প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নচিন্তার ইতিহাসে শিক্ষা সবসময়ই একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। যে জাতি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, সেই জাতিই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ও সভ্যতার পথে এগিয়ে যায়। মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক ও দার্শনিক থমাস জেফারসন একবার বলেছিলেন, “An educated citizenry is a vital requisite for our survival as a free people ।” অর্থাৎ একটি শিক্ষিত নাগরিক সমাজই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শক্তি ও স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সত্য গভীরভাবে প্রযোজ্য। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে আজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একদিকে বিস্তৃত হলেও অন্যদিকে নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শিক্ষার মান, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক এখনও দুর্বল। ফলে শিক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দক্ষতাভিত্তিক করে তোলার একটি বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার পরিকল্পনা এবং ভিশন ২০৩০-এর মধ্যে শিক্ষা খাতকে একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষাকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত করা, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন করা এবং শিক্ষাকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সংকট বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো প্রয়োজন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩২.৮৫ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১.৫১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সময়ে মাধ্যমিক স্তরের নেট এনরোলমেন্ট রেট প্রায় ৭২ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে প্রায় ৫২ শতাংশের কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ধরে রাখা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতির পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। দারিদ্র্য এখনও শিক্ষার পথে বড় বাধা। অনেক পরিবার তাদের সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বহন করতে পারে না, ফলে শিশুরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। আবার গ্রামীণ সমাজে বাল্যবিবাহ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, যার ফলে বহু মেয়েশিশুর শিক্ষাজীবন মাঝপথে শেষ হয়ে যায়।
একই সঙ্গে শিক্ষার প্রতি অনীহা এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগের অভাবও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহহীনতা সৃষ্টি করে। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও প্রকৃত অর্থে শেখার সুযোগ পায় না। বিশ্বব্যাংকের মানবসম্পদ সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা গড়ে প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে থাকলেও কার্যকর শেখার সমতুল্য সময় প্রায় ৬ বছরের কাছাকাছি। একই সঙ্গে প্রায় ৫৮ শতাংশ শিশু দশ বছর বয়সেও একটি সহজ পাঠ্য ঠিকভাবে বুঝে পড়তে পারে না—যা “লার্নিং পোভার্টি” নামে পরিচিত। এই বাস্তবতা দেখায় যে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাবিদ জন ডিউই শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, “Education is not preparation for life; education is life itself ।” অর্থাৎ শিক্ষা ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নয়; এটি মানুষের চিন্তা, অভিজ্ঞতা এবং জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা এখনও মুখস্থনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানকে বিশ্লেষণ বা প্রয়োগ করার সুযোগ পায় না। একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত সৃজনশীল চিন্তা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা তৈরি করা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা। সাম্প্রতিক বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি এবং জিডিপির তুলনায় প্রায় ২ শতাংশের মতো। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য শিক্ষায় ব্যয় হওয়া উচিত জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। অপর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক বিদ্যালয়ে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই এবং অনেক জায়গায় শিক্ষক সংকট রয়েছে। আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তির অভাবও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ শিক্ষক।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল বিশ্বব্যাপী সফলতার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। সেখানে শিক্ষকরা অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এবং সমাজে তাদের মর্যাদা অনেক বেশি। বাংলা সাহিত্যিক ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য দেওয়া নয়; মানুষের মনকে মুক্ত করা।” এই মুক্ত চিন্তার পরিবেশ ছাড়া কোনো শিক্ষাব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে না। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো শিক্ষা এবং শ্রমবাজারের মধ্যে সংযোগের অভাব। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের অনেকেই কর্মসংস্থান পায় না। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর একটি প্রধান কারণ হলো শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের দুর্বল সংযোগ।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শিক্ষা সংস্কারের একটি বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার পরিকল্পনা-এ শিক্ষাকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় শিক্ষাক্রম আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার নিরাপত্তা ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে নির্ধারণ করছে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়; প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সুযোগ দিতে হবে। তারেক রহমান উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার তার পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও বাস্তব দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থান পায় না। মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষা চালু করলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।
বিশ্বের অনেক দেশ শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত উন্নয়ন অর্জন করেছে। সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ বলেছিলেন, “The wealth of a nation lies in its people ।” অর্থাৎ একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার জনগণ। এই জনগণকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা। দক্ষিণ কোরিয়াও শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে একটি দরিদ্র দেশ থেকে প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world ।” এই উক্তি আজকের বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন, “নারীকে অশিক্ষিত রেখে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না।” বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু পরিবর্তন।
তাপদাহ, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রায়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়। ফলে লক্ষ লক্ষ শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়। ভবিষ্যতে জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তিগত ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে শিক্ষা সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। যদি শিক্ষাকে আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, তবে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি শক্তিশালী মানবসম্পদে পরিণত হবে। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—যে জাতি শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, সেই জাতিই ভবিষ্যৎ জয় করে।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের শিক্ষার সংকট গভীর, কিন্তু এর সম্ভাবনাও অফুরন্ত। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের বড় সম্পদ। যদি এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে ২০৪১ সালের আগেই বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে পারে। তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ৩১ দফা এবং ভিশন ২০৩০-এর শিক্ষা বিষয়ক সংস্কারগুলো একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। প্রকৃত শিক্ষা হবে সেইটি যা মানুষকে অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেবে। বেগম রোকেয়ার মতো আমাদেরও বিশ্বাস করতে হবে যে কলম তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী। শিক্ষার এই সংকট নিরসনে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জাতীয় ঐক্য এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয় প্রয়োজন। যদি আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোকে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পারি, তবেই বাংলাদেশ একটি ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়