মেয়েদের ছবি ও নাম দিয়ে ফেসবুকে ভুয়া আইডি থাকলে করণীয় কী, প্রতিকার পাবেন কোথায়?

৩১ মে ২০২৬, ১০:৪২ AM
ফেসবুকে অন্যের নামে ভুয়া আইডি খুলে অপরাধের প্রবনতা বাড়ছে

ফেসবুকে অন্যের নামে ভুয়া আইডি খুলে অপরাধের প্রবনতা বাড়ছে © বিবিসি বাংলা

ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় থাকেন গৃহিনী নওশিন আফরোজ (ছদ্মনাম)। ১২ বছর বয়সী মেয়ে ঢাকার উত্তরার একটি নামকরা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। গত বছরের নভেম্বর তার পরিচিত ও নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পান তার মেয়ের নামে। অভিযোগটি ছিল, কিশোরী মেয়ের ছবি ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে ইনবক্স মেসেজে দেখা যায় এবং তা বিভিন্ন ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ ও ‘অশালীন’ কথাবার্তা বলে।

আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে এই অভিযোগগুলো পেয়ে সামাজিকভাবে অনেকটা ভেঙে পড়েন এ দম্পতি। পরে বাধ্য হয়ে গত বছরের নভেম্বরে ঢাকার দক্ষিণখান থানায় জিডি করেন। ঘটনার সাত মাস পেরিয়েছে। এখনো তার মেয়ের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুক আইডিটি চালু রয়েছে। সেই আইডি থেকে বিভিন্ন জনকে ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে।

ওই নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘ফেসবুক তো দূরের কথা, আমার মেয়ের কাছে ফোনই নেই কোনো। আমি ও আমরা হাজবেন্ড ফেসবুকে কোনো ছবি দিলে সাথে সাথে ওই আইডি থেকে সেই ছবি আপলোড করা হয়। মানুষকে খারাপ খারাপ মেসেজ পাঠায়। আমার মেয়েকে খুব বাজেভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে ফেসবুক থেকে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত নারীদের হয়রানি, নিপীড়নমূলক বার্তা পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নারীদের ছবি ব্যবহার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক আইডি তৈরির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এসব নিয়ে থানায় অভিযোগও করছেন অনেকেই। কিন্তু তারা প্রতিকার পাচ্ছেন না। উল্টো হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে নওশিন আফরোজের (ছদ্মনাম) পরিবারের মতো অনেককে।

পুলিশ পরিচালিত ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ রয়েছে। যেখানে সাইবার স্পেসে নারী কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে তাদের সুরক্ষা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। পুলিশের ওই পেজের বিভিন্ন পোস্টের কমেন্টস সেকশনে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ নারীই অভিযোগ করেছেন যে, তারা সুরক্ষা চাইলেও সেটি পাননি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত নারীদের হয়রানি, নিপীড়নমূলক বার্তা পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নারীদের ছবি ব্যবহার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক আইডি তৈরির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এসব নিয়ে থানায় অভিযোগও করছেন অনেকেই। কিন্তু তারা প্রতিকার পাচ্ছেন না।

জবাবে পুলিশ বলছে, তারা কোনো অভিযোগ পেলে সেটি বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দ্রুতই সাড়া দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সময় নেয়। সে কারণে চাইলেও পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে একই ব্যক্তির নামে ভিন্ন আইডি চালু। কিংবা ভিন্ন নাম ব্যবহার করে সুন্দরী নারীদের নামে আইডি চালুর অভিযোগ জমা পড়ে সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও ফেসবুক আইডি হ্যাক করে যৌন নিপীড়নমূলক মেসেজ পাঠানো, ভুয়া আইডি তৈরি করে হয়রানি, অশালীন ও এডিটেড ছবির সাথে কোনো পরিচিত সেলিব্রেটি নারীর নাম ব্যবহার করে আইডি তৈরি ও পোস্ট করার ঘটনাগুলোই বেশি ঘটছে নারীদের ক্ষেত্রে।

কোথাও কোথাও আবার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে টাকা চাওয়া হচ্ছে, মেইলে মেসেজ পাঠিয়ে। মেইল আইডি হ্যাকের মতো অভিযোগগুলোও জমা পড়ছে। আমিনুল হক বাপ্পী জানান, সাইবার ক্রাইম নিয়ে পুলিশের কাছে যে ধরনের অভিযোগ আসে, তার মধ্যে বেশি অভিযোগ আসে ব্লাকমেইলিং, হ্যাকিং, প্রোপাগান্ডা পোস্ট, ভুয়া আইডি থেকে নানা তথ্য ও ছবি ছড়ানো।

সম্প্রতি নড়াইলের কালিয়ায় এক নারীর ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ভুয়া আইডি খুলে প্রতারণার অভিযোগে পুলিশ এক যুবককে গ্রেফতার করে। কয়েক দিন আগে কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রী তার নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে জানান, তার ফেসবুক আইডি থেকে ছবি নিয়ে নামসহ অন্তত ১৫টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।

তিনি সেই আইডিগুলোর লিংকসহ তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সেগুলোতে ‘রিপোর্ট’ করার অনুরোধ জানিয়েছেন বন্ধুদের কাছে। ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের ফেসবুক পেজেও বিভিন্ন পোস্টের কমেন্টে নানা ধরনের অভিযোগের কথা তুলে ধরতে দেখা গেছে অনেককে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, শুধু ভিন্ন ভিন্ন আইডি খুলে হয়রানি, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, নারী সেজে পুরুষ ও পুরুষ সেজে নারীদের ফাঁদে ফেলে ভিডিও ধারণ, টেরিরোজিমসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

কতটা প্রতিকার পান নারীরা?
দক্ষিণখানের আফরোজ (ছদ্মনাম) যে অভিযোগটি করেছিলেন, সাড়ে সাত মাস আগে সেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল থানার একজন এসআইকে। শনিবার সেই এসআই বলছিলেন, তিনি সম্প্রতি ওই থানা থেকে বদলি হয়েছেন অনত্র। যে কারণে এ বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিত বলতে পারেননি।

আফরোজ বলেন, ‘আমি থানায় অভিযোগ করার পর দেখি তারা এটা নিয়ে কিছু করে না। আমার স্বামী কয়েকবার পুলিশের কাছে গিয়ে বলেছে, তাতেও কোনো কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা কাছের বন্ধু-বান্ধবদের বলছি ফেসবুকে রিপোর্ট করার জন্য। তারাও রিপোর্ট করছে।’

তিনি জানান, কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে রিপোর্ট করা হয়েছিল তার মেয়ের ছবি দিয়ে তৈরি করা অ্যাকাউন্টের নামে। তখন কিছুদিন পোস্ট করা বন্ধ ছিল। কিন্তু দুই-তিন মাস ধরে আবারও সক্রিয় দেখা যাচ্ছে আইডিটি।

পুলিশ বলছে, সাইবার স্পেসে ভুয়া আইডি বা পেজ তৈরি করে অপরাধের পর কেউ যখন থানায় অভিযোগ করে, তখন কিছু ধাপ শেষ করার পর সেগুলোকে পাঠানো হয় মেটা বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে। বরিশাল মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগগুলো সারাদেশেই জমা পড়ে। কিন্তু এ নিয়ে যখন থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, তারপর সেগুলো পাঠাতে হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মাধ্যমে। জেলা উপজেলা কিংবা মহানগর পর্যায়েও জিডি করলেও কয়েক ধাপে সেটি মেটার কাছে পাঠাতে হয়।

পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, ‘এই চাবিটা আমাদের কাছে থাকে না। চাবিটা মেটার কাছে। মেটা যাচাই-বাছাই করে যখন আমাদের কাছে উত্তর দেয়, তখন আমরা এটা নিয়ে সামনে আগাই। না হলে কিছু করার থাকে না।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?
পুলিশ বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের নামে আইডি তৈরি বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে তা নিয়ে সাধারণ ডায়েরি জমা পড়লে সেটি তাদের তদন্ত করতে ফেসবুক বা মেটা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা লাগে। পুলিশের কাছে যে জিডিগুলো হয়, সেগুলো লেখা হয় বাংলায়। বাংলায় করা সাধারণ ডায়েরি বা জিডি মেটা কর্তৃপক্ষকে পাঠানো যায় না। সেগুলোকে নোটারির মাধ্যমে ইংরেজি করে পাঠানো হয়।

আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, ‘প্রথমে মেটা কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে। পরে কোনো অভিযোগের উত্তর দেয় আবার কোনোটির উত্তর নাও দিতে পারে। অনেক সময় দেয় না। যখন কোন অভিযোগের বিষয় উত্তর পাওয়া যায় না, তখন পুলিশেরও কিছু করার থাকে না।’

আরও পড়ুন: প্রযুক্তিনির্ভর সেবা থেকে পিছিয়ে বুটেক্স লাইব্রেরি, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

তিনি বলছিলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত সাড়া দেয়। বিশেষ করে- চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, পর্নোগ্রাফি, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার কিংবা অপহরণের মতো বিষয়ে অভিযোগ পড়লে দ্রুত সাড়া দেয় মেটা কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে একজনের নামে আরেকজনের আইডি তৈরি, অন্যের ছবি ব্যবহার করে আইডি তৈরি, হ্যাকিং কিংবা এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ফেসবুকের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা বা সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হলে দ্রুত তাতে সাড়া পাওয়া যায় না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ বন্ধে ফেসবুকের সাথে পুলিশের কোনো অফিসিয়াল চুক্তি নেই। ফেসবুক যা তথ্য দেয়, তা আনঅফিসিয়াল। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ট্রিটি বা এমল্যাট নামে চুক্তি করতে হয়। যদি এ চুক্তি থাকে তখন মেটা সাইবার স্পেসের এই ধরনের অপরাধগুলো নিয়ে তথ্য সরবারহ করে। তাছাড়া তথ্য দেয় না।

তিনি বলেন, ‘আইডিটি কোথা থেকে খোলা হয়েছে, কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হইছে, কোন ফোন নম্বর আইডি বা পাসপোর্ট ব্যবহার করে খোলা হইছে। সেটা ফেক হোক বা রিয়েল। এটা এক রকম চুক্তি দরকার পুলিশের সাথে মেটা কর্তৃপক্ষের। সেই আমাদের নেই। যে কারণে আমাদের পুলিশ চাইলেও অনেক কিছু করতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, ফেসবুকের সাথে পুলিশের চুক্তি আছে, কিন্তু সেটা আনঅফিসিয়ালি। ফেসবুকের যদি মন চায় তাহলে দেবে, না হলে দেবে না। পুলিশের পক্ষ থেকে মেটাকে অভিযোগ জানানোর পর যদি সাড়া না পাওয়া যায়, তখন গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশের নিজস্ব ‘বট বাহিনী’ রয়েছে। সেটির মাধ্যমে আইডিতে রিপোর্ট করে আইডি ব্লক বা জিজেবল করে দেওয়া যায়।

তানভীর হাসান জোহা আরও বলেন, এটা করা হয় মন্ত্রী, এমপি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের বা আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে। এই বট বাহিনী আবার পুলিশের সাথে সখ্যতার জের ধরে নিজেরাই কখনো কখনো বেআইনিভাবে কিছু সাপোর্ট দিয়ে থাকে। খবর: বিবিসি বাংলা।

পুলিশের বন্দুকের সামনে এই দিনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন আবু সা…
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
৩৯ বছরে এসেও ১৯ এর ফর্ম, রহস্য জানালেন মেসি
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
ঢাকা-সিলেটে রুটে বিরতিহীন ‘টাঙ্গুয়ার এক্সপ্রেস’ ও কুড়িগ্র…
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
ব্রেইন ফগের কারণেই কি বারবার ভুলে যাচ্ছেন, জেনে নিন দূর করা…
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
গোল করে আবেগাপ্লুত লাউতারো বললেন, ‘আমি এই গোল করার স্বপ্ন দ…
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
পে স্কেলের বাস্তবায়ন কয় ধাপে, মতামত দেবে না সচিব কমিটি
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence