নেপালের নির্বাচনে ভারতবিরোধী না চীনঘনিষ্ঠ প্রার্থী—কার জয়ের সম্ভাবনা কতটা?

০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:০১ AM
নেপালের নির্বাচন

নেপালের নির্বাচন © সংগৃহীত

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির জেন জি প্রজন্মের তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনরোষ তীব্র আকার ধারণ করলে আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সুশীলা কার্কি।

১৯৯০ সালে রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে নেপালে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি মোট ৩২টি সরকারের শাসনামল দেখেছে। তবে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারেনি। পর্যবেক্ষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনেও একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

২০২৫ সালের জেন জি আন্দোলন নেপালে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস থেকে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে ওই সংস্থার গবেষক নীহার আর নায়েক বলেন, “নেপালে কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা খুব কম।”

নেপালের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনের পর ১৬৫টি আসন থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফল ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

নেপালের রাজনীতিতে চীন-ভারত প্রভাবের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বা ইউএমএল)-এর ক্রমবর্ধমান চীনঘনিষ্ঠ অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। অন্যদিকে, জেন জি প্রজন্মের একাংশ যে বালেন্দ্র শাহের প্রতি সমর্থন দেখাচ্ছে, তিনি নিজেকে আদর্শগতভাবে ভারতবিরোধী হিসেবেও তুলে ধরেছেন।

কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ জেন জি আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। এক সময় তিনি পেশায় গায়ক ও র‍্যাপ শিল্পী ছিলেন। তাঁর গানের বড় অংশে উঠে এসেছে যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার গল্প। ‘বালেন’ নামে বেশি পরিচিত এই সাবেক র‍্যাপার এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে। তিনি যে আসনে লড়ছেন, সেই ঝাপা–৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে ওলির রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

২০০৮ সালের নির্বাচন ছাড়া ১৯৯১ সাল থেকে একটানা ঝাপা–৫ আসন থেকে জয়ী হয়ে আসছেন কেপি শর্মা ওলি। তবে এবার সেই আসনের পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বর দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জেন জি প্রজন্মের আন্দোলনের মুখে ওলি ও তাঁর সরকার পদত্যাগ করে। বালেন শাহ প্রতিনিধিত্ব করছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-কে, যা ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এবার দলটি আগের তুলনায় অনেক ভালো ফল করতে পারে এবং শাহকে ইতোমধ্যে আরএসপি-এর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে ওলির দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), যারা গত নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়েছিল। আন্দোলনের মাধ্যমে ওলিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও তাঁর দলের দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

এছাড়া নেপালি কংগ্রেসও নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে। দলটি ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এর আগে এই পদে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা। নির্বাচনের দৌড়ে রয়েছে প্রাক্তন মাওবাদী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে ‘প্রচণ্ড’-এর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)ও।

নির্বাচন ঘিরে ভারতের অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল ভারত। তবে নেপালের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

তবে তামিলনাডুর কোয়েম্বাটুরের ডিএমকে সংসদ সদস্য গণপতি পি. রাজকুমারের লোকসভায় করা একটি প্রশ্নের জবাবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, “সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর ঘটনাবলি সম্পর্কে নিয়মিত নজর রাখে, বিশেষ করে সেইসব ঘটনা যা ভারতের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে।”

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের নেপাল বিষয়ক বিভাগের অধ্যাপক এন. পি. সিং বলেন, “অলি বা প্রচণ্ডের সরকার এলে নেপাল বেশিরভাগ সময় চীনের দিকে ঝুঁকে যায়।”

তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকলেও এ বিষয়ে নেপাল সরকারের সরাসরি বিরোধিতা করেনি দিল্লি। অধ্যাপক সিংয়ের মতে, চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ফলে নেপাল ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে, যা ভারত কখনোই চাইবে না। বরং ভারত নেপালকে উন্নয়নের সহযোগী অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়।

এদিকে ভৌগোলিক নৈকট্যের বিষয়টি উল্লেখ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা বিবিসিকে বলেন, “ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমেই নেপালের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাদের ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ভাগ্য অনেকটা নির্ধারিত হতে পারে ঝাপা–৫ আসনের ফলাফলের ওপর। যে আসনকে এতদিন নিজের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখতেন কেপি শর্মা ওলি, সেই আসনের চিত্র এবার বেশ পাল্টে গেছে।

নেপালি ভাষার পত্রিকা ‘নয়া পত্রিকা’র ঝাপা অঞ্চলের সাংবাদিক চিরঞ্জীবী ঘিমিরে বিবিসিকে বলেন, “২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে মি. ওলি ঝাপা–৫ এলাকায় খুব কম সময় দিতেন। তিনি বলতেন ঝাপায় প্রচারের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। মি. ওলি এখন ঝাপা–৫ ছাড়া কোথাও প্রচার করছেন না। অন্যদিকে বালেন শাহ ঝাপা–৫ বাদে প্রায় সর্বত্র প্রচার চালাচ্ছেন।”

তবে ঝাপা–৫ আসনে ওলির প্রচারের ব্যবস্থাপক রোহিত কুমার উপ্রেতি জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, “এখানে আমরাই জিতব। বালেন এই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাঁর সমর্থন মূলত সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ।”

নেপালের কমিউনিস্ট সরকারগুলো অতীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও সরাসরি ভারতবিরোধিতায় জড়ায়নি। তবে বালেন শাহের অবস্থানকে অনেকেই তুলনামূলকভাবে ‘কট্টর’ বা হার্ডলাইনার হিসেবে দেখছেন।

কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে তিনি নিজের দপ্তরে ‘অখণ্ড নেপাল’-এর একটি মানচিত্র টাঙিয়ে রেখেছিলেন। সেই মানচিত্রে ভারতের লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি ছাড়াও বিহারের মিথিলাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা এবং সিকিমকে নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে বালেন শাহ আগে বলেছেন, “এই মানচিত্র রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক।” তাঁর ভাষায়, “ভারত যদি সংসদ ভবনে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র রাখতে পারে, তাহলে এই মানচিত্রেও সমস্যা থাকার কথা নয়।”

এছাড়া অতীতে কয়েকটি বলিউড চলচ্চিত্র নেপালে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেও তিনি আলোচনায় এসেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বালেন শাহের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির উত্থান ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ তাঁর দল যদি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সক্ষম হয়, তবে বালেন শাহই হবেন নেপালের প্রথম ‘মধেশি’ জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা নেতা।

যদিও তিনি নিজে এই পরিচয় নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না। নেপালের তরাই অঞ্চলে বসবাসকারী অ-নেপালি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে সাধারণত ‘মধেশি’ নামে ডাকা হয় এবং বিহার লাগোয়া অঞ্চলগুলোতে এই জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য রয়েছে।

নতুন ডেস্ট্রয়ার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার, সম…
  • ০৫ মার্চ ২০২৬
বিএনপি-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বৈঠক: গত সরকারের সময় স্বাক্…
  • ০৫ মার্চ ২০২৬
যে ৯ উপজেলা দিয়ে শুরু হচ্ছে ‘কৃষি কার্ড’ বিতরণ
  • ০৫ মার্চ ২০২৬
ঈদের ছুটি বাড়াল সরকার
  • ০৫ মার্চ ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাভার্ড ভ্যানে থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্…
  • ০৫ মার্চ ২০২৬
মাটিতে পোঁতা হলো ১০ মণ গরুর মাংস, বিক্রেতাকে জরিমানা
  • ০৫ মার্চ ২০২৬