সাবেক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদ © সংগৃহীত
সাবেক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফাইজ তাইয়েব আহমেদ জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ‘কনসেপচুয়াল আর্কিটেক্ট’ হিসেবে কাজ করা ব্যক্তির যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ধারণা, উদ্ভাবন ও কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ কৃতিত্ব দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ফাইজ তাইয়েব লেখেন, ‘কারিগরের নাম মুছে ফেইলেন না! জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই উদ্যোগের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু উদ্বোধনের আলোকচ্ছটায় একটা মুখ ছিল না সেভাবে, যে মানুষটা এই জাদুঘরের কনসেপচুয়াল আর্কিটেক্ট, যিনি দিনরাত খেটেছেন, অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এই স্বপ্নটাকে দাঁড় করাতে গিয়ে। একজন আর্কিটেক্ট নিজের কাজকে কতটা গভীরভাবে ধারণ করেন, সেটা শব্দে বোঝানো যায় না। একজন কারিগরকে সামনে না রাখাটা দৃষ্টিকটু। শিল্পের কারিগরকে সম্মান দিলে কারও সম্মান কমে না।
আমি জীবনের একটা বড় সময় বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে সলিউশন আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করেছি। তাই জানি, একটা আইডিয়াকে কনসেপ্ট থেকে বাস্তবে নামানোর প্রক্রিয়াটা কতটা একলা লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের শেষে যখন কৃতিত্বের জায়গায় শুধু নীরবতা থাকে, তখন কষ্টটা ব্যক্তিগত থাকে না, এটা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।’
তিনি লেখেন, ‘দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফোরজি ও ফাইভজি সেবার জন্য ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড উন্মুক্ত করার কাজটা মনে পড়ে। টেলিনর, আজিয়াটা, রবির সাথে দফায় দফায় দরকষাকষি, অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কাজটার গুরুত্ব বোঝানো, তরঙ্গ ফি নিয়ে বার্গেইন করে সেটা পাশ করিয়ে আনা, ছয় মাসের কাজ ছয় সপ্তাহে নামিয়ে আনা, আদালতের রিট খারিজ করাতে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও অ্যাটর্নি জেনারেলের দরবারে ছোটা (৭০০ মেগাহার্জ ব্লক করে রাখা দুর্বৃত্তরা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পর্যন্ত পৌঁছে গেছিল), পিটিডি ও বিটিআরসির সমন্বয়। সেই সময় গ্রামীণফোন যখন দুই হাজার তিনশ কোটি টাকায় স্পেক্ট্রামে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে এলো, তখন বলা হলো আমরা নাকি ফেভার করেছি। অথচ গত মাসে যখন এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সোনার হরিণের মতো সেই গোল্ডেন স্পেক্ট্রাম উদ্বোধন হলো, ডিপইন্ডোর কভারেজে হিসেবে ফোরজি-ফাইভজি সেবার নতুন একটা পথ প্রশস্ত হলো, তখন কেউ মনে করলো না ছোট একটা ধন্যবাদ তো তাদের প্রাপ্য।
নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় সাইবার যুদ্ধ, আর্থিক প্রতারণা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত এস্কেলেশন নিয়ে একটা কোর কমিটির কাজ করেছিলাম, নিয়মিত ব্রিফ দিতাম প্রফেসর ইউনূস স্যারকে।’
তিনি লেখেন, ‘এক বৈঠকে স্যার নির্দেশ দিলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইবার সক্ষমতা যাচাইয়ে একটা রেটিং সিস্টেম দাঁড় করাতে। সেই নির্দেশ থেকেই তৈরি হলো একটা কোর স্কোরিং ও ওয়েটেড র্যাঙ্কিং কাঠামো, যেখানে চারটা স্তম্ভ, আইটি ও তথ্য-সুরক্ষা প্রশাসনের জন্য বিশ শতাংশ, অবকাঠামো ও অপারেশনসের জন্য ত্রিশ শতাংশ, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষার জন্য ত্রিশ শতাংশ, ডিজিটাল সেবা ও ব্যবহারকারী পরিপক্বতার জন্য বিশ শতাংশ- এরকম একটা সেটআপ যা চেঞ্জএবল। আইসিটি বিভাগ থেকে বিসিসি এবং এনসিএসএ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে ন্যাশনাল রেটিং সিস্টেমের কাজটা এগিয়ে নিয়েছিল, আমাদের প্রকৌশলীরা ইন-হাউইজ বাস্তবায়নও সম্পন্ন করেছিল।
১০ ফেব্রুয়ারি আমার শেষ কর্মদিবসেই উদ্বোধনের কথা ছিল, নোটিশও জারি হয়েছিল, কিন্তু নির্বাচনী প্রস্তুতি ও হ্যান্ড-ওভার, নোট টূ সাকসেসর লেটার তৈরির ব্যস্ততায় সেটা আর হলো না। গত সপ্তাহে যখন অবশেষে উদ্বোধন হলো, আইডিয়াটা কোথা থেকে এলো, কীভাবে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল, এই সামান্য স্বীকৃতিটুকুও এলো না।’
তিনি লেখেন, ‘আরেকটা কাজের কথা বলি। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের টেলিকম কোয়ালিটি অফ সার্ভিস বেঞ্চমার্কিং ডিজাইন করা হয়েছিল, প্রায় ছত্রিশটা কেপিআই নিয়ে। আপলিংক পারফরম্যান্স, মবিলিটি, শহর-গ্রাম মিশ্র এলাকা, মহাসড়ক, এই ধরনের বাস্তব ব্যবহারিক দৃশ্যপট প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেই কাঠামোয়।
পাশাপাশি এনটিটিএন ও আইএসপির জন্যও আলাদা কেপিআই বেঞ্চমার্কিং দাঁড় করানো হয়েছিল, কারণ মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মানে বাংলাদেশ তখনও নব্বইটার বেশি দেশের পেছনে ছিল। এই কাজটাও মিডিয়ায় এসেছে, কিন্তু যাঁরা এর পেছনে ছিলেন তাঁদের নাম আসেনি। নিজের নাম বাদ পড়ুক, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু দেশ-বিদেশের যে বিশেষজ্ঞরা হাজার হাজার ডলার মূল্যের কাজ বিনামূল্যে করে দিলেন, তাঁদের নাম সামনে আনতে এত কার্পণ্য কেন?’
তিনি লেখেন, ‘এখানেই প্রশ্নটা রাজনৈতিক নয়, কাঠামোগত। রিভার্স ব্রেইন ড্রেন, যাঁরা দেশে কিংবা প্রবাসে থেকে দেশের জন্য নিজের মেধা বিনিময় করতে চান, তাঁদের কীভাবে উৎসাহিত করবেন, যদি স্বীকৃতিটুকুও না মেলে? নাকি ধরে নেওয়া হচ্ছে দেশের জন্য আরও বেটার ব্রেন দরকার নেই?
যিনি প্রাথমিক ধারণাটা এঁকেছেন, তাঁর মস্তিষ্ককে ভাড়া করতে এত ইতস্তত হওয়া উচিত নয়। অন্তত জ্ঞান হস্তান্তরের স্বার্থেই মূল স্থপতির সাথে একটা যোগাযোগের সেতু বজায় রাখা দরকার। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই উল্টো, অমুকে এটা আগে করেছিল, প্রচার হয়নি বলে সেটা ধরা হয়, আর যেটা আগে প্রচারিত হয়ে গেছে সেটা যেন আর করা যাবে না, অথবা ভিন্ন নামে নতুন করে শুরু করতে হবে। এভাবেই সেরা কাজগুলো স্থগিত হয়ে যায়, প্রকল্প প্রস্তাবে বদলে যায় নাম, রূপরেখা। আর্কিটেক্টের দর্শন, পথনকশা, রোডম্যাপ হস্তান্তর না করে কাজ চালিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত দুটো ধারণাই তৈরি হয়, হয় আপনি সব বুঝে ফেলেছেন, অথবা আপনি আসলে কিছুই বুঝতে চান না। আপনার দরকার ক্রেডিট নেয়া। ’
তিনি লেখেন, ‘ওমুকে এটা করে গেছে, যেহেতু প্রচার হয় নাই, সেটাই করো। আর যেটা আগে প্রচার হয়ে গেছে, ধামাচাপা দাও অথবা ভিন্ন নামে করো। এগুলা ভাল না। ইন্টেরিমের অন্যতম সেরা কাজ 'নাগরিক সেবা'- যদি কেউ বুঝে। ন্যাশনাল ইন্টারঅপারেবিলিটির মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সেবাকে একটা এপিআই ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল সার্ভিস এক্সচেঞ্জে আনা। অথচ নাগরিক সেবা স্থগিত। ইন্টার-অপারেবিলিটির ডিপিপি'তে চেঞ্জ, যারা এগুলা ঠিকঠাক বুঝেই না তারা দিচ্ছে নতুন ইনপুট। অথচ আর্কিটেক্ট ফিলোসফি, টেকনিক্যাল পাথওয়ে, রোডম্যাপ সম্পর্কে অভিজ্ঞতাহীন লোকের ইনপুটে প্রকৃত সুফলটা কিন্তু সরকারই মিস করবে।
অভিযোগ নয়, একটা অনুরোধ করি। আইডিয়া, উদ্যোগ আর শিল্পের সৃজনশীলতাকে সম্মান জানান। একটা প্রতিষ্ঠান, একটা রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন যিনি প্রথম রেখাটা টানেন, তাঁর নামটাও ইতিহাসে টিকে থাকে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ফলকে প্রফেসর ইউনূস আর ফারুকী ভাইয়ের নামটা রাখা যেত। হার্ড ও সফট, যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজে মূল আর্কিটেক্টকে সম্মান করুন। নইলে পরের প্রজন্মের কারিগর, স্থপতি, উদ্ভাবকেরা প্রশ্ন করবেন, রাতের পর রাত জেগে কাজ করার মূল্য কী! ফলাফলের ভাগীদার হওয়াটা বড়ো কথা না, কিন্তু অনুপ্রেরণাকে সঞ্চারিত করাটা দায়িত্ব।’