কেকেআর দল © সংগৃহীত
শনির দশা যেন কাটছেই না ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর)। টুর্নামেন্ট শুরুর আগ থেকেই একের পর এক জটিলতা, বিতর্ক আর অনিশ্চয়তায় জর্জরিত ছিল দলটি। জনপ্রিয় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর সেই দুর্ভোগ আরও বহুগুণে বেড়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সে ভরাডুবির পাশাপাশি পরিকল্পনা, স্কোয়াড ব্যালান্স এবং ইনজুরি—সব মিলিয়ে কার্যত বিপর্যস্ত কেকেআর। এখন পর্যন্ত ৫ ম্যাচ খেলে একটিতেও জয়ের দেখা পায়নি শাহরুখ খানের দল।
অনেকেই বলছেন, গত ৩ জানুয়ারি থেকেই কলকাতার দুর্দশার শুরু। সেদিন বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই) সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া কেকেআরকে নির্দেশ দেন, যেন বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। বোর্ডের সেই নির্দেশ মেনে নিতেও বাধ্য হয় ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। এতে ছিটকে যান কাটার-মাস্টার, যদিও আইপিএলের মিনি নিলামে তাকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছিল কেকেআর। মূলত দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে মুস্তাফিজকে দলে ভিড়িয়েছিল কলকাতা। তাই স্বাভাবিকভাবেই কোচিং স্টাফের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন তিনি।
এদিকে দ্য ফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পরই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে। প্রতিবাদস্বরূপ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), যা দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেও উত্তেজনা বাড়ায়।
অন্যদিকে ফিজের বিকল্প হিসেবে পরে জিম্বাবুয়ের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানিকে দলে নেয় কেকেআর। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই ভারতীয় পেসার হার্ষিত রানা এবং আকাশ দ্বীপও ইনজুরিতে ছিটকে যান। একইসঙ্গে শ্রীলঙ্কার পেস সেনসেশন মাথিশা পাথিরানাকে শুরু থেকেই পায়নি দলটি, তাকে ১৮ কোটি রুপিতে দলে নিয়েছিল কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজি। ফলে, আইপিএল শুরুর আগেই কেকেআরের বোলিং ইউনিট কার্যত ভেঙে পড়ে।
মাঠের পারফরম্যান্সেও সেই ব্যর্থতার প্রতিফলন স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। ৫ ম্যাচ খেলে এখন পর্যন্ত কোনো জয় পায়নি কেকেআর। ৪ ম্যাচে হার এবং একটি পরিত্যক্ত হওয়ায় তাদের সংগ্রহ মাত্র ১ পয়েন্ট। ১০ দলের মধ্যে পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে দলটি। আইপিএলের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্রথম ৫ ম্যাচ খেলেও জয়শূন্য কেকেআর।
এদিকে দলের ব্যাটিং লাইনআপেও চরম ব্যর্থতা চলছে। এখনও প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দিতে পারেননি ২৫ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়া ক্যামেরন গ্রিন। চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে গোল্ডেন ডাকও মেরেছেন।
অন্যদিকে ওপেনিংয়ে ফিন অ্যালেনও ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরছেন। তবে স্কোয়াডে থাকলেও এখনো একাদশে সুযোগ পাননি টিম সেইফার্ট। আরেক কিউই ব্যাটার রাচিন রবীন্দ্রকেও এখনও কোনো ম্যাচ খেলাতে পারেনি কলকাতা। এতে কার্যত দলীয় কম্বিনেশন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বোলিংয়ে দুর্দশা তো লেগে আছেই। ইনজুরির কারণে দুই প্রধান স্পিনার সুনীল নারাইন ও বরুণ চক্রবর্তী একাধিক ম্যাচে ছিলেন না। এর মধ্যে নারাইন এক ম্যাচ এবং বরুণ দুই ম্যাচ মিস করেন। মাঝে ফিরলেও চেন্নাই ম্যাচে ছন্দহীনই ছিলেন বরুণ। নারাইন অবশ্য কিছুটা ভালো করলেও তার ৪ ওভার বাদে বাকি বোলারই প্রতিপক্ষের কাছে বারবার মার খাচ্ছে।
পেস ইউনিট তো এমনিতেই চোটে জর্জরিত। ইনজুরি, অনুপস্থিতি এবং অনভিজ্ঞতার কারণে প্রতিটি ম্যাচেই রান খরচ করছেন কেকেআর বোলাররা। নিজেও বল হাতে প্রভাব ফেলতে পারছেন না ক্যামেরন গ্রিন, দুই ওভারে ৩০ রান দিয়েও উইকেটশূন্য তিনি।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও সামান্য আশার আলো দেখছে কেকেআর শিবির। ফিটনেস টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড থেকে এনওসি পেতে যাচ্ছেন মাথিশা পাথিরানা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৯ এপ্রিল রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেই তাকে দলে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, একজন পেসার ফিরেই কি বদলে দিতে পারবে পুরো চিত্র? কারণ, ব্যাটিং, বোলিং, ফর্ম, ইনজুরি-সব মিলিয়ে চারদিক থেকেই চাপে কেকেআর। এতে দলের আত্মবিশ্বাসও একেবারে ভেঙে পড়েছে। সব মিলিয়ে কলকাতা এখন দাঁড়িয়ে গভীর এক সংকটের সামনে। ইতিহাসে এমন দুর্দশাজনক শুরু খুব কমই দেখেছে দলটি। শেষমেশ পরিস্থিতি কোনো দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার অপেক্ষায় কেকেআর ভক্ত-সমর্থকরা।