শান্তিরক্ষী মিশনে জনবল ২৫ বছরে সর্বনিম্ন, কমেছে অর্থায়নও—ভয়াবহ সংকটে জাতিসংঘ

২৯ মে ২০২৬, ১১:২৮ AM
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন © সংগৃহীত

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে। অর্থায়ন ও জনবল—দুই দিক থেকেই গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে এই মিশন। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দাতা দেশগুলো বাধ্যতামূলক অর্থ সময়মতো পরিশোধ না করায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শান্তিরক্ষা বাজেটের প্রায় ৫৬০ কোটি ডলারের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থই ঘাটতিতে পড়ে। এই ঘাটতির কারণে বিভিন্ন মিশনে কর্মীসংখ্যা কমাতে বাধ্য হয় জাতিসংঘ।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষী মিশনে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক কর্মীর সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৮ হাজার ৬৩৩ জনে। ২০১৬ সালের তুলনায় যা প্রায় ৪৯ শতাংশ কম। ২০০০ সালের পর এটিই সবচেয়ে কম জনবল। পুরো দশকজুড়েই ধীরে ধীরে পতন চললেও গত বছরই এক বছরে সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ কমেছে শান্তিরক্ষীর সংখ্যা।

সিপ্রির শান্তিরক্ষা ও সংঘাত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক জাইর ভ্যান ডার লিন বলেন, ‘এই পরিস্থিতি যদি চলতেই থাকে, তাহলে বহুপাক্ষিক সংঘাত ব্যবস্থাপনা ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করায় জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।’

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘এর ফলে বিশ্বে সংঘাত আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ। কারণ রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নীতিমালা থেকে সরে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, শান্তিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থেকে। কোনো দেশের অবদান নির্ধারিত হয় তাদের জাতীয় আয় ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে। অন্যদিকে শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে বেশি সেনা ও পুলিশ পাঠায় তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলো—উগান্ডা, নেপাল, বাংলাদেশ, ভারত, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, বুরুন্ডি, কেনিয়া, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া।

প্রতিবেদনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী না করা হলেও বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল থেকে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে রাজনৈতিক চাপ ও বিভাজন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বড় দাতাদের অবস্থান এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন এবং বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানান। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরে জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র নিবন্ধন কর্মসূচি ও গ্লোবাল কাউন্টার টেররিজম ফোরাম।

এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের বাজেট দপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তাবও ছিল। যদিও কংগ্রেস এখনো সেটি অনুমোদন দেয়নি।

গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র শান্তিরক্ষা বাজেট ২৫ শতাংশ কমানোর দাবি তোলে। অন্যদিকে জাতিসংঘ চাইছিল অন্তত ১৫ শতাংশ কাটছাঁট হোক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশও দিয়ে থাকে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘবিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল ফোর্তি বলেন, ‘গত দুই দশক ধরেই সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলছে। শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কিংবা হাইতিতে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাগুলো বড় উদ্বেগ তৈরি করেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু শান্তিরক্ষা কার্যক্রম উন্নত করার কথা বলে ওয়াশিংটন যে বকেয়া অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আটকে রেখেছে, তা বাস্তবে জাতিসংঘের মিশনগুলোকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।’

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারবিষয়ক প্রতিনিধি জেফ বার্তোস বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, জাতিসংঘের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেটিকে আরও কার্যকর করে তোলা আমাদের দায়িত্ব।’

তিনি জানান, শান্তিরক্ষা মিশনে অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির জন্য অর্থ ফেরত দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে কয়েক কোটি ডলার সাশ্রয় হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।

বার্তোস আরও বলেন, ‘শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া দেশ ও সেনাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু ব্যবহারই হচ্ছে না—এমন যন্ত্রপাতির জন্য অর্থ ফেরত দেওয়া চলতে পারে না।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৩৪টি দেশ বা অঞ্চলে মোট ৫৮টি বহুপাক্ষিক শান্তিরক্ষা মিশন সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ শান্তিরক্ষী মোতায়েন ছিল মাত্র পাঁচটি বড় মিশনে, যার চারটিই সাব-সাহারান আফ্রিকায়।

কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, হাইতি, ইরাক এবং আজারবাইজানের নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের মিশনগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব মিশনের জায়গায় বিকল্প আঞ্চলিক বাহিনী গঠন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন দেশগুলো ক্রমেই জাতিসংঘের বাইরে গিয়ে একক বা আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এসব বাহিনী সাধারণত বেশি সামরিক ও স্বার্থনির্ভর হয়ে থাকে।

উদাহরণ হিসেবে সোমালিয়ায় আফ্রিকান ইউনিয়নের মিশন, হাইতির গ্যাং দমন বাহিনী এবং গাজার জন্য প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ২০০৬ সাল থেকে লেবাননে মোতায়েন থাকা জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী বাহিনী ইউনিফিল চলতি বছরের ডিসেম্বরে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পথে রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণেই এই সিদ্ধান্ত আসছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইউনিফিলের পরিবর্তে লেবাননের সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিক। তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের অভাবে সেই সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

একই সঙ্গে ২০২৪ সালের লেবানন-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দায়িত্বও লেবাননের সেনাবাহিনী পুরোপুরি পালন করতে পারছে না বলে জানানো হয়।

যুদ্ধবিরতি থাকলেও লেবাননে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি লেবানিজ নিহত এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।

শুধু বৃহস্পতিবারই ইসরাইলের বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

আগামী মাসে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইউনিফিল মিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন।

ড্যানিয়েল ফোর্তি বলেন, ‘ইউনিফিলের পর কী হবে, সেটি কেবল কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়; এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক বিষয়। ইসরাইল-লেবানন সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আঞ্চলিক দ্বন্দ্বও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে।’

তার ভাষায়, ‘এই আলোচনা বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।’

মিয়ানমারে পাচারকালে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ১
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
সারারাত এপাশ-ওপাশ? গভীর রাতে আরামদায়ক ঘুমের জন্য মেনে চলুন …
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
চবিতে ছাত্রদল নেতা মুছাকে স্মরণ, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
গভীর রাতে গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ আমল 
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে জামায়াতকর্মী নিহত
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950