ডোনাল্ড ট্রাম্প নামকরণ © সংগৃহীত
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাংলাদেশে বিরল অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে ঘিরে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা দেশীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে কোনো প্রাণীর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম জড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রায় এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামেই একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের নামকরণ হয়েছিল। এটি পরে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মহিষটির নামকরণ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনার মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি তথ্য। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় আবিষ্কৃত একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের নাম রাখা হয়েছিল ‘নিওপালপা ডোনাল্ডট্রাম্পি’। কানাডীয় গবেষক ভাজ্রিক নাজারি পতঙ্গটি আবিষ্কারের পর এর মাথায় থাকা সোনালি রঙের আঁশের বিন্যাস ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত চুলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় এমন নামকরণ করেন।
মাত্র এক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের পাখাবিশিষ্ট এই পতঙ্গের আবাসস্থল যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া এবং মেক্সিকোর বাহা ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চল। গবেষক নাজারি তখন বলেছিলেন, তিনি আশা করেন এই নামকরণ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়ে আরও সচেতন হতে উৎসাহিত করবে।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর পরিবেশব্যবস্থা সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব অঞ্চলে এমন বহু প্রাণী ও প্রজাতি রয়েছে যেগুলো এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এসব প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে শেষ পর্যন্ত কোরবানি করা হয়নি। সম্ভাব্য জনবিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ হস্তক্ষেপ এবং প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বিরল প্রাণীটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল ক্রেতাকে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে মহিষটিকে সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং সংরক্ষণের জন্য রাজধানীর মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বানান ভুল, সমালোচনার মুখে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ
নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া এগ্রো ফার্মে জন্ম নেওয়া এই বিরল মহিষটি অ্যালবিনিজম নামের বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সাদাটে বর্ণ ধারণ করেছে। এর গায়ের পশম, চুল এবং চোখের গঠন অনেকের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেহারা ও বহুল আলোচিত চুলের বিন্যাসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হওয়ায় খামার মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই স্নেহ করে এর নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। গত ১২ মে গণমাধ্যমে মহিষটিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অদ্ভুত নাম এবং বিরল বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি, ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোরসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম মহিষটিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এছাড়া দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য মিরর, নিউইয়র্ক পোস্ট, দ্য ম্যানিলা টাইমস এবং গালফ নিউজের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও স্থান পায় মহিষটির গল্প।
বিশ্বজুড়ে আলোচিত হওয়ার আগেই প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের মহিষটি প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে কিনে নেন রাজধানীর জিনজিরা ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান সামি। কেরানীগঞ্জে তার বাড়িতে মহিষটি আনার পর সেটিকে একনজর দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে প্রাণীটিকে ঘরের ভেতরে রাখতে বাধ্য হয় পরিবারটি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক মানুষ মহিষটিকে দেখতে না পেরে হতাশা প্রকাশ করেন।
ক্রমবর্ধমান ভিড় এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি সরকারের নজরে এলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তার নির্দেশনা ও পরামর্শে ২৭ মে বিকেলে জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ক্রেতার বাড়িতে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। পরে সন্ধ্যার আগে পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছায় মহিষটিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হস্তান্তর করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত প্রাণীটিকে সরকারি তত্ত্বাবধানে রেখে লালন-পালন করা হবে।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুছ জানান, বিরল প্রজাতির প্রাণী হওয়ায় মহিষটিকে থানায় আনার পর প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, অ্যালবিনো মহিষটি অত্যন্ত বিরল এবং দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদ। এ কারণেই প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এর মূল্য পরিশোধ করে সরকারি জিম্মায় নিয়েছে এবং স্থায়ী সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মহিষটির ক্রেতা পরিবারের সদস্যরাও। মনিরুজ্জামান সামিরের চাচা শ্বশুর মো. তাইবুর রহমান বলেন, তারা মূলত কোরবানির জন্য প্রাণীটি কিনেছিলেন। তবে বিরল এই প্রাণী সংরক্ষণের সরকারি উদ্যোগে তারা সন্তুষ্ট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি সংরক্ষিত থাকুক সেটিই চান।