ড. কামরুল হাসান মামুনের প্রশ্ন
অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান © সংগৃহীত
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র বাজেট সংকট, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং আবাসিক হলগুলোর মানবেতর পরিবেশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। দেশের ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাত্র এক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগে ন্যূনতম যোগ্যতা পিএইচডি কিংবা পোস্টডক না করা এবং মাত্র ১৫ মিনিটের ইন্টারভিউতে শিক্ষক বাছাইয়ের মতো বিবর্তনহীন প্রক্রিয়ার কারণে উচ্চমানের শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না।
একই সাথে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন নিশ্চিত না করে গণরুমে গাদাগাদি করে রাখার ফলে দেশের সেরা মেধাবীরা শুরুতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তর না করে জাতিকে উন্নত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আজ সোমবার (২৯ জুন) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে আলোচনাকালে অধ্যাপক মামুন এমন মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, আমি খুব দুঃখ পাই যখন বাজেট বরাদ্দকে খুব প্রশংসা করা হয়। কারণ ৫৮টা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকার এক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। আর একটা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ হলো ৬.৭ বিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্ররা যেভাবে থাকে, এক থেকে ৩০০ ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, আপনি গিয়ে দেখেন আবাসিক ছাত্ররা থাকে থ্রি স্টার হোটেলের মতো ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থায় থেকেও এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে অনেক মেধাবী ছাত্র তৈরি করছে, সেটা একটা মিরাকল।
তিনি আরও বলেন, প্রথম বর্ষে এসেই আমাদের মেধাবী ছাত্ররা নষ্ট হয়ে যায়, কারণ তারা হলে সিট পায় না। সারা পৃথিবীতে প্রথম বর্ষের ছাত্রদেরকে সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে যারা সিনিয়র হয় তাদেরকে বলা হয় তোমরা এবার নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করো। যদি সম্ভব হয়। আর আমাদের ছেলেরা আবাসিক হলগুলোতে গণরুম, যেখানে চারজন থাকার কথা সেখানে ৪০ জন থাকে। এই হল একটা বিশ্ববিদ্যালয়।
অধ্যাপক মামুন বলেন, যখন আমার মানসপটে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিভার্সিটি নামটা আসে, তখন আমার একটা চিত্র ভেসে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্র। সেখানে গবেষণার জন্য ইকোসিস্টেম লাগে। পিএইচডি প্রোগ্রাম, পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ এবং শিক্ষক-অধ্যাপক, অত্যন্ত মেধাবী অধ্যাপক। এই তিনটি সিস্টেম যখন একত্রিত হয়, জ্ঞান সৃষ্টি হয় সেখানে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। একজনও পোস্টডক পজিশনে নাই, শক্তিশালী পিএইচডি প্রোগ্রাম নাই। গবেষণা হবে কীভাবে? যেগুলো এক থেকে ৩০০ ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে আছে, সেগুলো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বিভাগে মিনিমাম ২০ থেকে ৩০ এবং ৪০ জন পোস্টডক থাকে।
শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো শিক্ষক। ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়োগটা ইউনিভার্সাল হতে হবে। আমি একভাবে নিয়োগ দিব, হারভার্ড-এমআইটি বা অন্যান্য বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরেকভাবে হবে, তা হয় না। ১০০ বছর আগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি যেভাবে আসত, আজও আমরা সেইভাবে। কোন বিবর্তন নাই। বিবর্তনহীন কোনো প্রতিষ্ঠান আগাতে পারে না।
তিনি বলেন, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতা হলো পোস্টডক। ন্যূনতম যোগ্যতা হওয়া উচিত পিএইচডি। আর শিক্ষক নিয়োগটা হওয়া উচিত ন্যূনতম তিনটা স্তরে। পৃথিবীর কোন দেশে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ১৫ মিনিটের একটা ইন্টারভিউতে, ঠিক ৮৬টা ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেকটা নিয়োগ বোর্ডের প্রধান একজন উপাচার্য অথবা কোন উপাচার্য, কোথায় আছে? তিনটা-চারটা যদি স্তর থাকে, কোনো ভুল থাকলে অন্য জায়গায় ফিল্টারড হয়ে যাবে। শর্টলিস্টেড হতে হতে ফাইনাল একটা জায়গায় ভাইস চ্যান্সেলর অথবা প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর থাকতে পারেন। যতদিন পর্যন্ত আমরা তিনটা বা চারটা স্তরে শিক্ষক নিয়োগ না করবো, ততদিন পর্যন্ত আমরা উচ্চমানের শিক্ষক পাবো না।
তিনি আরও বলেন, গবেষণায় ২%, ১৪ কোটি টাকা। অধিকাংশ ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক তার থেকে কয়েক গুণ বেশি টাকায় পায়, গবেষণা করে। আর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ কিভাবে ১৪ কোটি হয়? এটা আমার মাথায় ধরে না। আবার এবার শুনছি তাও দেওয়া হয় নাই। হাউ ফানি! লজ্জাস্কর। আজ পর্যন্ত কোন উপাচার্য সরকারের কাছে একটা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি করেছে শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট কত হওয়া উচিত? আমরা তো সে প্রশংসা করি।
৪০ হাজার ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ন্যূনতম ১২ হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলে হবে এটা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে গেলে টের পাওয়া যাবে, পরিবেশ থাকবে অন্যরকম। এখানে যে হাইয়েস্ট কনসেন্ট্রেশন অফ এডুকেশন পিপল থাকে, তার রিফ্লেকশন আমাদের ক্যাম্পাসে আছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত এর বর্ণনা দিয়ে ড. মামুন বলেন, জানালার দিকে তাকালে, বোর্ডের দিকে তাকালে, শিক্ষকদের দিকে তাকালে, ছাত্রদের দিকে তাকালে, আবাসিক হলগুলোর দিকে তাকালে টের পাওয়া যাবে। একটা পার্কের মত একটা অবস্থা থাকে। আমাদের ক্যান্টনমেন্ট মোটামুটি বলা যায়। আইরনি! বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এরকম। বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে হেটে গেলে একটা আন্তর্জাতিক পরিবেশ পাওয়া যেত। আমাদের আন্তর্জাতিক একটা হল আছে। এটাকে আপনি আন্তর্জাতিক মানের একটা গেস্ট হাউস বানান এবং প্রতিবছর অনবরত পার্টটাইম গেস্ট টিচার বিদেশ থেকে আনা-নেওয়া, পোস্টডক নিয়োগ দেন, এদেরকে দিয়ে ক্লাস নেওয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নত হবে।
ছাত্ররা কি শুধুমাত্র ক্লাসরুমে শুনেই শিখবে— প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমাদের ছাত্র-শিক্ষকের কোন মিলন কেন্দ্র নাই। কোন ক্যাফিটেরিয়ায় গেলে লেখা থাকে ‘শিক্ষকদের জন্য’। কেন? ছাত্র-শিক্ষক একসাথে গেলে কী সমস্যা হয়? সমস্ত জায়গায় লেখা আছে— শিক্ষকদের জন্য, ছাত্রদের জন্য, কেন এমন? টয়লেট ছাত্রদের জন্য, শিক্ষকদের জন্য। আমাদের এরকম ডিভিশন কেন?
তিনি বলেন, সক্রেটিস প্লেটোকে শিখিয়েছে, কোথায়? গাছতলায়, বাড়িতে, মাঠে, রাস্তায় হেঁটে। সুতরাং ছাত্র-শিক্ষক যখন একসাথে হাঁটবে, গল্প করবে, একসাথে খাবে...। আমি যখন পিএচডি করি, বা পোস্টডক করি, দুপুরে লাঞ্চের সময় হলে আমার সুপারভাইজার সবাইকে ডাকছে, একসাথে ১০-১২ জন মিলে ক্যাফেটেরিয়াতে গেছি গল্প করতে। আই লার্ন মোর দেয়ার দ্যান আই লার্ন টু দ্য ক্লাস।
সিনেটে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে ঢাবির এই অধ্যাপক বলেন, জ্ঞান সৃষ্টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আমাদের এখানে চারজন সংসদ সদস্য আছেন। আমি ওনাদেরকে রিকোয়েস্ট করবো। উনারা আইনপ্রণেতা। এই মেসেজটা নিয়ে যাবেন। কারণ বাংলাদেশ কীভাবে চলবে? ওই মানুষগুলো তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা যদি ভালো মানের মানুষ না তৈরি করি, বাংলাদেশ ভালো চলবে না। সিম্পল, অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট।
প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে এমন একটা উদাহরণ দেখান যে, দেশ উন্নত হয়েছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পিছনে পড়ে আছে? ৩০ বছর আগে আমি যখন চায়নাতে গেছিলাম, একরকম ছিল। চায়না যে এত এগিয়েছে, তার সাথে সাথে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে একই পজিশনে চলে আসছে।
ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত না করে, ভালো মানুষ তৈরি না করে আপনি জাতিকে উন্নত করবেন, এই জিনিস যদি আপনার হৃদয়ঙ্গম না করতে পারেন, সরকার যদি এটা বুঝতে না পারে, হবে না। শুধু ক্যাম্পাসে রাজনীতি রাজনীতি করে করে হবে না। গবেষণা, পড়াশোনা...। পৃথিবীতে ইংল্যান্ড এত বছর যাবত কেন টিকে আছে? কারণ ওনাদের ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, ইম্পেরিয়াল, ক্রিস্টিয়ান। আমেরিকা সুপার পাওয়ার কেন? সিঙ্গাপুর এত ছোট্ট একটা দেশ, এত উন্নত কীভাবে? চায়না কীভাবে উন্নত হচ্ছে? সাউথ কোরিয়া কীভাবে উন্নত হচ্ছে? জাপান কীভাবে উন্নত? ইউ উইল নট ফাইন্ড আ সিঙ্গেল কান্ট্রি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড যারা উন্নত হয়েছেন ইউনিভার্সিটি ছাড়াই।
দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যদি আমরা একত্রিত হই, সবাই মিলে এই দাবিটা তুলতে হবে— উপাচার্য মহোদয়কেও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি জানাতে হবে। আমরা দাবি তো জানাই নাই। আমাদেরকে দাবি জানাতে হবে। মাত্র ১৪০০ কোটি টাকা, হোয়াই? ১৪ হাজার কোটি টাকার দাবি জানানো উচিত ছিল। তবুও কম।