ইউটিউব © সংগৃহীত ও টিডিসি সম্পাদিত
অনলাইনে শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও কিশোর ব্যবহারকারীদের কাছে খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ (ইটিং ডিসঅর্ডার) সম্পর্কিত ক্ষতিকর ভিডিও সুপারিশ করছে ইউটিউবের অ্যালগরিদম। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ডিজিটাল ঘৃণা ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেটের (সিসিডিএইচ) গবেষণায় দেখা গেছে, ইউটিউবের আপ নেক্সট ফিচারের মাধ্যমে সুপারিশ করা প্রতি ১০টি ভিডিওর মধ্যে অন্তত একটি ভিডিওতে অতিরিক্ত ওজন কমানো, অস্বাস্থ্যকর ডায়েট বা ক্ষতিকর শরীরচর্চার মতো বিষয়বস্তু ছিল।
গবেষণার জন্য যুক্তরাজ্যের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর পরিচয়ে একটি পরীক্ষামূলক অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হয়। এরপর ডায়েটিং ও শরীরের গঠনসংক্রান্ত ১০টি ভিডিও দেখার পর ইউটিউব যে ১০০টি ভিডিও সুপারিশ করে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৬ সালে সুপারিশকৃত ভিডিওগুলোর ১০ শতাংশ ক্ষতিকর ইটিং ডিসঅর্ডার-সংক্রান্ত কনটেন্ট ছিল। যদিও ২০২৪ সালে একই ধরনের পরীক্ষায় এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিশোর-কিশোরীদের প্রোফাইল ব্যবহার করেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে।
অনলাইন নিরাপত্তা আইন কার্যকর হলেও উদ্বেগ
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে অনলাইন সুরক্ষা আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যকর হয়। এই আইনের আওতায় ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি ও খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগকে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট থেকে সুরক্ষিত রাখার আইনি দায়িত্ব বর্তায়।
এ ছাড়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম কীভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেটিও মূল্যায়ন করে ঝুঁকি কমানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে কোম্পানিগুলোকে তাদের বৈশ্বিক আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
কী ধরনের ভিডিও পাওয়া গেছে
গবেষণায় ইউটিউবের সুপারিশে এমন ভিডিও পাওয়া গেছে, যেখানে চরম রকমের রোগা শরীরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু ভিডিওতে দিনে মাত্র ১৭০ ক্যালোরি গ্রহণের মতো অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রচার করা হয়েছে। আবার কিছু ভিডিওতে অবচেতনভাবে ওজন কমানোর দাবি করে বিভ্রান্তিকর তথ্যও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ক্ষতিকর ভিডিওর নিচে অনেক ক্ষেত্রেই ইউটিউবের ক্রাইসিস প্যানেল বা সহায়তামূলক সতর্কবার্তা প্রদর্শিত হয়নি।
ইউটিউবের মালিক গুগল জানিয়েছে, ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গবেষণায় উল্লেখ করা ভিডিওগুলো ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, দর্শকদের সুস্থতা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ জন্য এনএইচএস, মাইন্ড এবং দ্য মিক্সসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা বা বিষণ্নতা সম্পর্কিত বিষয়ে অনুসন্ধান করলে বিশেষজ্ঞদের তৈরি তথ্যভিত্তিক ভিডিওও দেখানো হচ্ছে।
সিসিডিএইচের সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার আলেকজান্দ্রা জনসনের মতে, গবেষণাটি দেখিয়েছে যে নতুন নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের কাছে একটি ক্ষতিকর ভিডিওও পৌঁছানো উচিত নয়।
অন্যদিকে, খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগ নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা বিটের প্রধান নির্বাহী ভ্যানেসা লংলি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক কমিউনিটি উপকারী হতে পারে। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।’
আরও পড়ুন : লবঙ্গেই মিলতে পারে কাশির স্বস্তি, জেনে নিন সঠিক ব্যবহার
তার মতে, ব্যবহারকারীরা নোটিফিকেশন বন্ধ করা, স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখা, অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টে ‘আগ্রহী নই’ অপশন ব্যবহার, ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট ব্লক বা রিপোর্ট করতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজেদের পরিবেশ নিরাপদ রাখার দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি নিতে হবে।
লেস্টারের ২২ বছর বয়সী জ্যাজমিন কৌর বলেন, ‘১৩ বছর বয়সে তার অ্যানোরেক্সিয়া ধরা পড়ে। চিকিৎসার সময় ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু তথ্য সহায়ক হলেও অধিকাংশ কনটেন্ট তার মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তুলেছিল।’
তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর তিনি প্রায় সারাক্ষণ ফোন ব্যবহার করতেন। একসময় এমন চরম ধরনের কনটেন্ট দেখতে শুরু করেন, যেগুলোকে তিনি নিজের দুর্বলতা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি নিজের সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেন।
শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে যুক্তরাজ্য সরকার ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট ও এক্সসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এসব ব্যবস্থা ২০২৭ সালের বসন্ত থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি।