মব © প্রতীকী ছবি
দেশজুড়ে একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যা ও অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি হঠাৎ করে বাড়ছে খুন, হত্যা ও অপমৃত্যুর মতো ঘটনা। মধ্যরাতে কিংবা ভোরে কোথাও কোথাও ঘটছে গুপ্ত হামলাও। এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসের প্রথম ১০ দিনে দেশে অন্তত ১৩টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন, আহত হয়েছেন আরও ১৩ জন। সর্বশেষ, গত ৯ আগস্ট রংপুরে চোর সন্দেহে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন মাদারীপুরে চোর সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনির পর একজনের চোখ তুলে ফেলার চেষ্টা হয়। এছাড়াও মুন্সীগঞ্জে সেপটিক ট্যাংকে তিন শ্রমিকের লাশ, নরসিংদীর মনোহরদীতে আরো এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) এনামুল হক সাগর বলেন, দেশে মানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থার কোনো ঘাটতি নেই। সারা দেশে দিনে-রাতে পুলিশের প্রয়োজনীয় টহল ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে। আমাদের পুলিশের নিরাপত্তার কোনো সংকট নেই বললেই চলে।
অপরদিকে, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএফএস) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। এর সঙ্গে আগস্ট মাসের প্রথম ১০ দিনের ঘটনা যুক্ত করলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৭। এ সময়ে আহত হয়েছেন ২৬৬ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত কমপক্ষে ১১১ জন মানুষ ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।
বেসরকারি এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘পালস সার্ভে ৩’ শিরোনামে সাম্প্রতিক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে, হত্যা ও অপমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন। এরমধ্যে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ৫৬ শতাংশ, রাতে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ৬১ শতাংশ এবং পোশাকের কারণে রাস্তায় হয়রানি নিয়ে উদ্বিগ্ন ৬৭ শতাংশ মানুষ।
বর্তমানে সরকারও মব নিয়ে স্বস্তিতে নেই। এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, দেশে মব সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশের নৈতিক অবস্থান ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারছে না।
আরও পড়ুন: পুলিশ সদস্যকে কোপানোর ঘটনায় আটক ১০২ জন
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, যখন সামাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বেড়ে যায়, তখন মানুষও মানুষের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তাৎক্ষণিক হত্যা ও সংঘবদ্ধ মবের ঘটনা ঘটছে। আগস্টের প্রথম ১০ দিনের ১৩টি গণপিটুনির ঘটনা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮টিতেই চোর সন্দেহে মারধর করা হয়েছে। বাকি পাঁচটি ঘটনার কোনোটি চাঁদাবাজি, কোনোটি পূর্বশত্রুতার কারণে, কোনোটি বিরোধ থেকে ঘটানো হয়েছে।
জানা যায়, বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের এগারো মাস পরও থামেনি রাজনৈতিক অস্থিরতা, হত্যা ও অপমৃত্যুর ঘটনা। সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে বেড়েই চলেছে ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অপমৃত্যুর ঘটনা। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের আইনশৃঙ্খলার ওপর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সর্বস্তরের মানুষ। আতঙ্ক বেড়েছে সাধারণ বা রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝেও। রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বে হতাহতের ঘটনা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে দুষ্কৃতকারীদের হাতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিহত হওয়ার ঘটনা।
সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গোয়েন্দারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখলকে কেন্দ্র করে এসব হত্যা ও অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশজুড়ে বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, সেই সঙ্গে বাড়ছে গণপিটুনি। সেটা নিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দেশে সহিংসতার নামে হত্যা ও অপমৃত্যুর মতো ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখছি। এটা ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব মব ভায়োলেন্সে কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়ত্ব দেখা যাচ্ছে। যার কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মব সহিংসতা ছোঁয়াচে রোগের মতো। এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়াও কোনো অপরাধের তথ্য থাকলে বা কারও বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ থাকলে সুনাগরিক হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।