অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান © সংগৃহীত
চাকরিজীবনের শেষ দিন ঘনিয়ে আসাতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন চিরচেনা করিডোরে, চেয়েছিলেন অধ্যাপনা আর অসুস্থ মানবতার সেবায় আরও কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে। এজন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ ছেড়ে দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান খসরু। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ছিলেন তিনি। তবে তার পদত্যাগ গৃহীত হয়েছে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার একদিন আগে। আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ কর্মদিবস কাটিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার (৩৩ ডিসেম্বর) রাতে অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। ওই সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নির্বাহী ক্ষমতা অনুশীলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেছেন। এ পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
তবে আরও দুই মাস আগে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বুধবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যারের শেষ কর্ম দিবস ছিল। এজন্য পদত্যাগ করে ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে রিটায়ার্ড করলেন তিনি। তবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন ২ মাস আগে।’
আরও পড়ুন: পদত্যাগ করলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান
সদ্য পদত্যাগ করা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক। গত বছরের নভেম্বরে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় সরকারি দায়িত্ব পাওয়ার আগে বিএমইউর উপাচার্য ছিলেন তিনি। গত বছরের ২৭ আগস্ট তাকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছিল।
পদত্যাগ ও অবসরের বিষয়ে জানতে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আজ আমার চাকুরীজীবনের শেষ দিন। অবসরগ্রহণের নিমিত্তে বিশেষ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে প্রদত্ত আমার পদত্যাগপত্র গতকাল গৃহীত হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। দোয়া করবেন।’
একই সঙ্গে প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার রজনীকান্ত সেনের বিখ্যাত একটি গানের চার লাইন জুড়ে দিয়েছেন পোস্টে। সেটি হল— ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি; যা দিয়েছ, তারি অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তা কিছু নাওনি।’
অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বিএমইউর উপাচার্য হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএমইউর ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) সেলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে আইটি প্রতিষ্ঠা, প্রয়োগ এবং অন্তর্ভুক্তির মূল ব্যক্তি। এ ছাড়া ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন ওষুধ সংক্রান্ত নীতি ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বাংলাদেশের অল্প কয়েকজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্যতম, যারা সক্রিয়ভাবে ‘জাতীয় ওষুধ নীতি-১৯৮২’ সমর্থন করেছিলেন। তিনি সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের টাস্ক ফোর্স, টেকনিক্যাল কমিটি এবং ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফর্মুলারি এবং বাংলাদেশ কোড অব ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিং প্র্যাক্টিসের অন্যতম লেখক। বিগত ৩২ বছর ধরে তিনি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর মেডিকেল শিক্ষকতায় সম্পৃক্ত। এ ছাড়া বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) আইটি কমিটির চেয়ারম্যানও অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। অ্যাডভারস ইফেক্টিভ ফর ইমিউনাইজেশন, ন্যাশনাল অ্যাডভারস ড্রাগ রিঅ্যাকশন অ্যাডভাইজারি কমিটি এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) ইথিক্স রিভিউ কমিটির সদস্যও তিনি। এ ছাড়া ন্যাশনাল রিসার্চ ইথিক্স কমিটি এবং ন্যাশনাল ফার্মাকোভিজিল্যান্স গাইডলাইন প্রণয়নকারী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
বিএমইউর গ্লোবাল র্যাঙ্কিং স্ট্যাটাস ইমপ্রুভমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির আপগ্রেডেশন অব ইন্টিবায়োটিক গাইডলাইন, কনট্রাক্ট রিসার্চ অরগানাইজেশন ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং ইস্ট্যাবলিশবেন্ট অব বায়োব্যাংক ইন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। অধ্যাপক রহমান বাংলাদেশ এএমআর রেসপন্স এলিয়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এ ছাড়া বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-ওরডিনেটর অব ফ্লেমিং ফান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
অধ্যাপনাকালে সায়েদুর রহমান বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পিএইচিডি, এমডি, এমফিল ডিগ্রির জন্য ৪০টিরও বেশি থিসিসের তত্ত্বাবধান করেছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে শতাধিক এমডি, এমএস, এমফিল ও থিসিসের পরীক্ষক এবং পর্যালোচক হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে পঞ্চাশটিরও বেশি প্রকাশনা রয়েছে। ডা. সায়েদুর রহমানের গবেষণার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ড্রাগ পলিশি, এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স, ফার্মাকোভিজিল্যান্স, ফার্মাকোইকোনোমিক্স, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস, মেডিসিন ইউটিলাইজেশন স্টাডিজ, মেডিকেল ইডুকেশন অ্যান্ড অ্যানিম্যাল স্টাডিজ।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) থেকে এফসিপিএস সম্পন্ন করেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এস্ট্যাবলিশ অব ন্যাশনাল এন্টিমাইক্রোবিয়াল কনজাম্পশন মনিটরিং সিস্টেম শীর্ষক প্রকল্পের প্রধান গবেষক ছিলেন।