প্রকৌশলী ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক সাবিনা আহমেদ © সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা হামলা করছে অঞ্চলটিতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কে কার পক্ষে এমন আলোচনার জন্ম নিয়েছে নেটিজেনদের মাঝে।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও প্রকৌশলী সাবিনা আহমেদ। তিনি লিখেছেন:
গাল্ফ দেশগুলো এখন কোন দিকে ঝুঁকছে: আমেরিকা, ইরান, নাকি নিউট্রাল?
সৌদি আরব :
সৌদি আরব এখন খুব শক্তভাবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান সরাসরি বলেছেন, “আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে। আমরা প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখি।” তিনি আরও বলেছেন যে ইরানের ওপর আস্থা “পুরোপুরি ভেঙে গেছে”। ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশনের জন্য তাদের সৌদি কিং ফাহাদ এয়ার বেইস (তায়েফ) আমেরিকাকে খুলে দিয়েছে।
ইউএই :
ইউএই এখন গাল্ফের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত আমেরিকা-ইসরায়েলপন্থি দেশ। ইউএই পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ সরাসরি বলেছেন, “ইউএই এখন যুদ্ধের অবস্থায় আছে এবং আমরা সহজ শিকার নই।” তিনি ইরানের হামলাকে “অযৌক্তিক সন্ত্রাসী আক্রমণ” বলে নিন্দা করেছেন। তবে ইউএই স্পষ্টভাবে বলেছে যে তারা নিজের ভূখণ্ড বা আকাশপথ আমেরিকাকে ইরান আক্রমণের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।
কাতার:
কাতার এখনো মোটামুটি নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে, তবে ইরানের দিকে একটু ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি সরাসরি বলেছেন, ‘এই যুদ্ধ অবশ্যই অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আঞ্চলিক দেশগুলো ইরানের শত্রু নয় এবং কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।’ কাতার এখনো আল উদেইদ এয়ার বেইস আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অপারেশনের জন্য নতুন করে ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।
বাহরাইন:
বাহরাইন পুরোপুরি আমেরিকা ও ইসরায়েলের দিকে। বাহরাইন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি সরাসরি বলেছেন, ‘ইরানের আক্রমণ জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।’ বাহরাইনের 5th Fleet Headquarters আমেরিকার জন্য এখনও পুরোপুরি খোলা আছে, যদিও ইরান এই নেভাল বেইসে প্রচুর আক্রমণ করেছে।
কুয়েত:
কুয়েত নিরপেক্ষের কাছাকাছি থাকতে চায়, কিন্তু গাল্ফের অন্য দেশগুলোর সাথে একত্রিত থাকার কারণে আমেরিকার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। কুয়েত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ করেছে এবং বলেছে, “এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।” কুয়েতের Ali Al Salem Air Base ও অন্যান্য ঘাঁটি আমেরিকা এখনও ব্যবহার করতে পারছে।
ইরাক:
ইরাক এখনো ইরানের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন বলেছেন, “আমরা কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান চাই।” তিনি ইরানের হামলার নিন্দা করেননি। ইরাক আমেরিকাকে নতুন করে আক্রমণাত্মক অপারেশনের জন্য বেস ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।
জর্ডান:
জর্ডান পুরোপুরি আমেরিকা ও ইসরায়েলের দিকে। জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, ‘জর্ডান এই আঞ্চলিক সংঘাতের পক্ষ নয়। আমরা ইরানকে আক্রমণ বন্ধ করতে বলেছি।’ এখনও জর্ডানের ঘাঁটি আমেরিকা ব্যবহার করতে পারছে।
ওমান:
ওমান এখনো গাল্ফের মধ্যে সবচেয়ে নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে আছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি সরাসরি বলেছেন, “আমরা সব পক্ষকে কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানাই। ওমান কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে যোগ দেবে না এবং অঞ্চলের শান্তির জন্য মধ্যস্থতা করবে।” তিনি আরও বলেছেন যে ইরানের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রক্ষা করে সবাইকে নিয়ে শান্তি চান। ওমান স্পষ্টভাবে বলেছে যে তারা নিজের ভূখণ্ড বা আকাশপথ কোনো দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অপারেশনের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।
পাকিস্তান:
পাকিস্তান সৌদি আরবের খুব কাছের মিত্র। ২০২৫ সালে তারা সৌদির সাথে মিউচুয়াল ডিফেন্স চুক্তি করেছে। এখন তারা সৌদিকে সামরিক সাহায্য দিতে প্রস্তুত আছে, কিন্তু সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে না।
তুরস্ক:
তুরস্ক গাল্ফ দেশগুলোর সাথে ব্যাবসা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। তারা সৌদি ও কাতারের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখছে, কিন্তু ইরানের সাথেও সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। তুরস্ক এখনো নিরপেক্ষের কাছাকাছি আছে।
সিরিয়া:
সিরিয়া এখন গাল্ফের অন্য দেশগুলোর মতোই ইরানের বিরুদ্ধে নিন্দা করছে এবং নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি সরাসরি বলেছেন, “আমরা ইরানের আক্রমণকে তীব্রভাবে নিন্দা করছি। এটা আরব দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।” সিরিয়া স্পষ্ট বলেছে যে তারা কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে জড়াবে না এবং কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান চায়। সিরিয়া এখনো আমেরিকাকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অপারেশনের জন্য কোনো বেস বা আকাশপথ ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। তারা শুধু নিজের সীমান্ত রক্ষা করছে।
এই চলমান যুদ্ধে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অস্থির। উপরের দেশগুলোর মধ্যে কোনোটিই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। যেকোনো সময় একটা বড় ধরনের উস্কানিমূলক হামলা — যেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রে বড় আক্রমণ, কোনো প্রধান শহরে ভয়াবহ হামলা, অথবা কোনো দেশের নেতৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত — তাদের বর্তমান অবস্থান একেবারে বদলে দিতে পারে।
এই যুদ্ধে কোনো দেশের অবস্থান এখনো চূড়ান্ত নয়। একটি মাত্র বড় ঘটনাই যথেষ্ট, যাতে আজ যে দেশ নিরপেক্ষ আছে, কাল সে আমেরিকা-ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, অথবা যে দেশ এখন আমেরিকার দিকে আছে, সেও দিক বদল করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ফ্লুইড।