হরমুজ প্রণালি © টিডিসি ছবি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নৌপথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকায় এই চুক্তি হলেও প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা মিলবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নৌপথের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে এবং চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা নেই। তার দাবি, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এখনও বহাল থাকায় ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ওমান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানকে ‘খুব কঠিন মূল্য’ দিতে হবে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আলোচনা এগিয়েছে এবং চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হতে পারে। তবে ইরান বরাবরের মতোই বলে আসছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না এবং ভবিষ্যতেও এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা দুই দেশ ও মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিকে অনিরাপদ করে তোলার যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো এখনও বহাল আছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং ইরান ও দেশটির স্বার্থের বিরুদ্ধে অন্যান্য আগ্রাসী ও হুমকিমূলক কর্মকাণ্ড এখনও অব্যাহত রয়েছে।’
পরে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে জানান, নতুন নৌপথটি সাময়িক হবে এবং এটি দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
এদিকে বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ২৪ ডলারে নেমে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কারণ, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরান জানিয়েছে, আগে থেকে অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে না। তাদের নির্দেশ অমান্য করা কয়েকটি জাহাজে হামলাও চালিয়েছে দেশটি।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিরোধের অন্যতম বড় কারণ হলো, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের ইরানের পরিকল্পনা।
রয়টার্সের বরাতে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায় করতে চায় ইরান। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের পক্ষে আলোচনা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
গত জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো।
তবে চুক্তিটি খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং সমঝোতা সইয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই দুই পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। একই সময়ে ২০ জুলাই থেকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপরও অবরোধ আরোপ করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। এরপর থেকেই কার্যত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ওই প্রথম হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন।
যুদ্ধ শুরুর সময়কার সেই হামলায় মোজতবা খামেনিও আহত হন। এরপর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বুধবার বলেন, বর্তমানে মোজতবা খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা ‘কঠিন’।
তিনি বলেন, ‘যাই হোক, তার উপস্থিতি আমাদের জন্য বড় শক্তির উৎস। সেটিই আমাদের এগিয়ে যেতে সাহস জোগাচ্ছে।’
গত মাসে বাবার জানাজাতেও মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়নি। এরপর থেকে তিনি শুধু লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। জনসমক্ষে না আসায় দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দাবি করেন, তিনি মোজতবা খামেনির সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠক করতে পেরেছেন এবং তার কাছ থেকে ‘আন্তরিকতা ও অত্যন্ত যুক্তিসংগত’ আচরণ পেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসৎ ব্যক্তি তাকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং তার একটি ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করছেন।’