বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস
বক্তব্য রাখছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন © সংগৃহীত
জটিল রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, বিয়ের পর একটি অসুস্থ সন্তান— যার দুঃখ-কষ্ট সন্তান ও অভিভাবককে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে, এর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কাজেই এই দুর্ভোগের পড়ার চেয়ে বাহকদের মধ্যে বিয়ে না হওয়া ভালো।
আজ শুক্রবার (৮ মে) বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে রাজধানীর মালিবাগে হোসাফ টাওয়ারে থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী। সভায় জানানো হয়, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে এবং সচেতনতার অভাবে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিয়ের পূর্বে নারী-পুরুষের থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি করে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের ৬০-৮০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রধান বিষয় হলো প্রতিরোধ। আর এটা সম্ভব শুধু থ্যালাসেমিয়া বহন করা স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ রোধের মাধ্যমে। কারণ তাদের সন্তানদের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বিয়ের পূর্বে নারী পুরুষের থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা দেওয়া দরকার। যেমন আগে আমরা ব্লাড গ্রুপ জানতামই না, এনআইডির বিষয়টি অনেকে গায়েই মাখেনি। যখন এনআইডি বাধ্যতামূলক হলো, তখন সব মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্রের আওতায় চলে আসলো। কাজেই মানুষকে যদি থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা যায়, তাহলে তারা রাজি হবেন।
তিনি বলেন, আমরা যদি এ রকম একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি, তাহলে বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের ব্লাডের কিছু কিছু টেস্ট করানো হবে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক ধরা পড়লে নন-থ্যালাসেমিয়ার সঙ্গে বিয়ে হবে। বিয়ে বন্ধ থাকবে না। বিয়ের পর একটি অসুস্থ সন্তান, যার দুঃখ-কষ্ট সন্তান ও অভিভাবককে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে, এর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কাজেই এই দুর্ভোগের পড়ার চেয়ে বাহকদের মধ্যে বিয়ে না হওয়া ভালো। সুতরাং বিপত্তির মনে হলেও এর চেয়ে বরং বিয়ের পূর্বে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া বহুগুন ভালো।
দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার ঘাটতির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয় যে, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের সরকারি মেডিকেল কলেজে আমরা সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে পারিনি। অনেকে বলবে, এটা কেমন কথা! এটাই বাস্তবতা যে, আমরা পারিনি। এটা স্বীকার করতে নিজের মধ্যে কোনো দীনতা থাকা উচিত না। আর্থিক সীমাবদ্ধতা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা— যে কোনো সীমাবদ্ধতার জন্য আমরা পারিনি। এটা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আমরা আপনাদেরকে আশ্বস্ত করতে চাই, বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের সকল মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ অর্থের অভাবে চিকিৎসা হবে না, এই দৃশ্যটা সরকার বাংলাদেশে রাখতে চায় না। আসন্ন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিক্ষায় বরাদ্দে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হবে।
এ ব্যাপারে গণমাধ্যম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও এগিয়ে আসতে পারেন। তারা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করতে পারেন। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য আন্দোলন গড়ে ওঠা জরুরি। গণমাধ্যমকর্মীরা এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারেন। এ সময় সাধারণ মানুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উপরও গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক জেড. এম. জাহিদ হোসেন। বলেন, এই উপায়েই উন্নত বিশ্বে থ্যালাসেমিয়ার হার কমিয়ে এনেছেন। এটা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্ভব না। এটা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও গণমাধ্যমকে তৎপর হতে হবে।
তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রক্ত সরবরাহ করা। আমরা ১৮০ মিলিয়ন মানুষের অন্তত ১০০ মিলিয়ন মানুষ রক্ত দান করতে সক্ষম। অর্থাৎ দশ কোটি। যেসব রোগী আছে, তাদের জন্য এক কোটি ব্যাগও লাগবে না। কিন্তু আমরা কতজন রক্তদান করি? আমাদের ১৮-৬০ বছর বয়সীরা তিন মাস পর পর রক্ত দান করতে পারে। তারা ছয় মাস পর যদি রক্ত দান করেন, তাহলে রোগীদের সংকট হবে না। রক্তদানে দাতার তো সংকট হবে না। বরং ১২০ দিন পর লোহিত রক্তকণিকা মরে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: থ্যালাসেমিয়ার বিস্তার রোধে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি: প্রধানমন্ত্রী
তিনি বলেন, রোগী কম হওয়ায় কোম্পানিগুলো থ্যালাসেমিয়ার ওষুধ কম উৎপাদন করে, এতে বাজারে সরবরাহ কম থাকে, দামও বেশি হয়। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সহজলভ্য করতে হবে। ২০২৬ সনে এসে এই কথা বলার অবকাশ নেই যে, এই ওষুধ পাওয়া যায় না বা এটা সহজলভ্য না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সমাজে ট্যাবু আছে যে, থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। বিষয়টি তা না। ছেলে-মেয়ে বাহক হলে বিয়ের সময় খেয়াল রাখতে হবে বিপরীত লিঙ্গের মানুষটিও যেন বাহক না হন। এটা নিশ্চিত করা গেলেই হলো। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাহক হলে থ্যালাসেমিক শিশুর জন্মের আশঙ্কা ২৫ শতাংশ (৪টি জন্মের মধ্যে অন্তত ১টি) এবং ৫০ শতাংশ বাহক হওয়ার আশঙ্কা (৪টি জন্মের মধ্যে ২টি) রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যবশত বাহক পিতা-মাতার সব সন্তানই থ্যালাসেমিয়ার রোগ নিয়ে জন্ম নিতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে আবেদন থাকবে, বিয়ের আগে যেন এটা বাধ্যতামূলক করা হয় যে, বিয়ের পূর্বে ছেলে-মেয়ের ডাক্তারি সার্টিফিকেট যেন থাকে। এটা নিশ্চিত করা গেলে এই রোগের হার বাংলাদেশে অনেক কমে আসবে। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে মফস্বলে ছড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, এ রোগের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভাগীয় শহরে কেন্দ্র করার সুযোগ করে দেওয়া দরকার। তাহলে ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল থেকে রোগীকে ঢাকায় আসতে হবে না। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতি থেকে মুক্তি পাবেন।
বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।