খাদ্য গুণাগুণ © সংগৃহীত
কিটো ডায়েট হলো এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যেখানে চর্বির পরিমাণ খুব বেশি এবং কার্বোহাইড্রেট অত্যন্ত কম। দ্রুত ওজন কমানো এবং বিপাকক্রিয়ার উন্নতির কারণে এই ডায়েট সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১৯২০-এর দশকে মৃগী রোগের চিকিৎসা হিসেবে কিটো ডায়েটের ব্যবহার শুরু হলেও, পরবর্তীতে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ ফিটনেসের জন্যও ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়। তবে স্বল্পমেয়াদে কিছু উপকারিতা থাকলেও, দীর্ঘ সময় ধরে এমন চরম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উটাহ হেলথ-এর গবেষকদের করা একটি নতুন গবেষণা এ বিষয়ে নতুন করে আলোকপাত করেছে। Science Advances জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দীর্ঘ সময় ধরে কিটো ডায়েট অনুসরণের ফলে বিপাকক্রিয়াজনিত ঝুঁকি, বিশেষ করে লিভারের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ইঁদুরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, কিটো ডায়েট ওজন বাড়তে না দিলেও লিভারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চর্বি জমে, যা ফ্যাটি লিভার রোগ বা হেপাটিক স্টিয়াটোসিস নামে পরিচিত। এটি দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে পরিচিত।
নতুন গবেষণায় কী পাওয়া গেছে, কীভাবে এটি করা হয়েছে, মানবস্বাস্থ্যের জন্য এর অর্থ কী এবং কিটো ডায়েট ও লিভারের কার্যকারিতা নিয়ে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—এসব বিষয়ই এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কিটো ডায়েটের প্রভাব: ইঁদুরের ওপর গবেষণা
গবেষকরা প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরদের নয় মাস ধরে চার ধরনের খাদ্য দিয়েছেন—
* একটি আদর্শ কিটোজেনিক ডায়েট
* একটি প্রচলিত পশ্চিমা উচ্চ-চর্বিযুক্ত ডায়েট
* একটি কম-চর্বিযুক্ত, উচ্চ-কার্বোহাইড্রেট ডায়েট
* প্রোটিনের পরিমাণ সমান রেখে তৈরি করা একটি কম-চর্বিযুক্ত ডায়েট
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা ডায়েটের তুলনায় কিটো ডায়েট ইঁদুরদের ওজন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ঠেকাতে পেরেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে অপ্রত্যাশিত বিপাকগত সমস্যা। শরীরের ওজন কম থাকলেও কিটো ডায়েটে থাকা ইঁদুরদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে, যা ফ্যাটি লিভার রোগের লক্ষণ। এটি বিপাকক্রিয়ার ত্রুটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এবং ভবিষ্যতে আরও গুরুতর লিভার রোগের পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হয়।
বিশেষ করে পুরুষ ইঁদুরদের লিভারের অবস্থা বেশি খারাপ ছিল। তাদের ক্ষেত্রে স্ত্রী ইঁদুরদের তুলনায় লিভারে চর্বি জমার মাত্রা বেশি দেখা গেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক আমানদিন শেক্স (পিএইচডি) এ বিষয়ে বলেন, ‘একটি বিষয় একেবারে পরিষ্কার—আপনি যদি খুব বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খান, সেই চর্বি কোথাও না কোথাও জমবেই। সাধারণত তা রক্তে এবং লিভারে জমে।’
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও ব্যাঘাত
কিটো ডায়েট ইঁদুরদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে। কয়েক মাস পর দেখা যায়, কিটো ডায়েটে থাকা ইঁদুরদের উপবাস অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রা কম। তবে যখন আবার কার্বোহাইড্রেট দেওয়া হয়, তখন তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, দীর্ঘদিন উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে গ্লুকোজ সহনশীলতা এবং ইনসুলিন নিঃসরণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
গবেষকরা এই সমস্যার সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষের ওপর চাপের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। এই বিটা কোষগুলোই ইনসুলিন তৈরি করে। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত চর্বির সংস্পর্শে থাকলে এই কোষগুলোর ইনসুলিন প্রক্রিয়াজাত ও নিঃসরণ ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। তবে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ইঁদুরদের কিটো ডায়েট থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর কিছু বিপাকগত সমস্যা আংশিকভাবে ঠিক হতে শুরু করে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ক্ষতির কিছু অংশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
কিটো ডায়েট ভাবছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য এর অর্থ কী
উটাহ হেলথের এই গবেষণা দেখিয়েছে যে শুধু ওজন কমানোর দিকে নজর দিলে বিপাকস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উপেক্ষিত হতে পারে। ফ্যাটি লিভার রোগ—even যাঁরা স্থূল নন তাঁদের মধ্যেও—দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, লিভারের কার্যকারিতা হ্রাস এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাঁরা কিটোজেনিক ডায়েট অনুসরণের কথা ভাবছেন, তাঁদের উচিত—
* দীর্ঘমেয়াদে কিটো ডায়েট অনুসরণের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা
* নিয়মিত লিভার ফাংশন, লিপিড প্রোফাইল ও গ্লুকোজ সহনশীলতা পরীক্ষা করা
* অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ চরম কিটো ডায়েট এড়িয়ে চলা
* তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বেশি নিরাপদ ও টেকসই কি না, তা বিবেচনা করা
ইঁদুরের ওপর করা এই নতুন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অত্যন্ত উচ্চ-চর্বিযুক্ত কিটোজেনিক ডায়েট ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও দীর্ঘদিন অনুসরণ করলে ফ্যাটি লিভার রোগ এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যদিও মানুষের ওপর করা স্বল্পমেয়াদি কিছু গবেষণায় কিটো ডায়েটের উপকারিতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলো সরাসরি মূল্যায়ন করে না।
তাই আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন—দীর্ঘ সময় কিটো ডায়েট অনুসরণে সতর্ক থাকতে হবে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে এবং সামগ্রিক বিপাক ও লিভার স্বাস্থ্যের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ পুষ্টির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সংবাদসূত্র: এনডিটিভি