শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৩ দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা © ফাইল ছবি
অন্তত তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে সংশ্লিষ্ট এমপিকে চেয়ারম্যান করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ, আগের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছেন বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতারা। শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক নবনির্বাচিত এমপি অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আজ রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ সময় এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এ সময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ শিক্ষক নেতা, সাধারণ শিক্ষক ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। লিখিত দাবিপত্রে মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, অসংখ্য শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত ও জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকার শুধু গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করেনি, ভয়ংকর রুপে ছোবল মেরেছে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।
বিপর্যন্ত শিক্ষা-ব্যবস্থার সংস্কারে মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ায় শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান সেলিম ভূঁইয়া। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দাবি ও সুপারিশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১. শিক্ষা কারিকুলাম: শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে একটি উন্নত কারিকুলাম। তাই আমাদের দাবি, সর্বাগ্রে একটি যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে।
২. শিক্ষক কর্মচারীদের চাকুরী জাতীয়করণ: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক কর্মচারীরা নানাভাবে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার। তাদের চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক নিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। আমাদের দাবি, অনতিবিলম্বে শিক্ষক কর্মচারীদের চাকুরী জাতীয় করণ করতে হবে।
৩. অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট গতিশীল করা: শিক্ষক কর্মচারীরা জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষক কর্মচারীরা নিষ্ঠা ও সততার সহিত স্বল্প বেতনে চাকুরী করে অবসর গ্রহণ করতেন। বেগম খালেদা জিয়া জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর ২০০১ সালে শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা প্রদান করেন এবং কল্যাণ ট্রাস্ট গতিশীল করেন।
অবসর সুবিধা তহবিল ও কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ প্রদান করেন, ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দ্রুততম সময়ে তাদের প্রাপ্য টাকা পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে নূন্যতম জীবন ধারনের অবলম্বন খুজে পেতেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার এই দুটি তহবিলে কোনরুপ অর্থায়ন করেন নাই উপরন্তু গচ্ছিত তহবিল নানাভাবে তছরুপ করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৮০-৯০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অবসরের টাকা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছেন। অনেক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
এঅবস্থায় তাদের দাবি (১) সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং (২) পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্ধ দান করে অবিলম্বে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার গঠনের পর অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কমিটির দুর্নীতিবাজরা পলায়ণ করেন। পরিতাপের বিষয় অদ্যাবধি কমিটি গঠন না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানারুপ তালবাহানা করে।
শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা আরো অবগত হয়েছি যে, বেসরকারী শিক্ষকদের দ্বারা বোর্ড গঠনের পরিবর্তে সরকারী শিক্ষকদের মাধ্যমে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যান ট্রাস্টের কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করার পায়তারা করছেন। এ ধরনের উদ্যোগ কোনভাবেই শিক্ষক সমাজ মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে তাদের সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কমিটি গঠনের জোর দাবী জানাচ্ছি।
৪. ম্যানেজিং কমিটি: শিক্ষার পরিবেশ সুষ্ঠু রক্ষার স্বার্থে ম্যানেজিং কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দ্বরা কমিটি গঠন করলে কমিটির দক্ষতা ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। অবিলম্বে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবী জানাচ্ছি।
৫. শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল চালু করা: শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে হলে মেধা সম্পন্ন শিক্ষকের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে একজন শিক্ষকের স্কেল ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা অত্যন্ত নগন্য নয়, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শিক্ষককে পরিহাস করার সামিল। তাই অবিলম্বে শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল চালু করতে হবে।
৬. বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও প্রাপ্তি বিনোদন ভাতা প্রদান: বর্তমানে শিক্ষকদের মাত্র ৭ শতাংশ বাড়ি ভাড়া প্রদান করা হয়। এত সামান্য অর্থ কোনভাবেই বাড়ি ভাড়া পাওয়া সম্ভব না। এছাড়া শিক্ষক কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। এত কম টাকায় কোন ডাক্তার পাওয়া যায় না।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালে শিক্ষকদের জন্য ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীদের জন্য ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা প্রদান করেছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকার ১ শতাংশও বৃদ্ধি করেনি। অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষকদের জন্য ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। কিন্তু কর্মচারীদের জন্য কোন বৃদ্ধি করা হয়নি। শিক্ষক কর্মচারীদের সরকারী নিয়মে বাড়ীভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও শান্তি বিনোদন ভাতা প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
৭. এনটিআরসিএর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছকরণ: অনাগত শিক্ষকদের গুনগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা ছিলো বিএনপি সরকারের একটি অনন্য উদ্যোগ। কিন্তু সেই এনটিআরসিএ-কে একটি দুর্নীতির আখড়া হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নিয়োগ বানিজ্য, নিয়োগ অনিয়ম, সনদ প্রদানে অনিয়মসহ নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করে তোলা।
অতি সম্প্রতি অধিকতর বানিজ্য করার লক্ষ্যে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ লাভের ক্ষমতা কব্জা করে নিয়েছে। ১-১২ তম নিবন্ধন ধারীদের নানা অপকৌশলে যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দান না করে জাল সনদের মাধ্যমে অনেক কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অবিলম্বে ১-১২ তম ব্যাচের যোগ্যতা সম্পন্নদের নিয়োগ দানের অনুরোধ জানাচ্ছি।
৮. দক্ষ শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা: বিগত সময়ে ফ্যাসিষ্ট সরকার, অসৎ অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদেরকে নিয়োগ দানের মাধমে শিক্ষা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ ও অদক্ষ করে তোলা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় গুনগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ও বেসরকারী শিক্ষকদের সমন্বয়ে দক্ষ শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলার আহবান জানাচ্ছি।
৯. চাকুরিচ্যুত শিক্ষকদের পূণর্বহাল ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা: বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের দলীয় করণে কিংবা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহনের কারণে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ও কারিগরী অসংখ্য শিক্ষককে চাকুরীচ্যুত করা হচ্ছে। সকল চাকরিচ্যুতদের পূনর্বহাল ও ক্ষতিপূরন প্রদানের জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।
আরও পড়ুন: পদত্যাগ করলেন ঢাবি ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান
১০. স্বীকৃতি প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দলীয় বিবেচনায় বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করলেও যোগ্যতাসম্পন্ন বহু প্রতিষ্ঠানকে এমপিও ভূক্ত করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এমপিও ভূক্ত করার একটি উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। বিএনপিজোট সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্যতা থাকা সত্বেও ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে,অথচ শেখ পরিবারের নামে গড়ে উঠা নাম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হয়েছে। এমতাবস্থায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভূক্ত করার জোর দাবী জানাচ্ছি।
১১. কারিগরী শিক্ষার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া: দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে হলে কারিগরী শিক্ষার উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে আশু করনীয়গুলো হলো- ১) এইচএসসি (বিএম কোর্স খোলা); ২) ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং এর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো এমপিওভুক্ত করা; ৩) কারিগরী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা এবং ৪) কারিগরী শিক্ষকদের দেশে/বিদেশে প্রশিক্ষন প্রদানের ব্যবস্থা করা।
১২. প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা: শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৩. কিন্ডারগার্টেনগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতাভূক্ত করা: বর্তমানে দেশে অজস্র কিন্ডারগার্টেন ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গড়ে উঠেছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে।
মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, পরিশেষে আমাদের সময় দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ দানের জন্য আপনার প্রতি তজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আশা করি উপরোক্ত সমস্যাসমূহ সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে শিক্ষাক্ষেত্রে পাবলিক পরিবর্তন সাধনে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটকে সাথে নিয়ে কাজ করবেন।