ইরানের রাজধানীতে লাগানো একটা পোস্টার © সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। কিন্তু চুক্তিটি বাড়বে কি না, নাকি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হবে—এ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা দেয়নি ওয়াশিংটন বা তেহরান কোন পক্ষই। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ নতুন পথ তৈরিতে ইরান ও ওমান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনায় বসে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ায় সেই আলোচনা আদৌ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে, ‘কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কোনো আলোচনা হচ্ছে।’
আরাগচির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক ‘লঙ্ঘন’ করেছে। এরপরই আবার দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ একটি নতুন পথ তৈরিতে ইরান ও ওমান আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আরাগচি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে একটি অস্থায়ী পথ তৈরি করছি, যা পরবর্তী ধাপে একটি স্থায়ী পথে পরিণত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি।’ তবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আরও কিছু শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে বলেও জানান তিনি। এসব শর্ত পূরণে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে বলে উল্লেখ করেন ইরানের এই মন্ত্রী।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি জানাবে।
গত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার ওই সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এর মাধ্যমে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হন। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস সরবরাহে এর বড় প্রভাব পড়ে।
সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য রাখা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কূটনৈতিক উপায়ে যুদ্ধ বন্ধ এবং লেবাননের সংঘাতের অবসান ঘটানোই ছিল চুক্তিটির মূল লক্ষ্য।
চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বর্তমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছিল, ‘চূড়ান্ত চুক্তি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করবে এবং এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানগুলো’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদন করবে। সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেত।
চুক্তি অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হতো। পাশাপাশি ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ তৈরির কাজ শুরু করার কথা ছিল।
এ ছাড়া ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড় দেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দায়িত্বও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর।
অন্যদিকে ইরানকে হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করতে এবং ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের ‘শুল্ক ছাড়াই’ জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে বলা হয়েছিল।
ইরানও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতি বজায় রাখার বিষয়েও সম্মত হয় দেশটি।
তবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের এক দিনের মধ্যেই দুই দেশের বক্তব্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে চুক্তিটি শুধু যুদ্ধবিরতি, নাকি আরও স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের পথ—এবং কোন পক্ষকে কী দায়িত্ব পালন করতে হবে, তা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
চুক্তি সইয়ের প্রায় দুই সপ্তাহ পর দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও গোলাগুলি হয়। ওই ঘটনার জন্যও পরস্পরকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের হামলা ছিল চুক্তির ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’। অন্যদিকে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে’।
গত ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, চুক্তিটি ‘শেষ হয়ে গেছে’। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এসব হামলার মধ্যে তেহরান যেসব স্থাপনাকে বেসামরিক অবকাঠামো বলে দাবি করেছে, সেগুলোও ছিল।
এর জবাবে ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘তাদের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও স্থগিত করেছে’ এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রও ‘একইভাবে আমাদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে।’
এরপর থেকে যুদ্ধ ধীরে ধীরে দুই দেশের ইচ্ছাশক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। তবে জুলাইয়ের শেষ দিকের পর থেকে ইরানের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার খবর প্রকাশ্যে আসেনি।
এখন সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হলে কী হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দুই পক্ষই যুদ্ধের ফল নিজেদের পক্ষে গেছে বলে দাবি করছে। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান এখনো না আসায় আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
এর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোও ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা শুধু ইরানকে দেখছি, যেখানে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি চলছে এবং তাদের কোনো অর্থ নেই।’
তবে ইরানও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। দেশটির প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতে যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিল, সেগুলো অর্জনে ‘ব্যর্থ হয়েছে’।
তিনি বলেন, ‘আমি মন থেকে ঘোষণা করছি, আমরা এই যুদ্ধে জিতেছি।’
তবে কোন কোন লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি গালিবাফ।
যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ চেয়েছিল। পাশাপাশি ইরানে সরকার পরিবর্তন, তেহরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহর মতো মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থন বন্ধ করাও ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
এখন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে দুই দেশের অবস্থান ও বক্তব্যে কোনো বড় পরিবর্তন না আসায় সামনে দুটি সম্ভাবনাই খোলা থাকছে—আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো, অথবা আবারও সংঘাতের পথে ফিরে যাওয়া।