হরমুজ প্রণালি © সংগৃহীত
ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য গোষ্ঠীগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং রুটটি কতটা নিরাপদ—তা যাচাই করছে। শিপ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এখনো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল খুবই সীমিত রয়েছে। খবর বিবিসি বাংলা।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জাহাজগুলোকে অবশ্যই ইরানের নির্ধারিত ‘নিরাপদ লেন’ ব্যবহার করতে হবে।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘লেবাননের যুদ্ধবিরতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ইরানের বন্দর ও নৌ-সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত সমন্বিত পথে সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।’
পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কেবল নির্ধারিত রুট দিয়েই চলাচল করতে পারবে, তবে কোনো সামরিক জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না। ধারণা করা হচ্ছে, এটি গত সপ্তাহে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর নির্ধারিত দুটি রুটের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা সন্ধ্যায়
এদিকে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণাকে ‘বিশ্বের জন্য একটি মহান ও উজ্জ্বল দিন” হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট কার্যত বন্ধ রেখেছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
যদিও আরাঘচির ঘোষণার পর ইরানের ভেতরেই এ নিয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আইআরজিসি-সমর্থিত তাসনিম নিউজ এজেন্সি এ ঘোষণাকে ‘খারাপ ও অসম্পূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে এই ঘোষণা কার্যকর নয়।
এছাড়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে বলেন, মার্কিন অবরোধ বজায় থাকলে হরমুজ প্রণালি ‘উন্মুক্ত থাকবে না’। তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যেরও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘গত এক ঘণ্টায় সাতটি দাবি করেছেন এবং তার সবগুলোই মিথ্যা।’ উল্লেখ্য, গালিবাফ সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত চলবে এবং দুই পক্ষের মধ্যে বড় কোনো মতপার্থক্য নেই। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরে রাজি হয়েছে। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্থল বাহিনীর প্রয়োজন নেই; ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে দুই দেশ একসাথে কাজ করবে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি নাকচ করে দিয়ে জানায়, ‘কোনো অবস্থাতেই’ ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার হস্তান্তর করা হবে না।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ইরান জ্বালানি ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রপথে মাইন পুঁতে রাখার সতর্কতাও দিয়েছিল, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়।
শুক্রবার আরাঘচির ঘোষণার পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও, প্রণালিটি কতটা নিরাপদ—তা নিয়ে ব্যবসায়িক মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের প্রধান আর্সেনিও ডমিঙ্গুয়েজ বিবিসি ওয়ার্ল্ডের বিজনেস রিপোর্টকে জানান, নৌ-বাণিজ্য শিল্পের জন্য আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘জাহাজ চলাচলে কোনো ঝুঁকি থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে—এ বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট নিশ্চয়তা দরকার।’
তিনি আরও জানান, কিছু জাহাজ চলাচল শুরু করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেলেও, হামলার ভয়ে অনেক জাহাজ তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় বিষয়টি যাচাই করা কঠিন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও পরিস্থিতিকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন না। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কন্ট্রোল রিস্কস’-এর মেরিটাইম সিকিউরিটি পরিচালক করম্যাক ম্যাকগারি বলেন, ‘ইরানের এই বিবৃতিতে পরিস্থিতি মোটেও বদলায়নি।’ তিনি আরও বলেন, সমুদ্রের নিচে মাইন থাকার ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি “বেশ অস্পষ্ট”।
এদিকে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথ সুরক্ষায় তার দেশ ও ফ্রান্স একটি বহুজাতিক মিশনের নেতৃত্ব দেবে।
৪৯টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, এই মিশনটি হবে “সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং প্রতিরক্ষামূলক” এবং এটি তখনই কার্যকর হবে, যখন ওই অঞ্চলে চলমান সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হবে।