প্রতীকি ছবি © সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হয়েছে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬। বাংলাদেশে সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ, দমন, তদন্ত এবং বিচারের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতেই নতুন এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। গত ৩০ জুন সংসদে বিলটি পাস হয়। নতুন আইনটি মূলত ২০২৫ সালে জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের পরিমার্জিত রূপ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইনের বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ধারা বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেটিকেই সংশোধন করে বর্তমান আইন করা হয়েছে।
জুয়া সংক্রান্ত ধারা বাদ
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে অনলাইন জুয়া, জুয়ার অ্যাপ বা ডিভাইস তৈরি, জুয়ায় অংশগ্রহণ, সহযোগিতা কিংবা জুয়ার বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে নতুন আইনে এ অংশটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬ ও পাস হয়, যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর কার্যকর হয়েছে।
এ বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইনে জুয়া সংক্রান্ত ধারা রাখার আর প্রয়োজন নেই।’
এআই ও ডিপফেইক প্রথমবার স্পষ্টভাবে আইনের আওতায়
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ডিপফেইক কনটেন্টকে স্পষ্টভাবে অপরাধের আওতায় আনা। এখন থেকে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করে কারও ক্ষতি করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং বিভ্রান্তিকর ডিজিটাল কনটেন্টের সংজ্ঞাও হালনাগাদ করা হয়েছে, যাতে নতুন ধরনের অনলাইন অপরাধ মোকাবিলা করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা
আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে দ্রুত আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সরকার অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থাকে আপত্তিকর কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
প্রতারণা, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানিতে কঠোর শাস্তি
নতুন আইনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোয় অবৈধ প্রবেশ বা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতি করলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডও হতে পারে। সাইবার প্রতারণা বা ডিজিটাল মাধ্যমে জালিয়াতির অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সাইবার সন্ত্রাস, অননুমোদিত ই-ট্রানজ্যাকশন, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশ, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক তথ্য প্রকাশকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রিভেঞ্জ পর্ন ও ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইলও অপরাধ
নতুন আইনে কারও ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও সংরক্ষণ, প্রকাশের হুমকি দেওয়া, সুবিধা আদায়ের চেষ্টা কিংবা রিভেঞ্জ পর্নের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির নির্দেশনা
আইনে বলা হয়েছে, অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করতে হবে। প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ আরও ৯০ কার্যদিবস সময় বাড়ানো যাবে।
আরও পড়ুন : আজ প্রাথমিক শিক্ষা পদক তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী
বিশেষজ্ঞদের মত
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা নতুন আইনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এআই, ডিপফেইক ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় আইনটি আগের তুলনায় অনেক বেশি যুগোপযোগী হয়েছে। তবে আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে দক্ষ তদন্ত, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেনের মতে, আগের নিবর্তনমূলক অনেক ধারা বাদ যাওয়ায় এটি ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে সরকারের জবাবদিহিতা এবং কোনো সরকারি সংস্থা নাগরিকের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তার প্রতিকার কী হবে—সে বিষয়ে আইনে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
বিতর্কিত আইন থেকে বর্তমান আইনে যাত্রা
বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগে সমালোচিত ছিল। পরে সেটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এবং এরপর সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩-এ রূপ নেয়। এসব আইনও বিভিন্ন মহলে সমালোচনার মুখে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে এবং পরবর্তীতে সেটি সংশোধন করে ২০২৬ সালে সাইবার সুরক্ষা আইন হিসেবে সংসদে পাস করা হয়। তথ্যসূত্র: বিবিস বাংলা।