ইন্টারনেট ব্যবহারে আদবকেতা: পর্ব-৪
প্রতীকী ছবি © টিডিসি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু বিনোদন বা সময় কাটানোর জায়গা নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রায় যেন অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এক্স ইত্যাদি সব প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ মতবিনিময় করেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন কিংবা তথ্য সংগ্রহ করেন। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের হাতে এনে দিয়েছে অসীম সুযোগ, তবে একই সঙ্গে উন্মোচন করেছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। অনলাইনে প্রতিদিনই হয়রানি শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
বিশেষ করে নারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক সময় হয়ে ওঠে ভয়ের জায়গা। অশালীন মন্তব্য, বডি শ্যামিং, মিথ্যা প্রচারণা, ভুয়া প্রোফাইল থেকে বিরক্তিকর বার্তা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি–তথ্য ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি প্রতিদিনকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পর্ব-১ পড়ুন: অনলাইনে যে ভদ্রতাটুকু না জানলেই নয়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-র ২০২৫ সালে প্রকাশিত ৪র্থ ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন, ২০২৫) প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশই নারী। পাশাপাশি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডিজিটাল বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময় অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
অনলাইনে বাজে অভিজ্ঞতা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করে দেন, আবার কেউ মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন। অনলাইনে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হয়েছেন কিছু নারী।
দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশই নারী। পাশাপাশি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডিজিটাল বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন সময় অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাইবার বুলিং, বডি শ্যামিং ও ‘ডক্সিং’ অর্থাৎ ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে হয়রানির অভিযোগ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নিচ্ছে বটে, কিন্তু সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি এতটাই বড় যে আইন একা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা এবং সবার মধ্যে অনলাইনে শালীন আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
অনলাইনে নারীর প্রতি হয়রানির কিছু উদাহরণ
বেশ কয়েকবছর আগেও অনলাইনে নারীর প্রতি হয়রানির মাত্রা এতটা ব্যাপক ছিল না। তবে তা পাল্টে যায় করোনাকাল থেকেই। ২০২০ সালের শুরুর দিকে করোনা মহামারীর কারণে মানুষ গৃহবন্দি হতে বাধ্য হয়। তখন থেকেই মানুষের জীবন বেশ অনেকটাই অনলাইন নির্ভর হয়ে পরে। সেই সময়টাতে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা যেন লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। আর সেই লাগাম যেন কোনোভাবেই টেনে ধরা যাচ্ছে না।
পর্ব-২ পড়ুন: ধর্মের পবিত্রতা থাকুক ডিজিটাল জীবনের বিশ্বাসেও, কথায় আসুক সতর্কতা
চলতি বছরের এপ্রিলে, লালমনিরহাটের আদিতমারীতে এক গৃহবধূর (২০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পারিবারিক বিরোধের জেরে এআই দিয়ে বানানো আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানসিক যন্ত্রণায় তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
জানা গেছে, এআই প্রযুক্তি দিয়ে ওই গৃহবধূর আপত্তিকর ভিডিও বানানো হয়েছিল। পরে একটি ফেইক আইডির মাধ্যমে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছি। ভিডিও পাঠানো হয়েছিল গৃহবধুর স্বামী ও বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের কাছে। ভিডিওয়ের জেরে স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় ওই গৃহবধুর। এ অবস্থায় পরিবারের লোকজন ওই গৃহবধু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার একটি ছবি ফেসবুক থেকে নিয়ে বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। সেই ঘটনায় আমি কয়েক মাস ক্লাসে যেতে পারিনি।’
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সানিয়া আনজুম পারভীন ফেসবুকে মাঝেমধ্যে রাজনীতি নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, তিনি কোনো মতামত লিখলেই অশালীন ভাষায় গালাগালির শিকার হন। তিনি বলেন, ‘আমাকে বলা হয়, নারী হয়ে রাজনীতি বোঝার চেষ্টা করো না। মাঝে মাঝে পরিবার নিয়েও কটূক্তি করা হয়।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য নারী। সেই সময়েও রাজপথে নামা অনেক নারী পরে সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছে। গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া একাধিক নারী জানান, বিভিন্ন সময় তারা অনলাইনে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। তাদের নিয়ে বিকৃত ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। এতে মনোবল টলে গেছে অনেকেরই।
পর্ব-৩ পড়ুন: অনলাইনে রাজনৈতিক ভিন্নতার মধ্যেও শিষ্টাচারে ঐক্য জরুরি
ছাত্র–জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এক নারী বলেন, তার বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপিং করে তাতে ‘হেট কমেন্ট’ করা হতো, বিকৃত ভিডিও তৈরি করা হতো। সেসব নিয়ে প্রতিবেশীরা তার মা–বাবাকেও উত্ত্যক্ত করা শুরু করেছিলেন। তবে মা–বাবা সেসব উপেক্ষা করে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আরেক নারী বলেন, তার এক সহপাঠী হয়রানি সহ্য করতে না পেরে আন্দোলন–পরবর্তী সব কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ান।
পুলিশ সদর দপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুসারে, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী অনলাইনে হয়রানি, প্রতারণা ও সাইবার ক্রাইমের অভিযোগ করেন।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপকমিশনার (ডিসি) মোসাম্মৎ ফারহানা ইয়াসমিনের বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে ১ হাজার ৭৩৭টি হয়রানির অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২৫৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫৬, মার্চে ১৯৫, এপ্রিলে ২৪৫, মে মাসে ৯৮, জুনে ৯৭, জুলাইয়ে ২১৫, আগস্টে ১৯৮, সেপ্টেম্বরে ১৭৬ টি অভিযোগ আসে।
‘সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের মনো-সামাজিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল্যায়ন’ শিরোনামের এক পিএইচডি গবেষণায় বলা হয়েছে, সাবেক প্রেমিকের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন মেয়েরা। এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশ।
অনলাইন বন্ধুর মাধ্যমে ২০ শতাংশ, অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ১৬ শতাংশ, সাবেক স্বামীর মাধ্যমে ১২ শতাংশ, বন্ধুর মাধ্যমে ৮ শতাংশ, সহকর্মী ও সহপাঠীর মাধ্যমে ৬ শতাংশ এবং স্বজনদের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শহরের বাসিন্দা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, প্রায় ২৯ শতাংশ সরকারি ও ২০ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১২ শতাংশ গৃহিণী।
গবেষণাটির সময়কাল ছিল ২০২১–২২ সাল। বর্তমানে তা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি করেন একই বিভাগের শিক্ষক রোকসানা সিদ্দীকা।
একশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণা থেকে দেখা যায়, শতকরা ৬৪ জন নারীই জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইনে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আবার যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ইনবক্সে অশ্লীল ছবি বা অনৈতিক প্রস্তাবের মাধ্যমে হয়রানি করা হয়েছে ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশ নারীকে; পাশাপাশি সাইবার স্টকিংয়ের শিকার হয়েছেন ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ নারী। এভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা উপায়ে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পুলিশ প্রসাশনের পরামর্শ
নারীর অধিকার ও আইনি সহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, অনলাইনে নারীদের নিরাপদ রাখতে হলে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। আর ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা তৈরি করতে হলে দেশের সরকার ও ডিজিটাল ক্ষেত্রগুলোয় অবদান রাখতে চায় এমন অংশীদারদের ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। অনলাইনে সচেতনতা বাড়াতে আমাদের ব্যাপক প্রচারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্তত সবাই যেন এটা জানতে পারে, অনলাইন বা অফলাইন যেখানেই নারীর প্রতি হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটুক না কেন, এটা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এর ব্যবহারকারী, মিডিয়া, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই আমাদের পক্ষে নারীর জন্য নিরাপদ ডিজিটাল স্পেস তৈরি করা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধ করতে প্রধানত দুটি গুরুত্বপূণ পথ আছে। প্রথমটি আইনি ব্যবস্থায় জোরারোপ। দ্বিতীয়টি সমাজ মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন সাধন। আইনের ক্ষেত্রে বলতে গেলে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত সাইবার অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্রমাণ এবং সাক্ষ্যের যে প্রক্রিয়া সে বিষয়েও সাধারণের জানা নেই। তৃতীয়ত, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে নারীর অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রে যে জড়তা সেটা দূর করার জন্য কোন আইনের কোন সেশনে অভিযোগ দাখিল করে কী ধরনের শাস্তি আদায় করা সম্ভব সেটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা এবং জনগণকে জানানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানের ওপর জোর দেন তিনি।
জেন্ডার গবেষক ও বেসরকারি সিটি ইউনির্ভাসিটির শিক্ষক মিথিলা ফারাজানা বলেন, ফেসবুকে পিরিয়ড, যৌন শিক্ষা বা ধর্মীয় ট্যাবু নিয়ে কথা বললে নারীরা ‘ইসলামবিরোধী’ বলে অভিযোগে অশ্লীল গালিগালাজের শিকার হন। এক নারী শিক্ষিকা পিরিয়ড নিয়ে পোস্ট করায় তাকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে আক্রমণ করা হয় কয়েকদিন আগে। অথচ, কুরআনের সূরা বাকারা (২:২২২) এবং সহীহ মুসলিমের হাদিসে (৫৭৭, ৫৯১) পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা আলোচনা রয়েছে। তবু, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের বিরুদ্ধে সেন্সরশিপ তৈরি করা হচ্ছে। ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে নারীদের হয়রানি বন্ধ করতে হবেই।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপকমিশনার (ডিসি) মোসাম্মৎ ফারহানা ইয়াসমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনলাইনে নারীদের হয়রানি, প্রতারণা ও হ্যাকিং থেকে সুরক্ষিত থাকতে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, নারীরা কীভাবে অনলাইনে নিরাপদ থাকতে পারেন— এ বিষয়ে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। থানা থেকে যে সব মামলা তাদের ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়, সেগুলোর তদন্তও তারা সম্পন্ন করেন। ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে সময় অপচয় থেকে বিরত রাখতে উৎসাহিত করা।
অনলাইনে নারীর প্রতি আচরণে শালীনতার চর্চা জরুরি
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি নারী কমবেশি অনলাইনে হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক সচেতনতা ও শালীন আচরণের প্রচলন। এখানে কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া যায়।
আরও পড়ুন: মায়ের পথে মেডিকেলে দ্বিতীয় হওয়া নাবিহা, বললেন— ‘আমার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই’
১. বুলিং ও বডি শ্যামিং কখনো করবেন না
কোনো নারীর ছবি বা পোস্ট দেখলে তার পোশাক, শারীরিক গঠন বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অযথা মন্তব্য করা অনেকে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় এই মন্তব্য যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা বিদ্রূপাত্মক হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ ধরনের আচরণ নারীর মানসিক আঘাত বাড়ায় এবং সামাজিকভাবে নারীর প্রতি অসম্মানও বৃদ্ধি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে বুলিং বা শারীরিক অবমাননা মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
২. নারীর ভুয়া তথ্য ও ছবি অনলাইনে কখনোই দেবেন না
অনেক সময় দেখা যায়, নারীর ছবি এডিট করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কেউ কেউ হ্যাকিং করে ব্ল্যাকমেলও করেন। এমন কর্মকাণ্ড সরাসরি নারীর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আইনের চোখে দণ্ডনীয়।
৩. সম্মানজনক মন্তব্য করুন
নারীর ছবি, ভিডিও, কিংবা পোস্টে দেখা যায়, অসংখ্য মানুষের অসম্মানজনক নানা মন্তব্য। নারীর কোনো পোস্ট বা ছবিতে বিদ্রূপমূলক নয়, বরং উৎসাহ ও ইতিবাচক মন্তব্য করুন। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া নারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং অনলাইন পরিবেশকে সুস্থ রাখে।

৪. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করুন
নারীর ব্যক্তিগত তথ্য কখনোই অনুমতি ছাড়া অনলাইনে প্রকাশ করা উচিত নয়। অনুমতি ছাড়া ছবি বা তথ্য শেয়ার করা অনৈতিক ও দণ্ডনীয় অপরাধ। অনলাইনেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুত্ব বাস্তব জীবনের মতোই অপরিসীম।
৫. অনলাইনে ভদ্রতা বজায় রাখুন
বাস্তব জীবনে যেমন শালীন আচরণ দেখানো হয়, ভার্চুয়াল জীবনেও সেই নীতি অনুসরণ করতে হবে। ভাষা, টোন ও মন্তব্যের ভদ্রতা অনলাইন পরিবেশকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখে।
৬. হয়রানি দেখলে প্রতিবাদ করুন
যদি কেউ অনলাইনে নারীর প্রতি অপমানমূলক আচরণ করে, নীরব থাকবেন না। বন্ধু, পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। সক্রিয় প্রতিবাদ অনলাইন সংস্কৃতিকে বদলাতে সাহায্য করে।
৭. আইনের আশ্রয় নিন
অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনলাইনে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা বেড়েছে। অশ্লীল, যৌন হয়রানিমূলক বার্তা ও ছবি পাঠানো, ভুয়া আইডি তৈরি ইত্যাদি নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। অনলাইনে প্রতিদিন অসংখ্য নারী হয়রানির শিকার হলেও অনেকে আইনের আশ্রয় নেন না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েও আইনি পদক্ষেপ নেন না ৮৮% ভুক্তভোগী নারী। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা, ভুক্তভোগী নারীদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
৮. সামাজিক সচেতনতা তৈরি করুন
শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতি সম্মান ও শালীন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অনলাইনও সমাজের প্রতিচ্ছবি। যদি আমরা অনলাইনে নারীর সম্মান না করি, তবে সেই অসভ্যতা সমাজেও ছড়িয়ে পড়বে।
৯. নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে
সামগ্রিকভাবেই নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই মূলত অনলাইনে নারীরা অসহায়বোধ করেন। এজন্য সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। তাহলেই নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দর আগামী গড়া সম্ভব।
১০. দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন
অনেক অনলাইনে ব্যবহারকারীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতার অভাব লক্ষ্যণীয়। প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার সুবিধা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীল ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সম্মান বজায় রাখার মাধ্যমে সমাজের সভ্যতা, নৈতিকতা ও ভার্চুয়াল নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এজন্য পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের অনলাইনে নারীর প্রতি সম্মান ও শালীন আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।
সর্বোপরি, অনলাইন শালীনতার চর্চা কেবল নারীর নিরাপত্তার জন্যই নয়, দেশের ডিজিটাল পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখার জন্যও অপরিহার্য। তাই প্রতিটি ব্যবহারকারীর দায়িত্ব, প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণের সঙ্গে সমানভাবে শালীনতা, ভদ্রতা ও দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখা। নারীকে হেয় না করে সম্মান করার মধ্যেই সমাজের সভ্যতার পরিচয় লুকিয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোক একে অপরকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার জায়গা, আক্রমণ ও হয়রানির নয়। তাই সময় এসেছে নারীর প্রতি আচরণে শালীনতার চর্চা সামাজিক মাধ্যমেও নিশ্চিত করার।