গরমে স্বস্তির খোঁজে বরফ দিচ্ছেন এক নারী © সংগৃহীত
দশকের ভয়াবহ দাবদাহ দেখছে ইউরোপবাসী! ওমেগা ব্লকের কারণে পুরো মহাদেশ জুড়ে বিরাজ করছে স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ৩ ডিগ্রির ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রা। ইউরোপজুড়ে জেঁকে বসা এই অভূতপূর্ব ও রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহের এরই মধ্যে ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশে বেশ বড় আকারের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার স্কুল, ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং খামারগুলোতে মারা গেছে লাখ লাখ গৃহপালিত মুরগি ও পাখি।
টানা কয়েকদিন ধরে চলা এই গরমে ফ্রান্সে গত প্রায় ৮০ বছরের মধ্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পিসোস শহরে পারদ ছুঁয়েছে রেকর্ড ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১১.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। তীব্র গরমে ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রিটানি অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি অন্ধকারে রয়েছে। অন্যদিকে, চরম তাপমাত্রার কারণে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে শীতলীকরণ পানির সংকট দেখা দেওয়ায় তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
ফ্রান্সের কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ব্রিটানি এবং পে দ্য লা লোয়ার অঞ্চলের পোল্ট্রি খামারগুলোতে অতিরিক্ত গরমে দম আটকে লাখ লাখ মুরগি ও পাখি মারা গেছে। মৃত পাখির দেহাবশেষ থেকে তরল শোষণের জন্য খামারিদের কাঠের গুঁড়ো ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং পরিবেশগত পরীক্ষা শেষে এগুলো খামারেই পুঁতে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, তীব্র গরম থেকে বাঁচতে পানিতে নেমে ফ্রান্সে অন্তত ৪৮ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে এবং একটি গাড়ির ভেতরে আটকে প্রচণ্ড গরমে দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্পেনেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে সানস্ট্রোক বা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দুই প্রবীণ নাগরিক মারা গেছেন। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফ্লোরেন্স, মিলান, রোম ও ভেরোনাসহ দেশের ১৬টি শহরে রেড অ্যালার্ট (সর্বোচ্চ সতর্কতা) জারি করেছে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন যে, ইতালি ও লিগুরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা বা ‘রিয়েল ফিল’ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যুক্তরাজ্যে ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো ‘চরম তাপমাত্রা সতর্কতা’ জারি করেছে সেদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর (মেট অফিস)। গরমে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা ভেবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের শত শত স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি বাকিংহাম প্যালেসের সামনে ঐতিহ্যবাহী ‘চেইঞ্জিং অব দ্য গার্ড’ অনুষ্ঠানও কাটছাঁট করা হয়েছে, যাতে ভারী ভালুকের চামড়ার টুপি ও লাল কোট পরা সেনাদের দীর্ঘক্ষণ গরমে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়। নেদারল্যান্ডসে সব ধরনের আউটডোর খেলাধুলা বাতিল করা হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হলগুলো দিনের বেলা বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় জলবায়ু মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ‘ওমেগা ব্লক’ (Omega block) নামক একটি বিরল ও শক্তিশালী বায়ুমণ্ডলীয় অবদমন ব্যবস্থার কারণে ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গ্রীক অক্ষর ‘ওমেগা’ ($\Omega$)-এর আকৃতির এই আবহাওয়া চক্রটি কোনো একটি অঞ্চলের ওপর গরম বাতাসকে আটকে রাখে, যা সহজে সরতে পারে না। ফরাসি আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি ২০০৩ সালের আগস্টের সেই ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যা ১৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল এবং ইউরোপজুড়ে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মতে, ইউরোপ মহাদেশ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন আঘাত হানবে।