সীমান্তের শূন্যরেখায় ৪ দিন ধরে শিশুসহ ৯ জনের মানবেতর জীবন

১৭ জুন ২০২৬, ১২:৩০ PM
নারী ও দুই শিশুসহ মোট ৯ জন ৪ দিন ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন

নারী ও দুই শিশুসহ মোট ৯ জন ৪ দিন ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন © টিডিসি ফটো

সিলেটের এক দালালের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন দুই শিশুসহ ৬ জন। বিএসএফের হাতের আটকের পর কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশইনচেষ্টার শিকার হয়ে নারী ও দুই শিশুসহ মোট ৯ জন ৪ দিন ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। ৯ জনের মধ্যে দুই শিশুসহ ৬ জনের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কংশেরকুল এলাকায়। 

খোলাকাশের নিচে মানবেতরভাবে শূন্যরেখায় অবস্থান করা ছয়জন হলেন ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকূল গ্রামের রুপ মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (২৮), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (২৭), তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা ও ছয় মাস বয়সী মেয়ে ফাহিমা। এ ছাড়া, রয়েছেন বিল্লালের মায়ের মামাতো ভাইয়ের ছেলে হিমেল মিয়া (২০) এবং বিরুনিয়া কাইচান কশাইপাড়া এলাকার রিটন মিয়ার ছেলে সজিব মিয়া (২৫)।

বিজিবি ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুন দলটি এলাকা ছাড়ে। পরে তারা সিলেটের একটি মাজারে গিয়ে অবস্থান করেন। এরপর ৯ জুন সেখানকার এক দালালের মাধ্যমে ভারতে চলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে গুয়াহাটি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এ ঘটনায় ১২ জুন আসাম নিউজ নামের একটি অনলাইনেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, গত রোববার ভোরে ভারতের ঝালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকার শূন্যরেখায় তারা অবস্থান করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

বর্তমানে তাদের চারপাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া সামান্য খাবার ও পানি খেয়ে দিন কাটছে তাদের। ঘটনার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।

সীমান্তরেখায় আটকে থাকা দরিদ্র সজিব মিয়ার বাড়ি বিরুনিয়ার কাইচান কশাইপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে রয়েছে মাটির একটি ঘর। পলিথিনের ছাপড়া ঘরে রান্না করছিলেন তার সৎমা ফাতেমা আক্তার। পাশেই দাদি রুমেনা খাতুন বারবার নাতিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। সজিবের জেলে বাবা একটি মৎস্য খামারে জাল টানতে যাওয়ায় তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সজিবের বয়স যখন সাত বছর, তখন তার মা তাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে বাবা রিটন দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সজিব শারীরিক ও মানসিকভাবে ততোটা সুস্থ নয়। প্রায় তিন বছর আগে ভালুকা পৌরসভার গ্যাস অফিস এলাকায় রিয়া আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে মারিশা আক্তার নামে ১৮ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও গত ৬ জুন দাদির বাড়িতে যায় সজিব। সেখানে সে দাদির কাছে ভারতে যাওয়ার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা চেয়েছিল। এলাকার বিল্লাল তাকে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভারতে নিয়ে যেতে চাইলে দাদি টাকা দেননি।

সজিবের দাদি রুমেনা খাতুন বলেন, ‘আমার পনের’শ টাকা চেয়েচিল সজিব। ভারতে গিয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসার করার কথা বলে আমার নাতিরে নিয়ে যায় বিল্লাল। এলাকার লোকজন বলাবলি করছে আমার নাতি সীমান্তে ধরা পড়েছে। পরে কাগজপত্র পাঠাইছি। আমার নাতিডারে দেশে ফিরাইয়া দেন।’

সজিবের সৎমা ফাতেমা আক্তার বলেন, ‘শনিবার (৬ জুন) বাড়ি যাওয়ার পরদিন রবিবার ফোন করে বলছে সিলেটের একটা মাজারে আছে। থাইকা যাওনের পরদিন ফোন কইরা কইছে সিলেটের একটা মাজার আছে। পরে আর কোন যোগাযোগ নাই। আমরা টিভিতে খবরে দেখলাম আমার ছেলে সীমান্তে আটকা পড়ছে। আমরা এমন গরিব মানুষ টেহা নাই যে হেইন যাইবাম ছেলেরে দেখতাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ বলতেছে, তারে (সজিব) বলে মাইরা ফালাইয়া দিব। তারা এমন পাহাড়ের ভেতরে রাখছে, খাদ্য নাই, পোকা-মাকড়রার কামড়াইতাছে। আপনেগো কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আমার সন্তানটা আপনারা ফিরাই দিবেন।’

সীমান্তে আটকে থাকা বিল্লালের মা হাসনা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। সীমান্তে সন্তান আটকে থাকার খবর পেয়ে স্থানীয় গ্রাম পুলিশের এক সদস্যকে নিয়ে সোমবার রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সোমবার রাতেই সেখান থেকে ফিরে আসেন। সন্তান ও ছোট নাতনিদের অবস্থা দেখে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান তিনি।

হাসনা খাতুন বলেন, ‘গত রোজার ঈদের পর থেকে আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা চাইতাছিন অটোরিকশা কিইন্যা দেওনের লাগি। কিন্তু কিস্তি দিয়াম কিবায় এর লাগি সমিতি থাইকা টেহা তুইলা দেই নাই। টেহা দেইনাই কইরা রাগ কইরা বউ পোলাপান লইয়া বাড়িত থাইকা গেছে গা। আমার এক ভাইস্তারেও লগে লইয়া গেছে। শনিবার (৬ জুন) বাড়ি থাইকা সিলেট গিয়া দুই দিন মাজার আছিন। পরে হেইনের এক দালালে ভারত লইয়া গেছে।’

বিরুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছামছুল হোসাইন জানান, আমার ইউনিয়নের নারী শিশুসহ ছয়জন সীমান্তে আটকা আছে। তারা খুবই গরীব, কাজের আশায় তারা ভারতে গিয়ে ছিল। কারও মা নেই, কিংবা বাবা নেই। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা দরকার সার সবটুকু করা হবে।

বিজিবির ময়মনসিংহ সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কুড়িগ্রাম সীমান্তের ভারতীয় অংশের ভেতরে ময়মনসিংহের যে ছয়জন আটকা আছে তাদের কোনো ঠিকানা ভারতীয় পক্ষ থেকে আমরা পাইনি। আমরা বিএসএফকে বলেছি পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দাও। আমরা যাচাই করি। তারপর আমরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবো। ছয়জন ভারতের ভূমিতেই আছে এবং ভারতের দিক থেকেই তাদেরকে পুশইন করা হয়েছে। সে সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও আমরা পাঠিয়েছি বিএসএফকে। তারা ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর আসাম নিউজ নামে একটি অনলাইনে সংবাদও প্রকাশিত হয়। এখন তারা (বিএসএফ) অস্বীকারও করতে পারছে না যে ভারত থেকে পুশইন করেনি।’

দুর্নীতির মামলায় আবেদ আলীর ছেলে সোহানুরের বিচার শুরু 
  • ১৭ জুন ২০২৬
যুবদল নেতা পরিচয়ে ব্যবসায়ীকে মারধর করে জোরপূর্বক টাকা আদা…
  • ১৭ জুন ২০২৬
৪ জেলায় বিকেল ৩টার মধ্যে বজ্রবৃষ্টির সতর্কবার্তা
  • ১৭ জুন ২০২৬
মেসিকে নিয়ে হলান্ডের পোস্ট: ‘ও একটা উন্মাদ’
  • ১৭ জুন ২০২৬
সমালোচনার মুখে বাতিল হচ্ছে প্রাথমিকের পরীক্ষা ফি, আসছে নতুন…
  • ১৭ জুন ২০২৬
বিশেষ ব্যবস্থায় ভোজিনহার মাকে মার্কিন ভিসা দেওয়ার জন্য ডে…
  • ১৭ জুন ২০২৬
×