সোনার অলংকার © সংগৃহীত
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম যে বছর, সেই ১৯৭১ সালে সোনার ভরি ছিল মাত্র ১৭০ টাকা। ৫৪ বছর পর সোনার দাম ভরিতে দুই লাখ ছাড়িয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশেও হু হু করে বাড়ছে মূল্যবান ধাতুর দাম। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনা বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৩ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলারে। আর দেশের বাজারে এদিন ভালো মানের এক ভরি (২২ ক্যারেটের হলমার্ক) সোনা কিনতে গ্রাহকের খরচ হয়েছে ২ লাখ ৭২৬ টাকা। বুধবার থেকে ওই দাম বেড়ে হয়েছে ২ লাখ দুই হাজার ১৯৫ টাকা।
অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সোনার দামের সম্পর্ক বেশ পুরনো। অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা মানেই সোনার বাজারে ঊর্ধ্বমুখী। অস্থির সময়ে বিভিন্ন দেশ সোনায় বিনিয়োগ করে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সোনার দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন দেশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের গত এপ্রিলে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে সোনার দাম বেড়েছে সাড়ে ৫০০ ডলার।
কিনবেন নাকি বেচবেন?
এই অস্থির সময়ে নতুন করে সোনায় বিনিয়োগ বুদ্ধিমানের কাজ হবে, নাকি পুরোনো অলংকার বিক্রি করে দেয়া উচিত, সেই প্রশ্ন ঘুরছে অনেকের মাথায়। সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখে নিই, পুরোনো অলংকার বিক্রির মুনাফা কেমন?
দেশে সাধারণত পুরোনো অলংকার জুয়েলার্সে বিক্রি করতে গেলে তারা ওজন করার পর তা কোন ক্যারেটের সোনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হন। তারপর অলংকারটির বর্তমান ওজন থেকে ১৭ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হবে। ধরুন, আপনি ১০ বছর আগে প্রায় ৪৩ হাজার টাকায় ২২ ক্যারেটের এক ভরি ওজনের অলংকার কিনেছিলেন। এখন সেটি বিক্রি করতে গেলে আপনি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০২ টাকা পাবেন। তাতে ভরিতে আপনার মুনাফা হবে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬০২ টাকা। ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অলংকার হলে মুনাফা ভিন্ন হবে।
তবে অলংকারটি যে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা, সেখানেই নিলে গ্রাহকের লাভ বেশি। এক্ষেত্রে অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে সোনা কেনার রসিদ। কারণ অন্য কোনো জুয়েলার্সে অলংকার বিক্রি করতে গেলে তারা অলংকারের বর্তমান ওজন থেকে ২২-২৪ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করবে, ফলে মুনাফা অনেকটাই কমে যাবে।
দাম বাড়ছে এবং যেহেতু রেকর্ড ক্রস করছে এখন বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। যদি বাড়েও তাহলে সেই বাড়তি অংশটুকু পরে সমন্বয় হয়ে যাবে। যখন একটা সীমা অতিক্রম করে, তখন সর্বোচ্চ ১০-২০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব কিছু বিবেচনায় ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সোনায় স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগ লাভজনক হবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করে করলে আসলে লাভ হবে না - ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
দেশে সোনায় সরাসরি বিনিয়োগ করার সুযোগ কম। সহজ উপায় হচ্ছে, অলংকার কেনা। তবে অলংকার কিনতে গেলে সোনার দামের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট ও মজুরি যুক্ত হবে। সোনার বাজার এখন খুবই অস্থির, তাই অলংকার কিনে বিনিয়োগ করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অলস পড়ে থাকা টাকা বিনিয়োগ করা যেতে পারে বলে পরামর্শ জুয়েলার্স ব্যবসায়ীদের।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পৃথিবীতে যখন অস্থিরতা তৈরি হয়, তখনই দেখা যায় মানুষ সোনাতে বিনিয়োগ করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এক দেশ আরেক দেশের যুদ্ধ, মার্কিন শিল্প যুদ্ধ সবকিছু মিলেই দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া ফেডারেল রিজার্ভ ইন্টারেস্ট কমানোর সিদ্ধান্তও সোনার দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সোনায় বিনিয়োগ করা উচিত হবে না বলে মনের ঢাবির এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় দাম বাড়ছে এবং যেহেতু রেকর্ড ক্রস করছে এখন বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। যদি বাড়েও তাহলে সেই বাড়তি অংশটুকু পরে সমন্বয় হয়ে যাবে। যখন একটা সীমা অতিক্রম করে, তখন সর্বোচ্চ ১০-২০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব কিছু বিবেচনায় ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সোনায় স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগ লাভজনক হবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করে করলে আসলে লাভ হবে না।
আরও পড়ুন : দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশে পৌঁছাবে, পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
পৃথিবীতে যত সোনার অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে তার অর্ধেকের বেশি চাহিদা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সেন্ট্রাল ব্যাংক। ওই দুটো রিজার্ভ ব্যাংকেরও কিন্তু একটা লিমিট আছে এবং রিজার্ভের ক্যাপাসিটি আছে। সেই জায়গা থেকেও অনুমান করা যায়, স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হলেও সোনায় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে এখন লাভের সম্ভাবনা খুবই কম।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের সোনার অলংকার বেশি তৈরি হয়। সনাতন পদ্ধতির অলংকার সেই অর্থে তৈরি হয় না। ২২ ক্যারেটের এক ভরি অলংকারে ১৪ আনা ২ রতি বিশুদ্ধ সোনা থাকে। এছাড়া ২১ ক্যারেটে ১৪ আনা, ১৮ ক্যারেটে ১২ আনা বিশুদ্ধ সোনা এবং সনাতন পদ্ধতির অলংকারে সর্বোচ্চ ১০ আনা বিশুদ্ধ সোনা থাকে। আর জানেন তো, ১৬ আনায় ১ ভরি, ৬ রতিতে ১ আনা।