বিল ক্লিনটনের দুই মেয়াদে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইটের বিস্ফোরণই গড়ে দেয় আজকের ডিজিটাল বিশ্বের ভিত্তি। © টিডিসি সম্পাদিত
বর্তমান বিশ্বে সক্রিয় ওয়েবসাইটের সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি। কিন্তু এই বিশাল ডিজিটাল মহাবিশ্বের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৯৯৩ সালে। মাত্র ৫০টি ওয়েবসাইট থেকে ১ কোটি ৭০ লাখে পৌঁছানোর সেই আট বছরে। যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিল ক্লিনটন।
এটি এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন ইন্টারনেট গবেষণাগারের দেয়াল ভেঙে মানুষের ঘরে, ব্যবসায়, সংবাদমাধ্যমে, শিক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে কেবল।
বর্তমানে আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, সেটি মূলত World Wide Web-এর ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৯৩ সালে ওয়েব ছিল পৃথিবীতে একদমই নতুন বা নবজাতক পর্যায়ে। এরপর মাত্র আট বছরে পৃথিবীতে ওয়েবসাইটের সংখ্যা বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিল ক্লিনটন। সেদিন পৃথিবীতে সক্রিয় ওয়েবসাইটের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি। অধিকাংশ মানুষ তখনও জানতেন না ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ (World Wide Web) কি? আর ভবিষ্যতে এটিই যে সবচেয়ে বড় তথ্য ভাণ্ডারে যে পরিণত হবে সেটাও নিশ্চই কারো কল্পনাতেও ছিল না।
২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় পৃথিবীতে ওয়েবসাইটের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ (১৭ মিলিয়ন)। অর্থাৎ তার দুই মেয়াদের শাসনামলে ওয়েবসাইটের সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার গুণ। প্রযুক্তির ইতিহাসে এত দ্রুত বৈশ্বিক বিস্তারের উদাহরণ খুব কম।
বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান CERN-এ কর্মরত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার টিম বার্নার্স-লি ১৯৮৯ সালে World Wide Web-এর ধারণা দেন। ১৯৯১ সালে চালু হয় বিশ্বের প্রথম ওয়েবসাইট info.cern.ch। শুরুতে এটি ছিল বিজ্ঞানীদের তথ্য বিনিময়ের একটি মাধ্যম। (CERN)
শুরুতে পৃথিবীতে যে কয়েকটি ওয়েবসাইট ছিল সেগুলোর প্রায় সবই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তি সংগঠনের। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়েবের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৩ সালের ৩০ এপ্রিল।
সেদিন CERN ঘোষণা দেয়, World Wide Web প্রযুক্তি রয়্যালটি-ফ্রি এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ যে কেউ বিনামূল্যে ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারবে এবং এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।
ইতিহাসবিদদের মতে, যদি CERN এই প্রযুক্তিকে মালিকানাভুক্ত করে রাখত, তাহলে আজকের ইন্টারনেট সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। উন্মুক্ত লাইসেন্সই ওয়েবকে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে।
যে ব্রাউজার সাধারণ মানুষের জন্য ওয়েব খুলে দেয়। ১৯৯৩ সালেই আসে NCSA Mosaic। এটি ছিল প্রথম জনপ্রিয় গ্রাফিক্যাল ওয়েব ব্রাউজার, যেখানে একই পৃষ্ঠায় লেখা ও ছবি দেখা যেত। এর আগে ইন্টারনেট ব্যবহার ছিল মূলত টেক্সটনির্ভর এবং প্রযুক্তিবিদদের জন্য সীমাবদ্ধ।
মোজাইকের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই পরে তৈরি হয় Netscape Navigator, আর তার জবাবে আসে Microsoft Internet Explorer। এই প্রতিযোগিতাই পরবর্তীতে Browser Wars নামে পরিচিত হয় এবং কোটি কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো ওয়েবে প্রবেশের সুযোগ পায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ওয়েবসাইট বৃদ্ধির চিত্রটি ছিল এমন
| জানুয়ারি, ১৯৯৩ | ৫০টি |
| জুন ১৯৯৩ | ১৩০টি |
| ডিসেম্বর ১৯৯৩ | ৬২৩টি |
| ডিসেম্বর ১৯৯৪ | ১০,০২২টি |
| ১৯৯৫ সাল | প্রায় ২৩,৫০০টি |
| ১৯৯৬ সাল | ২,৫৭,৬০১টি |
| ১৯৯৭ সাল | প্রায় ১১ লাখ |
| ১৯৯৮ সাল | প্রায় ২৪ লাখ |
| ১৯৯৯ সাল | প্রায় ৩২ লাখ |
| ২০০০ সালের শেষ দিকে | প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ |
অর্থাৎ, বিল ক্লিনটনের প্রেসিডেন্সির শেষ নাগাদ ইন্টারনেট আর গবেষকদের খেলনা ছিল না; এটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তথ্যপ্রবাহের প্রধান অবকাঠামো।
এ সময়েই যাত্রা শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Amazon ও Yahoo। ১৯৯৫ সালে শুরু হয় eBay। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেয় Google। এসব প্রতিষ্ঠানের উত্থান শুধু নতুন ব্যবসা নয়, নতুন অর্থনীতিরও জন্ম দেয়। ‘ডটকম’ শব্দটি হয়ে ওঠে নতুন বিনিয়োগের প্রতীক।
১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। বিনিয়োগকারীরা প্রায় যেকোনো ‘.com’ প্রতিষ্ঠানে অর্থ ঢালতে থাকেন। এই সময়কে বলা হয় Dot-com Boom।
২০০০ সালে বাবল ফেটে যায়। হাজারো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটি ধ্বংস হয়নি। বরং সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী দুই দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ শুরু হয়।
সংবাদমাধ্যমেরও শুরু হয় নতুন যুগ। ক্লিনটনের শাসনামলেই বিশ্বের বড় বড় সংবাদপত্র অনলাইন সংস্করণ চালু করতে শুরু করে। সংবাদ আর কেবল পরদিন সকালে কাগজে ছাপা হওয়ার বিষয় থাকেনি। মিনিটে মিনিটে আপডেট দেওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়। আজকের ডিজিটাল নিউজরুম, লাইভ আপডেট, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সাংবাদিকতার ভিত্তি মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষভাগেই তৈরি হয়।
বিল ক্লিনটনের প্রেসিডেন্সি রাজনৈতিকভাবে নানা কারণে আলোচিত। কিন্তু প্রযুক্তির ইতিহাসে তার সময়টিকে আরও বেশি স্মরণ করা হয় এমন এক যুগ হিসেবে, যখন ইন্টারনেট পরীক্ষাগার ছেড়ে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।