আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় মানুষের শরীরেও নানান পরিবর্তন আসে © টিডিসি সম্পাদিত
ভেজা আবহাওয়ায় কি সত্যিই বাতের ব্যথা বাড়ে? বায়ুচাপ কমলে কি মাথাব্যথা হয়? তাপমাত্রা কি অনাগত সন্তানের লিঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে? দীর্ঘদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত এসব ধারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে হয়েছে নানা গবেষণা। কিছু ক্ষেত্রে মিলেছে আংশিক প্রমাণ, আবার কিছু বিষয় এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।
২০১৩ সালে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর কেস প্রকাশ করেন। এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, ঝড় আসার আগে তিনি বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ অনুভব করেন, যেন স্কাঙ্ক প্রাণির বিষ্ঠা ও পেঁয়াজের মিশ্রণ। গবেষকরা এর সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পেলেও ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তোলে, আবহাওয়ার সূক্ষ্ম পরিবর্তন কি সত্যিই আমাদের শরীরে প্রভাব ফেলে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে শুরু করে মাইগ্রেন, এমনকি জন্মহার পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে সব দাবিই সমানভাবে প্রমাণিত নয়।
বৃষ্টি ও বাতের ব্যথা; কাকতালীয় নাকি বাস্তব?
অনেকেই মনে করেন, ভেজা ও ঝোড়ো আবহাওয়ায় জয়েন্টের ব্যথা বাড়ে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের উপসর্গের ওপর আবহাওয়ার কোনো ধারাবাহিক প্রভাবের স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
গবেষকদের মতে, এটি হতে পারে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ অর্থাৎ মানুষ বিশ্বাস অনুযায়ী ঘটনাকে বেশি মনে রাখে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিছু গবেষণায় আংশিক প্রমাণও পাওয়া গেছে। রোগীর জীবনযাপন, পোশাক বা ঘরের ভেতরে-বাইরে থাকা এসব বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বায়ুচাপ কমলে মাথাব্যথা?
জাপানে পরিচালিত এক গবেষণায় ২৮ জন মাইগ্রেন রোগীর এক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বায়ুচাপ কমার সময় মাথাব্যথার প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুচাপ কমলে মাথাব্যথার ওষুধের বিক্রি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বায়ুচাপের পরিবর্তন আমাদের ভেস্টিবুলার সিস্টেমে প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মাথা ঘোরা ও মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শীতে বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি?
শীতকাল এলে শুধু সর্দি-কাশি নয়, হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। একটি চীনা গবেষণায় দেখা গেছে, বসন্ত ও গ্রীষ্মের তুলনায় শীতে হৃদরোগে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়াকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
উষ্ণ আবহাওয়ায় বেশি পুত্রসন্তান?
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর গোলার্ধে উষ্ণ বছরে তুলনামূলকভাবে বেশি পুত্রসন্তান গর্ভধারণের প্রবণতা দেখা যায়। আবার ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লন্ডনের তীব্র স্মগের পরবর্তী সময়ে কন্যা সন্তানের হার বেড়েছিল।
আরও পড়ুন: আমার সপ্তাহ ৮ দিনে, ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে প্রস্তুত: শিক্ষামন্ত্রী
এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা। কেউ বলছেন, তাপমাত্রা হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে; আবার কেউ মনে করেন, এটি একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার অংশ। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এই প্রভাব খুবই সামান্য এবং পরিবার পরিকল্পনায় এর কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই।
মহাজাগতিক ঝড় ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক?
সূর্য থেকে আসা জিওম্যাগনেটিক ঝড় ও কসমিক রশ্মি নিয়েও রয়েছে চমকপ্রদ দাবি। লিথুয়ানিয়ায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মহাজাগতিক কর্মকাণ্ডের সময় হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মৃত্যুহার বেড়েছে।
আরেক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এমন সময়ে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের গড় আয়ু প্রায় পাঁচ বছর কম হতে পারে। তবে এসব ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি আরও গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
আবহাওয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে এটি নিশ্চিত। তবে শরীরের জটিল পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা গভীর, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিছু ক্ষেত্রে আংশিক প্রমাণ মিললেও, অনেক দাবিই এখনো গবেষণাধীন।
তাই বৃষ্টি নামলেই বাতের ব্যথার জন্য প্রস্তুত হওয়া বা তাপমাত্রা দেখে সন্তানের লিঙ্গ অনুমান করার আগে মনে রাখা ভালো বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত কথা বলেনি। (সূত্র: বিবিসি)