রাজনীতিতে মূল্যায়নের মাপকাঠি: শিক্ষাগত যোগ্যতা নাকি দলের প্রতি নিবেদন ও ত্যাগ © প্রতীকী ছবি, এআই
রাজনীতিতে একজন নেতার যোগ্যতার মাপকাঠি কী হবে—প্রথাগত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও একাডেমিক ডিগ্রি, নাকি দলের প্রতি গভীর আনুগত্য, ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও জন সম্পৃক্ততা? প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সহজ হলেও উত্তর এতটা সহজ নয়। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি নয়, যেখানে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই পদ পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি হয়। আবার আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংবিধান, প্রশাসন কিংবা ভূরাজনীতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক ময়দানে টিকে থাকাও কঠিন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ‘ডিগ্রি বনাম ত্যাগ’ বিতর্কটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মান নিয়ে আলোচনায় আসছে একটি প্রশ্ন—রাজনীতিতে মূল্যায়নের মূল মাপকাঠি আসলে কী?
‘আনুগত্য’ যখন একমাত্র দরজা
রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক বিষয় নয়। দলের নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা না থাকলে কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদে সংগঠন পরিচালনা করতে পারে না। কিন্তু দলীয় আনুগত্য যখন পদ পাওয়ার প্রধান কিংবা একমাত্র প্রবেশপথ হয়ে দাঁড়ায়, তখন দুটি সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, যোগ্য কিন্তু দলীয় বলয়ের বাইরে থাকা ব্যক্তিরা পিছিয়ে পড়েন। দ্বিতীয়ত, দলের ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে যেখানে কাজের দক্ষতার চেয়ে ‘কার লোক’—এই পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাজনীতিকে কেবল সনদনির্ভর পেশায় পরিণত করলে গণমানুষের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। পৃথিবীর বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রথাগত উচ্চশিক্ষার চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাদের নেতৃত্বের প্রধান সম্পদ হয়েছে।
বাংলাদেশেও এমন বহু নেতা রয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এসেছে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জনসম্পৃক্ততা ও সংগঠন পরিচালনার মধ্য দিয়ে। তাই একজন জনপ্রতিনিধি বা দলীয় নেতার ক্ষেত্রে ‘পিএইচডি আছে কি না’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—তিনি কি গণমানুষের ভাষা বোঝেন? দল পরিচালনা করতে পারেন? সংসদীয় কাজ বোঝেন? নীতি নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা আছে? নিজের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে প্রস্তুত?
ইতিহাস কী বলে
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রশ্নের চমৎকার কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন ব্যারিস্টার। লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে তিনি উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং অসাধারণ আইনগত যুক্তি, রাজনৈতিক কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে প্রথমে সর্বভারতীয় পরে মুসলিম লীগেরও প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন। জিন্নাহ ছিলেন তার সমসাময়িক সময়ে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞ, যা তার রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষও অবলীলায় মেনে নেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের আরেক অন্যতম নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও আইন পড়েছিলেন। লন্ডনে আইনশিক্ষা গ্রহণের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় পেশাগত জীবন শুরু করেন। পরে তার রাজনৈতিক দর্শন, অহিংস আন্দোলনের কৌশল ও গণসম্পৃক্ততা তাকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিতে পরিণত করে।
জওহরলাল নেহরু ছিলেন কেমব্রিজের শিক্ষার্থী এবং ব্যারিস্টার। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন এবং আইন পেশায়ও যুক্ত ছিলেন। এ কে ফজলুল হক ছিলেন আইনজ্ঞ এবং ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী বাঙালি রাজনৈতিক নেতা। ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক; তিনি বঙ্গীয় আইনসভা, তৎকালীন বঙ্গের সরকার এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থাৎ উপমহাদেশের প্রথম সারির অনেক রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁদের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু ইতিহাসের দ্বিতীয় চিত্রটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ভাসানী দেখিয়েছেন অন্য পথ
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নেতা। তাঁর রাজনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়; বরং সাধারণ মানুষ, কৃষক-শ্রমিক এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীর সংযোগ।
২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণেও ভাসানীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাঁর নৈতিক অবস্থান, জীবনের অভিজ্ঞতা এবং নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে একাত্মতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একই বিশ্লেষণে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, সংগঠকসুলভ ক্ষমতা এবং মানুষের আবেগ পুঁজি করার সক্ষমতাকে তার নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা এবং অশিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়।
একজন ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়েও স্বশিক্ষায় জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। রাজনীতি, ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে পারেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তিও জনসম্পৃক্ততা কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বে ব্যর্থ হতে পারেন।
শেখ মুজিব: ডিগ্রির বাইরে রাজনৈতিক শিক্ষা
শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, তা সম্পন্ন করতে পারেননি। তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ গড়ে ওঠে ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন, সংগঠন এবং জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ তাকে কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দিয়ে বিচার করলে তার রাজনৈতিক বিকাশের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
রাজনীতিতে তার মূল শক্তির জায়গাগুলোর মধ্যে ছিল সংগঠন গড়ে তোলা, মানুষের ভাষায় কথা বলা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুধাবন এবং দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। এখানেই রাজনীতির সঙ্গে অন্য পেশার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
খালেদা জিয়া: ভিন্ন বাস্তবতার উদাহরণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এই বিতর্ক বা আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক উত্থান মূলত স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বের সংকটের প্রেক্ষাপটে। সমসাময়িক বিশ্লেষণগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন দলের বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করার সক্ষমতার কারণে বিএনপির নেতারা তাঁকে ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবে দেখেছিলেন।
খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেটি তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ন্যূনতম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারেনি। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নির্বাচন, আন্দোলন, সরকার পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে একটি আলাদা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল।
এখানে আবারও সেই একই প্রশ্ন সামনে আসে—রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন কি শুধু শিক্ষাগত সনদ দিয়ে করা সম্ভব?
সংবিধানও ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করেনি
বর্তমান বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এমন কোনো শর্ত নেই। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। তিনি বলেন, একজন সমাজসেবক প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও স্বশিক্ষিত হতে পারেন।
এই অবস্থানের পেছনে যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ—গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার অধিকারকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া যায় না। কারণ জনগণ একজন জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচন করেন তার রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিত্ব, জনসম্পৃক্ততা, গ্রহণযোগ্যতা এবং কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে।
কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে রাষ্ট্র পরিচালনা কি শুধু জনপ্রিয়তার বিষয়? এখানেই বিতর্কের দ্বিতীয় দিক।
একজন জনপ্রিয় নেতা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর তাকে বাজেট, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো জটিল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সেখানে শুধু জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন জ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা এবং সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতি বোঝার সক্ষমতা। তাই রাজনীতিতে ডিগ্রি বাধ্যতামূলক না হলেও জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত—অন্তত নৈতিক অর্থে।
‘ত্যাগ’কখন যোগ্যতা, কখন নয়
দলের জন্য ত্যাগ অবশ্যই রাজনৈতিক সম্পদ। দীর্ঘদিন সংগঠনে থাকা একজন নেতা দলের ইতিহাস, কর্মী ও সাংগঠনিক বাস্তবতা অন্য অনেকের চেয়ে ভালো জানতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ত্যাগ কি সব ধরনের পদে নিয়োগের স্বয়ংক্রিয় যোগ্যতা? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উত্তরটি এত সহজে ‘হ্যাঁ’বলা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান সাম্প্রতিক সরকারি নিয়োগের প্রসঙ্গে বলেছেন, কোনো ব্যক্তির দলের প্রতি ত্যাগ বা আনুগত্যকে সরকারি পদে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যের মূল যুক্তি হলো, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট পদের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে একেবারে অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়। অর্থাৎ দলীয় পদ এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত পদ—দুটির মূল্যায়নের মাপকাঠি এক হওয়া উচিত নয়।
রাজনীতিকদের কী বলছেন?
সাম্প্রতিক বিতর্কে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যটি সরাসরি এই প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও একজন মানুষ স্বশিক্ষিত হতে পারেন এবং জনপ্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।
অন্যদিকে অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে—রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে দলীয় ত্যাগকে যোগ্যতার বিকল্প না করা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষেত্রে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও এর আগে উপাচার্য নিয়োগে যোগ্যতা ও সক্ষমতার গুরুত্বের কথা বলেছেন; একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় পুরোপুরি রাজনৈতিক পরিচয়মুক্ত প্রার্থী চিহ্নিত করাও সহজ নয়।
অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদে বলেছেন, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি; জ্যেষ্ঠতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং একাডেমিক নেতৃত্বের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে।
এই বক্তব্যগুলো পরস্পর ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান থেকে এলেও একটি জায়গায় আলোচনাটি মিলিত হয়—পদটির ধরন অনুযায়ী যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।
অগ্রাধিকার কার?
সম্ভবত ‘ডিগ্রি অথবা ত্যাগ’—এমন দ্বৈত সিদ্ধান্তে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একজন দলীয় সংগঠকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সংকটে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একজন সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতা, আইন ও নীতি বোঝার ক্ষমতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা ও সংসদীয় দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ।
আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, প্রকৌশল সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পদ যত বেশি বিশেষায়িত, সংশ্লিষ্ট পেশাগত যোগ্যতার গুরুত্ব তত বেশি।
আর পদ যত বেশি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার গুরুত্ব তত বেশি। তাই শেষ বিচারে ডিগ্রি নয়, ‘যোগ্যতা’ই বড়।
ইতিহাসের শিক্ষা খুব পরিষ্কার—ডিগ্রি একজন মানুষকে জ্ঞানী হওয়ার সুযোগ দেয়, কিন্তু নেতৃত্বের নিশ্চয়তা দেয় না। একইভাবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ একজন মানুষকে অভিজ্ঞ করে তুলতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্ব পালনের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য করে না।
জিন্নাহ, গান্ধী, নেহরু, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দীদের মতো উচ্চশিক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি ভাসানী, শেখ মুজিব ও খালেদা জিয়ার মতো ভিন্ন শিক্ষাগত পটভূমির নেতাদের রাজনৈতিক উত্থান দেখায়—গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের কোনো একক একাডেমিক ফরমুলা নেই।
কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে ‘শিক্ষার দরকার নেই’—এমন সিদ্ধান্তও টানা যাবে না। বরং শিক্ষা ও জ্ঞানকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
রাজনীতিতে ত্যাগকে পুরস্কৃত করা দরকার, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে পুরস্কারে পরিণত করা উচিত নয়। আবার ডিগ্রিকে সম্মান করা দরকার, কিন্তু ডিগ্রিকে নেতৃত্বের একমাত্র প্রবেশপত্র বানানোও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শেষ পর্যন্ত সনদ নয়, সক্ষমতা; আনুগত্য নয়, দায়িত্ববোধ; জনপ্রিয়তা নয়, জনস্বার্থে কাজ করার প্রমাণ—এই তিনের সমন্বয়েই রাজনৈতিক যোগ্যতার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি হতে পারে।