বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস: অন্যের রক্তে বেঁচে থাকা হাজারো শিশুর গল্প

০৮ মে ২০২৬, ০৫:৫১ PM
থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল রক্তরোগ

থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল রক্তরোগ © সংগৃহীত

আজ ৮ মে, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে ১ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক। থ্যালাসেমিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। অথচ বিয়ের আগে এক সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই পারে এই আজীবনের কান্না থামাতে।

আকাশে কালো মেঘ জমলে বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া যায়, কিন্তু শরীরের ভেতরে যখন থ্যালাসেমিয়ার মতো ‘নীরব ঘাতক’ বাসা বাঁধে, তখন অনেকেই তা টের পান না। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া এখন আর কেবল একটি রোগ নয়, বরং এক বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম। ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি বংশগত কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই এখনো কতটা অসংগঠিত।

থ্যালাসেমিয়া আসলে কী?
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। সহজভাবে বললে, আমাদের শরীরে রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরির একটি কারখানা। থ্যালাসেমিয়া হলো সেই কারখানার একটি জেনেটিক ত্রুটি। ফলে কারখানাটি হয় যথেষ্ট রক্ত তৈরি করতে পারে না, অথবা যা তৈরি করে তা খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আক্রান্ত শিশুরা জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই ফ্যাকাশে হয়ে যায়, শারীরিক বিকাশ থমকে যায়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের নিয়মিত অন্যের দেওয়া রক্ত নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। এই নিরন্তর লড়াই কেবল রোগীর শরীরে নয়, বরং একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক মেরুদণ্ডও ভেঙে দেয়।

দুই কোটি বাহক: আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘অরফানেট জার্নাল অব রেয়ার ডিজিজেসে’ বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ) কর্তৃক প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অর্থাৎ, প্রায় ২ কোটি মানুষ নিজের অজান্তেই এই রোগের জিন বহন করছেন। যখন দুইজন বাহক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন জন্ম নেয় থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু, যাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায় আজীবন অন্যের দেওয়া রক্তে বেঁচে থাকা।

চিকিৎসার ব্যয় ও অবহেলার চিত্র
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিআরএফ-এর প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি “অবহেলিত বৃহৎ জনস্বাস্থ্য সমস্যা”। গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসার প্রায় ৭৪ শতাংশ খরচই পরিবারকে ব্যক্তিগত পকেট থেকে বহন করতে হয়। জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত কেন্দ্রের অভাব এবং নিরাপদ রক্তের অনিশ্চয়তা রোগীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এটি কেবল একটি মেডিকেল ইস্যু নয়, বরং একটি মানবাধিকার ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।

প্রতিরোধ কি সম্ভব? ‘শতভাগ’ উত্তর হ্যাঁ!
থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাই তাত্ত্বিকভাবে এটি ১০০% প্রতিরোধযোগ্য। সমাধানটি অত্যন্ত সাধারণ—বিয়ের আগে ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস’ নামক একটি রক্ত পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া যে আপনি বাহক কি না। সাইপ্রাস, ইরান ও ইতালির মতো দেশগুলো এই পদ্ধতির মাধ্যমেই থ্যালাসেমিয়া প্রায় নির্মূল করে ফেলেছে। বাংলাদেশে এখনো ‘প্রি-ম্যারিটাল স্ক্রিনিং’ বাধ্যতামূলক না হওয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিশু এই কষ্ট নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ রক্ষার ব্লুপ্রিন্ট ও তারুণ্যের ভূমিকা
বিআরএফ-এর গবেষণায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্লুপ্রিন্ট’ প্রস্তাব করা হয়েছে:
১. স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রিক প্রচারণা: উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সচেতন করা এবং বাধ্যতামূলক রক্ত পরীক্ষার আওতায় আনা।
২. পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তি: প্রতিটি ক্লাসের পাঠ্যবইয়ে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায় যুক্ত করা।
৩. জাতীয় নীতিমালা: বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা জনপ্রিয় করতে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় রোগী নিবন্ধন’ তৈরি করা।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবীরা আজ স্লোগান দিচ্ছেন— ‘প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান।’ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তরুণদের এই সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের সেবায় বিশেষ প্রস্তাবনা
কেবল থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা নয়, আক্রান্তদের জীবনমান উন্নয়নেও প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সমর্থন। জাতীয় বাজেটে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও গবেষণায় বিশেষ বরাদ্দ রাখা এখন সময়ের দাবি। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত রাজধানীতে আসতে হয়, যা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। এই অবস্থায় জেলা পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত মেডিকেল সেন্টার স্থাপন প্রয়োজন। পাশাপাশি, এই মরণঘাতী রোগের সঙ্গে লড়াই করা ব্যক্তিদের ‘শারীরিক প্রতিবন্ধী’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। এতে সংশ্লিষ্ট কোটা এবং অন্যান্য সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা তাদের মূলধারার সমাজে টিকে থাকার লড়াইকে আরও সহজ ও মর্যাদাপূর্ণ করবে।

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস আমাদের জন্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি একটি অঙ্গীকারের দিন। মেধার বদলে অসুস্থ শরীর নিয়ে কোনো শিশু যেন এই পৃথিবীতে বড় না হয়, সেই লক্ষ্যে আজই আমাদের সুচিন্তিত কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। দুইজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে—একটি সচেতন সিদ্ধান্ত একটি শিশুর আজীবনের কান্না থামাতে পারে। এই ৮ মে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক— “বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা, থ্যালাসেমিয়া থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা।”

তথ্যসূত্র:
Hossain, M. S., et al. (2025). Thalassemia in Bangladesh: Progress, Challenges, and a Strategic Blueprint for Prevention. Orphanet Journal of Rare Diseases. [Link: https://link.springer.com/article/10.1186/s13023-025-03744-x]

সৈয়ব আহমেদ সিয়াম
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)

জরুরি সংবাদ সম্মেলনের ডাক জামায়াতের
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
অনার্স পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা প্রধা…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
শেরপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মদ আটক
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
এসএসসির ফলের পর ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, সরকারকে ৮ পদক্ষেপ…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
নোয়াখালীতে হোটেল ম্যানেজারকে কুপিয়ে জখম, ৫ লাখ টাকা লুটের অ…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
পুলিশের ধাওয়ায় মাইক্রোবাস ফেলে পালাল মাদক কারবারি, ভেতরে মি…
  • ১৬ আগস্ট ২০২৬
nextjobzimage