বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত কত, চলবে কয়দিন?

০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ PM , আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২০ PM
জ্বালানি তেল

জ্বালানি তেল © সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। দেশে এই মুহূর্তে কত তেল আছে এবং তা দিয়ে কতদিন চলবে এমন প্রশ্ন ঘুরেফিরেই সামনে আসছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের সংকট না থাকার দাবি করা হলেও 'তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে' এমন শঙ্কা থেকে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের লাইন।

জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহক-বিক্রেতা বাকবিতণ্ডা কিংবা সংঘাতের অভিযোগ যেমন আসছে, তেমনি অবৈধ মজুদ ঠেকাতে চালানো হচ্ছে অভিযানও।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে গোটা দেশে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণই বেশি।

এছাড়া অল্প পরিমাণ অকটেন আমদানি করা হলেও চাহিদার বড় অংশ দেশেই উৎপাদন হয়।

বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ আমদানির ওপরই নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড় ভরসা।

এছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকেও বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি করা হয়।

বাংলাদেশের রিজার্ভ সক্ষমতা অনুযায়ী বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদার পুরোটা একসাথে মজুত করার সুযোগ নেই। মূলত চাহিদার নিরিখে নিয়মিতভাবে চালান আসে, ব্যবহার হয়- এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক সংকট শুরুর শঙ্কায় মার্চ মাস থেকেই জ্বালানি তেল ব্যবহারে রেশনিং (সাশ্রয়ী ব্যবহার) শুরু করে বাংলাদেশ।

মূলত আগের বছরের মাসভিত্তিক চাহিদার সাথে মিল রেখেই এই মুহূর্তে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।

সেই হিসেবে মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেলের সংকট হবে না বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

তেলের মজুদ কত?

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মজুদ কত? কতদিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো এখন অনেক বেশি আলোচনায়।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১শে মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন।

এছাড়া সাত হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় নিয়মিত চাহিদা ১২ হাজার মেট্রিক টনের মতো। অর্থাৎ মজুদ থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিনের মতো চলবে।

তার মানে এই নয় যে, জ্বালানি তেলের মজুদ ফুরিয়ে শূন্য হয়ে যাবে। এই সময়ে নতুন করে আমদানি করা জ্বালানি তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবারও এই মজুত বাড়বে।

যেমন সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং মার্চ মাসে ভারত থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।

এছাড়া অকটেন পেট্রোলের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া। প্রতিদিনের ব্যবহারের পাশাপাশি স্টকে নতুন করে তেল যুক্তও হচ্ছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এই মুহূর্তে মাসভিত্তিক চাহিদা পূরণেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

তিনি জানান, গত বছরের এপ্রিলে দেশে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়েছিল এই বছরের এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি মি. চৌধুরীর। তিনি বলছেন, "ডিজেলে কোনো সংকট নেই, বরং পাচারের শঙ্কা থাকতে পারে, যা সরকার বিবেচনায় রেখেছে- সীমান্তে নির্দেশনা দেওয়া আছে।"

জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রসঙ্গে মি. চৌধুরী বলছেন, মজুদের চেষ্টা থাকায় এই মুহূর্তে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করা কঠিন হচ্ছে।

এক্ষেত্রে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকা উচিত।

কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম।

"স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সক্ষমতা কম হওয়ায় আমরা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিনের বেশি তেল মজুদ করে রাখতে পারি না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. তামিম।

'কৌশলগত মজুদের' সক্ষমতা না থাকা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ বলেও মনে করেন তিনি।

"সব সময়ই মজুদ ওঠানামা করে। সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গেও জুন মাস পর্যন্ত আমাদের জ্বালানি চুক্তি আছে, কিন্তু তাদেরও অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেই। ফলে তারা যে পরিশোধিত তেল দেয় সেটাও ধারাবাহিক থাকবে না," বলেন তিনি।

জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা কেন?

"প্রায় দুই ঘণ্টা দাড়াইছি এক পাম্পের সামনে পরে বলে তেল নাই। পরে আরেকটা পাম্পে আইসা অনেকক্ষণ দাড়াইয়া দুইশ টাকার তেল দিছে।"

এভাবেই বিবিসি বাংলাকে নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক আনিসুর রহমান। পাম্প থেকে তেল দিতে অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।

অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা নিরাপত্তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। তাদের দাবি, কোনো অনিয়ম না করেই অনেক সময় গ্রাহকদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন তারা।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে যে, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আদেশ, নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা।

এছাড়া অনাকাঙিক্ষত ঘটনা এড়াতে রাতের বেলা পেট্রোল এবং অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা।

এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জ্বালানি তেল মজুদের অভিযোগে কয়েকটি পেট্রোল পাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে প্রশাসন।

সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে প্রতিদিনই যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে।

যদিও জ্বালানি তেলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা সরকার করছে বলে দাবি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরীর।

তিনি বলছেন, মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেল সংকটের কোনো শঙ্কা নেই।

তাহলে পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের এমন দীর্ঘ লাইন কেন? এই প্রশ্নের জবাবে মি. চৌধুরী বলছেন, "এই দীর্ঘ লাইন মনস্তাত্ত্বিক। আমরা কোনো সংকট দেখছি না।"

সরকার কী করছে?

জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে আলোচনা শুরুর পর থেকেই 'প্যানিক বাইং' এবং 'মজুদ' এই শব্দগুলোও অনেক বেশি সামনে আসছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের কথা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

এছাড়া জ্বালানি তেলের মজুদ এবং এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১১৬ জন, ঢাকার ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন, চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০ জন, রাজশাহীর আট জেলায় ৩৪০ জন, খুলনার দশ জেলায় ৩০১ জন কর্মকর্তা ট্যাগ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলছেন, বাকি বিভাগগুলোতেও একইভাবে সরকারিভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

"জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এই কর্মকর্তারা কাজ করবে এবং এ সংক্রান্ত নিয়মিত তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন," বলেন তিনি।

এছাড়া জ্বালানি তেল মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান মি. চৌধুরী।

তিনি বলেন, ৩০শে মার্চ একদিনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়েছে।

"এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা করা হয়েছে, প্রায় দশ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে," জানান তিনি।

এছাড়া প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল, সাড়ে ছয় হাজার লিটার অকটেন এবং প্রায় ১৪ হাজার লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সাধারণত দুই ভাবে কেনা হয়। উৎস দেশের সঙ্গে সরকারিভাবে চুক্তির মাধ্যমে অথবা ওপেন টেন্ডারে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে।

"ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তির মেয়াদ এখনো রয়েছে। এছাড়া আমেরিকা ও চীনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু
  • ১১ জুলাই ২০২৬
ফাইনাল ম্যাচের মাঠের ঘাসও বিক্রি করছে ফিফা, এক টুকরোর দাম ক…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় ঢামেকের সিট ২৩০ থেকে ১৫০ করার দাবি…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
টঙ্গীর আলোচিত ছিনতাইকারী ‘চাপাতি কামাল’ ও জাহিদ গ্রেপ্তার
  • ১১ জুলাই ২০২৬
ইমাম-মসজিদ কমিটিকে সতর্ক করল ইসলামিক ফাউন্ডেশন
  • ১১ জুলাই ২০২৬
বৃষ্টিতে তলিয়ে বেনাপোল স্থলবন্দর, পানিতে নষ্ট কোটি কোটি টাক…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence