লিওনেল আন্দ্রেস মেসি © সংগৃহীত
২১ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এবার ‘দাঁড়ি’ টানলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। আর্জেন্টাইন মহাতারকা বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে যে আলোড়ন তুলেছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তার বিদায়ী মুহূর্তে কোটি ভক্তের আবেগী হয়ে পড়াটাও ছিল স্বাভাবিক।
মেসির বিদায়ে কেঁদেছেন সতীর্থ, কোচ থেকে শুরু করে তাকে কাছ থেকে দেখা সবাই। তবে বিদায়ী বক্তব্যে হাসি-কান্নার মিশ্র অনুভূতি ছিল মেসির কণ্ঠেও। নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া, জাতীয় দলের হয়ে অর্জন এবং ভবিষ্যতের কঠিন সময় নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এস্তাদিও মনুমেন্তাল যেন পুরোপুরি সাজানো হয়েছিল এই কিংবদন্তি তারকার জন্য। আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে জয় পাওয়ায় সেই আয়োজন আরও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিদায়ী ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধের তিন গোলেই ছিল মেসির ছোঁয়া। পেনাল্টি থেকে নিজে শেষ গোলটি করেন মেসি। এর আগে নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজকে দিয়ে করিয়েছেন বাকি দুটি গোল।
মাইক হাতে নিয়ে বক্তব্য শুরু করার সময় মেসির মুখে ছিল চওড়া হাসি। একপর্যায়ে ভিজে ওঠে তার চোখের কোণ। এরপরই মাসখানেক আগে হারানো বাবা হোর্হে মেসির কথা স্মরণ করেন তিনি।
মেসি বলেন, ‘কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। মাথায় অনেক কিছুই ঘুরছে। আজকের এই রাতে সবার আগে যার কথা আমার মনে পড়ছে, তিনি আমার বাবা (হোর্হে মেসি)। আমি কেবল আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাতে পারি। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শার্টটির প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য ছিল এক বিরাট গর্বের বিষয়।’
জাতীয় দলের হয়ে লড়াইয়ের কথাও তুলে ধরেন মেসি। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনও লড়াই থামাইনি। নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেওয়া বন্ধ করিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাটাই সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। আমরা আবারও (২০২৬ আসরে) বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। বিশ্বকাপে নিজেদের সবকিছু ঢেলে দিয়েছিলাম আমরা।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। মেসির ভাষায়, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের জন্য অনেক বড় ছিল। আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করেছি। সারাজীবন লড়াই করেছি। কোনো সন্দেহ রাখবেন না যে, এই জার্সির জন্য আমরা সর্বদা আমাদের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি।’
জাতীয় দলের হয়ে আর ফিরতে না পারার ভাবনাটি যে তাকে কষ্ট দিচ্ছে, সেটিও জানিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, ‘এখানে আর ফিরে আসতে না পারার ভাবনাটা ভীষণ কষ্টের। সত্যি বলছি, সারা জীবন আমি এখানে ফিরে আসতে চাইব। কারণ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছু একজন ফুটবলারের জীবনে হতে পারে না। আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই। কিন্তু মনে হচ্ছে, বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়।’
সতীর্থদের বীর যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে মেসি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘আমি আমার সকল সতীর্থকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তোমরা আমার সব স্বপ্ন সত্যি করেছ– বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা। আমি সব সময় বীর যোদ্ধাদের দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিলাম। আমি এই পরিবেশটাকে খুব মিস করব।’
ভক্তদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি যেখানেই গিয়েছি, স্টেডিয়াম সব সময় কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। মনে হতো আমরা যেখানেই খেলছি, সেটাই যেন আমাদের নিজেদের ঘর।’ নিজের উত্তরসূরিদের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন মেসি। একই সঙ্গে সামনে কঠিন সময় আসতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
মেসি বলেন, ‘আমি জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা মিস করব। এখন থেকে আমি মাঠের বাইরে অন্য পাশে থাকব– এই ছেলেদের এবং এরপর যারা আসবে তাদের সবার জন্য শুভকামনা জানাব ও সমর্থন দিয়ে যাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘কঠিন সময় সামনে আসছে। আর সেই মুহূর্তগুলোতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়। মহৎ কিছু অর্জন করতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলতে হবে।’
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক শেষ বক্তব্যে ভক্তদেরও আবেগী করে তোলেন। মেসি বলেন, ‘আমি এই জায়গা ছেড়ে যেতে চাই না। আমি এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আর আপনাদের সবাইকে আমি খুব মিস করব।’
শেষে নিজের পরিচয় ও স্বপ্নপূরণের কথা তুলে ধরে মেসি বলেন, ‘আমি একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্বিত। আমি নিজের স্বপ্নপূরণ করতে পেরে সত্যি গর্বিত।’