্ন পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
তবে বিওসিই-এর লক্ষ্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য বাংলাদেশ দল নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জলবায়ু সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি বৃদ্ধি, গবেষণামুখী চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক প্রতিভাবান তরুণদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অনুভব করা বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের মূল বার্তাটি তাই “বাংলাদেশ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবই অনুভব করছে না; এর সমাধানে যারা নেতৃত্ব দেবে, তাদেরও তৈরি করছে।