ইন্টারনেট ব্যবহারে আদবকেতা: পর্ব-২

ধর্মের পবিত্রতা থাকুক ডিজিটাল জীবনের বিশ্বাসেও, কথায় আসুক সতর্কতা

১৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:১৭ PM , আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:২৬ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © টিডিসি

মানবজীবনের সঙ্গে ধর্ম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ধর্ম আমাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও আচরণকে শুদ্ধ করে তোলে। অন্যদিকে, আধুনিক বিশ্বে আমাদের জীবনের এক বিশাল অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গড়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, টিকটক কিংবা নানা ওয়েবসাইটে আমরা প্রতিদিন মতামত জানাই, তথ্য আদানপ্রদান করি, এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলি।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, ধর্মের মতো পবিত্র ও সংবেদনশীল বিষয় ডিজিটাল জগতে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা জরুরি। ধর্মের অপব্যাখ্যা বা অপব্যবহার মারাত্মক বিপর্যয় ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা এর প্রমাণ।

এজন্য ধর্মের পবিত্রতাকে সুরক্ষিত রাখতে হলে অনলাইনে আমাদের আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল ও নৈতিক হতে হবে। কারণ ধর্ম যেমন সমাজে শান্তির বার্তা বহন করে, তেমনি ডিজিটাল যুগেও তার প্রতিফলন হওয়া উচিত বিশ্বাস, আস্থা ও মানবিকতার মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেছে, ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্টের জেরে সহিংসতা, ভাঙচুর, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পেছনে প্রমাণিতভাবে অনলাইন উসকানি ও ভুয়া তথ্যের ভূমিকা আছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয় প্রকাশে সবারই দায়িত্বশীল হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবু সায়েম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই অঞ্চলে হাজার বছর ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলামসহ নানা ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছেন। তবে ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক সংঘাতও ঘটেছে। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে না বুঝে ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য করেন বা পোস্ট দেন, আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ধর্মকে কটাক্ষ করেন—যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলতে হলে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চর্চা করা উচিত।

অনলাইনে ধর্ম নিয়ে কটুক্তি ও সংঘাতের চিত্র
অনলাইনে ধর্মকে ব্যবহার করে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ানো নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও নানা সময় দেখা গেছে, কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী ধর্মকে আড়াল বানিয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করেছে। ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দেওয়া হয়েছে। এমনকি ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা হত্যা পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, ডিজিটাল জগৎ শুধু জ্ঞান ও আলো ছড়ানোর জায়গা নয়, বরং অজ্ঞতা ও অন্ধকার ছড়ানোর জায়গায়ও পরিণত হতে পারে যদি আমরা সতর্ক না হই।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলার রামুতে বৌদ্ধদের ওপর পরিচালিত ভয়াবহ হামলা ছিল এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অন্যতম বড় উদাহরণ। উত্তম কুমার বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক তরুণের ফেসবুকে কুরআন অবমাননাকর ছবি ট্যাগ করা হয়েছিল, যা আসলে উত্তমের পোস্ট ছিল না। অথচ সেই গুজবকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধদের শত বছরের পুরনো মন্দিরগুলো এক রাতে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সম্প্রীতি, দেশের ভাবমূর্তি।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, অনেকে ধর্মের নামে অনলাইনে নানা অপতথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক পোস্ট বা লাইভে ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিকৃত করা হচ্ছে। মূলত তাদের উদ্দেশ্য থাকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, অর্থ উপার্জন বা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভুল পথে প্রলুব্ধ হতে পারে, দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগকে কেন্দ্র করে মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। জানা গেছে, ‘বেমজা মহসিন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়। এরপর উত্তেজিত জনতা মাইকে ঘোষণা দিয়ে স্থানীয় কফিল উদ্দিন শাহ ও হাওয়ালি শাহ মাজারে আগুন দেয় এবং কালাই শাহ ও আবদু শাহ মাজারে ভাঙচুর চালায়। পরে চারটি মাজারেই আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।

চলতি বছরের ২৬ জুলাই রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে অবমাননা করার অভিযোগে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক কিশোরের বাড়ি ও আশপাশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি, ব্যবসা ও মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর হয়। অভিযুক্ত কিশোর অভিযোগ অস্বীকার করলেও উত্তেজিত জনতা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়।

অন্যদিকে, ৪ অক্টোবর ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ আসে এবং এ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর প্রেক্ষিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এছাড়া, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কোরআন বিতরণ কর্মসূচি পালন করে ধর্মীয় সহনশীলতা ও শ্রদ্ধার বার্তা দেন।

সম্প্রতি ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেছেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সবাই যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তার জন্য সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রত্যেকের রাজনৈতিক–সাংস্কৃতিক অধিকার যেমন আছে, তেমনি ধর্মচর্চার অধিকার আছে। যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা ছড়ায়, উপাসনালয়ে হামলা চালায়, তাদের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই, তারা দুর্বৃত্ত। ধর্মচর্চায় কাউকে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেছেন, ‘ধর্ম পালনে কেউ যেন বাধা নিতে না পারে, সে জন্য সরকার সতর্ক রয়েছে। ধর্মীয় সংহতি বজায় থাকলে সংঘাত কমে আসবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়ে সতর্কতা জরুরি
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গেছে, ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্টের জেরে সহিংসতা, ভাঙচুর, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পেছনে প্রমাণিতভাবে অনলাইন উসকানি ও ভুয়া তথ্যের ভূমিকা আছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয় প্রকাশে সবারই দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ যেমন পবিত্র, তেমনি সেটি নিয়ে কোনো অসাবধানী বা বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ অশান্তি সৃষ্টি করে। এজন্য ধর্ম নিয়ে কোনো ধরনের কনটেন্ট শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে কিছু মৌলিক সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।

১. তথ্য যাচাই ও নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার
ধর্মীয় পোস্ট, ছবি, বা ভিডিও শেয়ারের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। ভুয়া খবর বা উসকানিমূলক কনটেন্ট, যেমন রামুর বৌদ্ধ সংঘর্ষে কুরআন অবমাননার গুজব, সমাজে উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টি করে। ধর্মীয় আলোচনায় প্রামাণিক গ্রন্থ, শিক্ষাবিদ, বা গবেষকের নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার করলে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা এড়ানো যায়।

২. আবেগ নয়, বিবেচনা 
ধর্মীয় বিষয়ে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া বিপজ্জনক। অনলাইনে পোস্ট বা মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করে শান্তভাবে বিবেচনা করে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত, যাতে উসকানি বা বিভ্রান্তি ছড়ানো না হয়।

৩. বিদ্বেষ এড়িয়ে সহনশীলতা বজায় রাখা
নিজ ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে অন্য ধর্মকে হেয় করা বা কটূক্তি করা অগ্রহণযোগ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে। ধর্ম নিয়ে আলোচনায় ভিন্নমতকে সম্মান করে যুক্তিসম্মতভাবে মতবিনিময় করা উচিত, যাতে বিতর্ক সংঘাতে রূপ না নেয়।

আরও পড়ুন: বসুন্ধরার সামনে ব্যবসায়ীদের ফের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ

৪. ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রতীকের প্রতি সম্মান
ধর্মগ্রন্থ, প্রতীক, বা পূজাস্থান নিয়ে অবমাননাকর ভাষা, ছবি, বা ভিডিও প্রকাশ আইনত অপরাধ এবং নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। এটি সামাজিক অস্থিরতা ও সম্প্রদায়িক বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করে।

৫. শিশু-কিশোরদের সচেতন করা
কিশোর-কিশোরীরা প্রায়ই না বুঝে ধর্মীয় পোস্ট বা মন্তব্য করে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সচেতন করলে ভুয়া খবর বা কটূক্তি ছড়ানো রোধ হবে এবং সমাজে সহনশীলতা বজায় থাকবে।

৬. ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীলতা
ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। ভুল তথ্য বা ধর্মের অপব্যাখ্যা ছড়ানো এবং অন্য ধর্মের ওপর নিজ রীতি চাপানো অনলাইনে অসন্তোষ ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তাদের সতর্ক থাকা অপরিহার্য।

৭. আইন মেনে চলা
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা বা ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ অসাবধানতা আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।

সর্বোপরি, ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মত প্রকাশের আধুনিক মঞ্চ। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে অনলাইন জগৎ অস্থিরতা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তাই প্রত্যেক ব্যবহারকারীর দায়িত্ব ধর্ম নিয়ে পোস্ট, মন্তব্য বা ছবি প্রকাশের সময় সতর্ক থাকা এবং ধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করা।

লাইনে দুর্ঘটনা, রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় গ‍্যাস বন্ধ
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
১১ দলের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা বুধবার বিকাল সাড়ে ৪ টায়
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
তিন শর্ত মেনে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে প্রার্থীদের, প্রত্যাখ্য…
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
পর্দা নামলো ঢাবির এফ এইচ হল ষোড়শ জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
জমি বিক্রির টাকা না দেওয়ায় বাবা-মাকে জ্যান্ত কবরের চেষ্টা
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
নিকাব নিয়ে বিএনপি নেতার মন্তব্যের প্রতিবাদে জবি ছাত্রীসংস্থ…
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9