বর্তমানে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো প্রাথমিক শিক্ষা, যা প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু হয়। আর শেষ হয় ৫ম শ্রেণিতে গিয়ে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত থাকলে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এখানে প্রাথমিক শিক্ষা নিতে আসা শিশুরা যাচ্ছে ১১ রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, এবতেদায়ি মাদ্রাসা, উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসা, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় পুরোপুরি সরকারি কারিকুলামকেই অনুসরণ করা হয়। এ কারিকুলাম সাধারণ শিক্ষা কারিকুলাম নামেও পরিচিত।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বেশকিছু অতিরিক্ত বিষয়ও পড়ানো হয়। এবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসায় অনুসরণ করা হয় সরকার নির্ধারিত পৃথক কারিকুলাম। এ কারিকুলাম সাধারণ মাদ্রাসা কারিকুলাম নামে পরিচিত। আর কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোয় সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন পদ্ধতিও পুরোপুরি আলাদা।
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার মূল ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। এ কারণে বিশ্বের সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকেই প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে প্রায় ৫৫ বছর পার হলেও এখনো সবার জন্য একই পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
কোনো সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে কখনোই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষাবিদদের। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মনিনুর রশিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার মজবুত ভিত্তি গঠন জরুরি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও পাঠ্যবস্তুর মান দুর্বল— এসবের ফলেই আমাদের দেশে শেখার দক্ষতা কমে গেছে। পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হলেও বাস্তবে সেখানে শেখার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমনকি সরকারও শিক্ষাকে কখনোই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি।
শিক্ষার দুর্বল মানের কারণে বাংলাদেশের একজন শিশুর ১১ বছরের স্কুলজীবনের সাড়ে ৪ বছর নষ্ট হয়ে যায়। তারা ১১ বছরে শিখে মাত্র সাড়ে ৬ বছরের পাঠ্যক্রমের সমান। আবার দেশের পঞ্চম শ্রেণির প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর তিনজনই নিজেদের শ্রেণির উপযোগী সাধারণ মানের অঙ্ক কষতে পারে না। এ দেশের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে বাংলা পড়ার দক্ষতা পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর স্কোর খুবই কম। এর মানে, তারা ভালোভাবে বাংলা পড়তে পারে না। তাদের ৪৩ শতাংশ বাংলায় কোনো প্রশ্নের পুরো উত্তরও দিতে পারে না।
২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট: লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে এই তথ্য দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে।
এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৫ জন, ৬ হাজার ১৩৪টি বেসরকারি বিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮৮, ৪ হাজার ৪২৫টি এবতেদায়ি মাদ্রাসায় ৬ লাখ ৮২ হাজার ৮৫৫, ২৬ হাজার ৪৬১টি কিন্ডারগার্টেনে ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৫, ৩ হাজার ৩০৭টি এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়ে ৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৬১, ২ হাজার ৯০৯টি উচ্চ মাদ্রাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদ্রাসায় ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯৯, ১ হাজার ৮৯২টি উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৫, ২০৩টি শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুলে ৩০ হাজার ৩৪৬, ২ হাজার ২৩৭টি এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫০৪ ও ১ হাজার ৪৯৫টি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ৫ হাজার ৫০৭ জন অধ্যয়নরত রয়েছে।
তবে কওমি মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য এই পরিসংখ্যানে উল্লেখ নেই।