মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ সংকট

জ্বালানি নিরাপত্তায় কেন বিপাকে বাংলাদেশ, কীভাবে সামলাবে পরিস্থিতি?

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৮ PM
দুলাল আহমদ চৌধুরী

দুলাল আহমদ চৌধুরী © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৬ সালের সামরিক সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে পারস্য উপসাগরের একক সমুদ্রপথের ওপর চরম নির্ভরতার ঝুঁকি নতুন করে উপলব্ধি করায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প পাইপলাইন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে বাধ্য করে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে কৌশলগত অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতিতে এক নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

কয়েক দশক ধরে, ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে প্রায়শই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতো; তবে ২০২৬ সালের আগ পর্যন্ত এ ধরনের আশঙ্কা মূলত তাত্ত্বিক বা অনুমান-নির্ভরই ছিল। ২০২৬ সালের সংকট এই ধারণাকে বদলে দেয়।

২০২৫ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হতো, যার প্রায় ৮০ শতাংশই যেত এশিয়ার বাজারে। এছাড়া ১১০ বিলিয়ন ঘনমিটারেরও বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সামরিক সংঘাতের পর স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে হরমুজ দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের গড় প্রবাহ কমে দৈনিক প্রায় ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। পরবর্তীতে আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হলেও, এই পরিবহন রুটের নিরবচ্ছিন্ন সহজলভ্যতা নিয়ে বাজারের আগের আস্থা আর ফিরে আসেনি।

সংকটের স্থায়িত্বকাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বল্পমেয়াদে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত ব্যবহার, ট্যাঙ্কারের সময়সূচি সমন্বয় এবং বিকল্প রুটের অধিক ব্যবহারের মাধ্যমে তার প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি এই অচলাবস্থা মাসের পর মাস চলতে থাকে, তবে এসব পদক্ষেপ আর যথেষ্ট থাকে না। তখন সরকারগুলো মজুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য নতুন রুট তৈরির কথা ভাবতে বাধ্য হয়। বিনিয়োগের হিসাব-নিকাশে একই ধরনের সংকট পুনরায় দেখা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করে এবং রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার ব্যয়কে ক্রমশ বিবেচনা করা হতে থাকে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, বিশাল আকারের অতিরিক্ত সক্ষমতা (over capacity) বজায় রাখা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। পারস্য উপসাগর হয়ে সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যবস্থা প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সাথে যোগাযোগের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পথ হিসেবে কাজ করে; অন্যদিকে, বিকল্প তেল পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ, পাম্পিং স্টেশন, টার্মিনাল এবং নিরাপত্তার জন্য বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই পাইপলাইনের সক্ষমতার একটি অংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকতে পারে।

২০২৬ সালের যুদ্ধ এই হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রথম মাসেই উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানিকারকদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তাই, প্রধান রপ্তানি পথ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকার ফলে সম্ভাব্য যে ক্ষতি হতে পারে, তার সাথে এখন বিকল্প তেল পাইপলাইনের ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়, তবেই সেই অতিরিক্ত বা ‘স্পেয়ার’ সক্ষমতা অর্থনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে। ফলে, বিকল্প সক্ষমতা তৈরি ও তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর গুরুত্ব এখন আর শান্তিকালীন স্বাভাবিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে না; বরং পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার সময় ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সক্ষমতার ওপরই এর গুরুত্ব বেশি নির্ভর করছে।

জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সময় বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামোর ব্যবহারিক গুরুত্ব সৌদি আরবের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, রিয়াদ 'পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন' এবং ইয়ানবু টার্মিনালের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। ‘গালফ রিসার্চ সেন্টার’-এর হিসাব অনুযায়ী, সংকটের শুরুর সপ্তাহগুলোতে সৌদি অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করে পাঠানো হয়েছিল। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ থেকে লোহিত সাগরের দিকে সরবরাহের একটি বড় অংশ ঘুরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ইয়ানবু থেকে তেল ভিন্ন এক সামুদ্রিক পথ-ব্যবস্থার মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছায়। এখান থেকে জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে যেতে পারে, মিশরের ‘সুমেড’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে পারে, অথবা বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হতে পারে। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে চলার ফলে পরিবহণ-সংক্রান্ত ঝুঁকির একটি অংশ লোহিত সাগর ও অন্যান্য বাণিজ্য রুটে স্থানান্তরিত হয়।

২০২৬ সালের সংকটের অনেক আগে থেকেই ফুজাইরাহ-র উন্নয়ন ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব উপকূলে বন্দর ও পরিবহণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ। এক্ষেত্রে ‘হাবশান-ফুজাইরাহ’ তেল পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আবুধাবির উৎপাদিত তেলের একটি অংশকে হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত ওমান উপসাগরীয় উপকূলের টার্মিনালগুলোতে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। সংকটের সময় এই অবকাঠামোটি ট্যাঙ্কারগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে না চালিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানির একটি অংশ অব্যাহত রাখা সম্ভব করে তোলে। ফলে ফুজাইরাহ দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান বিকল্প পথে পরিণত হয়।

গ্যাস রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে অবাধ চলাচলের ওপর অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের তুলনায় কাতার অনেক বেশি নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে ১১২ বিলিয়ন ঘনমিটারেরও বেশি এলএনজি পরিবাহিত হয়েছে, যা ছিল বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই পরিমাণের সিংহভাগই ছিল কাতারের সরবরাহ। দেশটির মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় ৯৩ শতাংশই হরমুজ হয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে কাতারি গ্যাস সরবরাহকারী ‘ডলফিন পাইপলাইন’ এই সঙ্কটকালে তাৎপর্যপূর্ণ বিকল্প হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে না।

তেলের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা অনেক বেশি জটিল। তেল অন্য কোনো টার্মিনালে নিয়ে ট্যাঙ্কারে তোলা সম্ভব। কিন্তু এলএনজি রপ্তানির জন্য গ্যাস পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তরলীকরণ, সংরক্ষণ এবং সমুদ্রপথে জাহাজীকরণের সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। সৌদি আরব হয়ে পারস্য উপসাগরের বাইরের উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ফুজাইরাহ বা ওমানে অবস্থিত নতুন তরলীকরণ কেন্দ্রে কাতারি গ্যাস পরিবহনের বিভিন্ন উপায় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। কাতার এলএনজি রপ্তানির জন্য দ্রুত কোনো বিকল্প পথ তৈরি করতে না পারায়, তাদের সরবরাহ হ্রাসের প্রভাব সামাল দেওয়ার বিষয়টি তাদের নিজস্ব রপ্তানি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সমাধান করতে হয়েছে।

মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এলএনজি লোডিংয়ের পরিমাণ ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ঘনমিটার হ্রাস পায়। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে এলএনজি উৎপাদন প্রায় ২৭ বিলিয়ন ঘনমিটার বৃদ্ধি পায়, যা এই ঘাটতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করে। উৎপাদনের এই বৃদ্ধির একটি বড় অংশ এসেছিল এমন সব নতুন সক্ষমতা থেকে, যা হরমুজ সংকটের আগেই চালু করা হয়েছিল অথবা চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।

কাতারের তুলনায় ইরাকের রপ্তানি পথ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কয়েক দশক ধরে দেশটির রপ্তানির সিংহভাগই দক্ষিণাঞ্চলীয় বসরা তেলক্ষেত্র ও টার্মিনালগুলোকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়ে আসছে। সেখান থেকে ট্যাঙ্কারগুলো হরমুজ প্রণালী হয়ে গন্তব্যের দিকে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ, ইরাকের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের ৪.৩ মিলিয়ন ব্যারেল (প্রতিদিন) থেকে কমে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। যে দেশে রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে, সেখানে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা দ্রুতই সরকারি অর্থব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি করে।

সংকটটি নতুন নতুন পথ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ২০২৬ সালে ইরাক ‘বসরা-হাদিথা’ তেল পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়; এই পাইপলাইনটির দৈনিক ২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা থাকার কথা। হাদিথা থেকে তেলটি কয়েকটি করিডোর বা পথের মাধ্যমে পরবর্তী গন্তব্যে—যেমন তুরস্কের জেইহান, সিরিয়ার বানিয়াস এবং জর্ডানের আকাবায়—পরিবহন করার পরিকল্পনা রয়েছে। জুলাই মাসে সরকার তুরস্ক ও সিরিয়া হয়ে যাওয়া পথগুলোর জন্য কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরুর অনুমোদন দেয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ইরাক ও সিরিয়া ‘হাদিথা-বানিয়াস’ তেল পাইপলাইনটি পুনরায় সচল করার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। বসরা-আকাবা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও পরিবহন-সংক্রান্ত পরিস্থিতির ওপর অনুরূপ নির্ভরতা দেখা যায়। বিদ্যমান সংকটের কারণে প্রকল্পটি ইরাক ও জর্ডানের মধ্যকার আলোচনার আলোচ্যসূচিতে পুনরায় স্থান পেয়েছে। প্রস্তাবিত এই তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে ইরাকি তেল লোহিত সাগরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওমানের মধ্য দিয়ে আরব সাগরে ইরাকি তেল রপ্তানির বিষয়টি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম হলেও, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে এটি বিবেচনা করা হচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় ওমান হরমুজ প্রণালীর ওপর কম নির্ভরশীল। দেশটির প্রধান তেল টার্মিনালগুলো প্রণালীর বাইরে অবস্থিত; এর ফলে সংকটের সময়ও দেশটি বিদেশি বাজারে তেল সরবরাহের সুযোগ বজায় রাখতে পেরেছে এবং কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের তুলনায় অনেক কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত বন্দর ও শিল্পাঞ্চল ‘দুকম’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এই সংকট শুরুর অনেক আগেই এর উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছিল। প্রতিবেশী রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য দুকম এমন একটি গন্তব্য হতে পারে, যার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের বাইরে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করা সম্ভব। তবে বর্তমানে তাদের উৎপাদন এলাকাগুলোর সাথে ওমানি উপকূলকে সংযুক্ত করার মতো কোনো অবকাঠামো নেই। এ ধরনের করিডোর বা পথ তৈরির জন্য বিপুল বিনিয়োগ, পাইপলাইন নির্মাণ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির প্রয়োজন; পাশাপাশি এগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করবে সেই সব দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর, যাদের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে এই পথগুলো যাবে।

২০২৬ সালের সংকট ওমানের আরেকটি ভূমিকার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়—আর তা হলো হরমুজ দিয়ে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মকানুন নির্ধারণে দেশটির ভূমিকা। ৪ এপ্রিল, প্রণালীর তীরবর্তী দুই রাষ্ট্র হিসেবে মাস্কাট ও তেহরান সংকটের সময় জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা শুরু করে। হরমুজ প্রণালীর বাইরে দেশটির নিজস্ব রপ্তানি অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও, তারা একই সাথে এই প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে অধিকতর স্থিতিশীল ও সুনিশ্চিত পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় অংশ নিচ্ছে।

শুরুতে, ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রভাবকে সরাসরি সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস থেকে আয়, এশীয় অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক পরিবহন ও বীমার খরচ এবং জ্বালানির দাম—সবই প্রভাবিত হয়েছিল। সরাসরি সংঘাতে জড়িত নয় এমন রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থকে একটিমাত্র পরিবহন-সংকীর্ণপথের (চোক পয়েন্ট) মাধ্যমে প্রভাবিত করার সক্ষমতা ইরানের প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছিল।

২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ নাগাদ এই কৌশলের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপায়ে ইরানকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু একইভাবে প্রণালী অবরোধ করেও তেহরান তার নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি। প্রতিপক্ষ এবং তৃতীয় কোনো দেশের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধনের সক্ষমতা থাকলেই যে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হবে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

ইরান নিজেও পারস্য উপসাগর হয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ইরানের তেল রপ্তানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে, সামুদ্রিক চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তেহরানের জন্য লাভ ও ক্ষতির এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছিল: একদিকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা তারা ধরে রেখেছিল, কিন্তু অন্যদিকে নিজেদের রপ্তানি কার্যক্রম ও সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটে প্রবেশের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছিল। এর ফলে হরমুজ প্রণালীর ওপর এমন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইরানের আগ্রহ বাড়ছে, যা তাদের পক্ষে জাহাজ চলাচলের পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ না করেও এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ করে দেবে—আর ঠিক এ কারণেই তারা ট্রানজিট বা চলাচলের নিয়মকানুন, পূর্বানুমতি গ্রহণ, মাশুল বা ফি এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালে ইরান প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী নৌযান ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন করে; একই সাথে তারা পূর্বানুমতির আবশ্যকতা, ট্রানজিট ফি এবং তেহরানের দৃষ্টিতে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্রগুলোর মালিকানাধীন জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয় নিয়েও আলোচনা শুরু করে।

সম্ভাব্য ট্রানজিট বা চলাচল-শুল্ক নিয়ে বিতর্কটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্থায়ীভাবে কোনো শুল্ক আরোপ করা হলে তা আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়িয়ে দেবে এবং এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর ওপর এর বিশেষ প্রভাব পড়বে। চীন ইরানের তেলের বৃহত্তম বাজার এবং তেহরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের স্বার্থ কেবল ইরানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। পুরো অঞ্চল থেকে জ্বালানি সম্পদের নিরাপদ প্রাপ্তি বেইজিংয়ের জন্য অপরিহার্য। তাই হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত বা চলাচলের ব্যয় স্থায়ীভাবে বেড়ে যাওয়া চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইরানের চাপের ফলে অঞ্চলের সামগ্রিক জ্বালানি প্রবাহ যত বেশি প্রভাবিত হবে, তেহরানের পক্ষে এমন সব রাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়া তত কঠিন হয়ে পড়বে যারা তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।

এর ফলে, ইরানের কৌশল ধীরে ধীরে নৌ-চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা থেকে সরে এসে প্রণালীতে প্রবেশের শর্তাবলিকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার দিকে ঝুঁকছে। এ ধরনের কৌশল তেহরানকে কম শক্তি ব্যয়ে কিছুটা প্রভাব বা দরকষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে; যদিও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্র, প্রধান জ্বালানি ক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল খাতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশলের গুরুত্ব নির্ভর করবে বিকল্প পথ ও সরবরাহের উৎস গড়ে তোলার গতির ওপর—যা রপ্তানিকারক ও ভোক্তাদের প্রণালী দিয়ে চলাচলে পুনরায় কোনো ব্যাঘাত ঘটলে সৃষ্ট ক্ষতি কমিয়ে আনতে সক্ষম করবে।

ইরানও হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। বিকল্প রুটগুলো গড়ে ওঠার সাথে সাথে, দীর্ঘমেয়াদী নৌ-চলাচল বিঘ্নিত করার কৌশলটি হয়তো চাপের হাতিয়ার হিসেবে আগের মতো কার্যকর থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান হয়তো বেছে বেছে বিধিনিষেধ আরোপ, জাহাজ চলাচলের শর্তাবলী প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং নৌ-চলাচল ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখার মতো কৌশল অবলম্বন করতে পারে; অর্থাৎ তারা হরমুজকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। রাষ্ট্র ও কোম্পানিগুলো প্রণালীতে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি কমানোর উপায় সন্ধান করতে পারে, আর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সংযোগস্থলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।

সংকটকালীন অভিজ্ঞতা বিনিয়োগ সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশকেও বদলে দিচ্ছে। নৌ-চলাচল দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্নিত হওয়ার ফলে যে প্রকৃত ক্ষতি হয়, তা বিকল্প পাইপলাইন, টার্মিনাল এবং অন্যান্য অবকাঠামোর গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয়। তবে, মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়তো আজই নেওয়া হতে পারে, কিন্তু নতুন বড় রুটগুলো চালু হতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানি খাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। একই সাথে, হরমুজ প্রণালীকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, হরমুজ প্রণালী অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি করিডোর হিসেবে তার মর্যাদা হারাবে।

যখন কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, তখন তার সাথে অনিবার্যভাবে সামরিক, অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও তথ্যগত বিষয়গুলো জটিল আকার ধারণ করতে থাকে। পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জ্বালানি নীতি ও অবকাঠামো আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর যেমন সুযোগ এনে দিতে পারে, তেমনি তাদেরকে এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।

হরমুজ প্রণালীর সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একক কোনো সংকটপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো আমদানিকারক দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বৈশ্বিক এই রূপান্তরের সাপেক্ষে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি অন্যতম মূল শর্ত। সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ, অভ্যন্তরীণ সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের যেকোনো বৈশ্বিক জ্বালানি আঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, নিউজ ডিপ্লোমেটস

এবার রাজধানীর তিন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বিএনপি
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনীতিতে মূল্যায়নের মাপকাঠি: শিক্ষাগত যোগ্যতা নাকি দলের প্…
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনীতি নিষিদ্ধ আবাসিক হলে ছাত্রদলের কর্মসূচি, উপস্থিত শাবি…
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেরোবিতে ১২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শিবিরের নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গ…
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর এক কলেজের মসজিদ থেকে জঙ্গি সন্দেহে ২৩ জন আটক
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬