রোবটের ম্যারাথন প্রতিযোগিতা © সংগৃহীত
দ্বিতীয়বারের মতো মানবসদৃশ রোবটের ম্যারাথন আয়োজন করতে যাচ্ছে চীন। আগামীকাল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য এই প্রতিযোগিতায় তিনশতয়ের বেশি রোবট এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে। ম্যারাথনে রোবটগুলোকে ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।
প্রতিযোগিতায় ৭০টির বেশি দল অংশ নিচ্ছে যা গতবারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। প্রযুক্তিগত উন্নতি যাচাই করতে এবার আয়োজকরা আরও কঠিন পথ নির্ধারণ করেছে। দৌড়ের পথে উঁচু নিচু ঢালু পথ, পার্ক এলাকা রাখা হয়েছে, যাতে রোবটগুলোর সক্ষমতা ভালোভাবে পরীক্ষা করা যায়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক জর্জ স্টিলার বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় যন্ত্রাংশের স্থায়িত্ব এবং ব্যাটারির আয়ু কতটা উন্নত হয়েছে, তা দেখা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোবট নির্মাতাদের এখন পণ্যের মান এবং দামের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।’
গত বছর সব রোবট দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। তবে এবার প্রায় ৪০ শতাংশ রোবট নিজে নিজেই চলতে পারবে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। এটি রোবট প্রযুক্তির বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এই আয়োজন রোবট তৈরির সীমাবদ্ধতাও সামনে আনবে।
গত বছরের প্রতিযোগিতায় কিছু রোবট শুরুতেই পড়ে যায় বা নিয়ন্ত্রণ হারায়। বিজয়ী ‘তিয়ানগং আল্ট্রা’ রোবটটি ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে দৌড় শেষ করে। এটি অন্য রোবটের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও মানুষের তুলনায় সময় দ্বিগুণ ছিল।
এবার তিয়ানগং আল্ট্রা সম্পূর্ণ নিজস্ব সেন্সরের মাধ্যমে দৌড়াবে। এটি বড় আকারের ডেটা ব্যবহার করে মানুষের মতো হাঁটা ও দৌড়ানোর ভঙ্গি অনুকরণ করবে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রোবট যখন পেশাদার ক্রীড়াবিদের গতির কাছাকাছি দৌড়ায়, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় খুব কম থাকে। এতে উচ্চ ক্ষমতার কম্পিউটিং ও দ্রুত সিস্টেম প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কিছু রোবট ঘণ্টায় ১৪ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারছে। তবে অনেক রোবটের চলাফেরা এখনো অস্বাভাবিক। কিছু রোবট পড়ে যাচ্ছে বা বাধার সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মানবসদৃশ রোবট স্থাপনে চীন শীর্ষে রয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে স্থাপিত ১৬ হাজার রোবটের ৮০ শতাংশই চীনের। যুক্তরাষ্ট্রের টেসলা এ ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ অংশীদার।
চীনের এজিবট ও ইউনিট্রি গত বছর ৫ হাজারের বেশি রোবট সরবরাহ করেছে। ইউনিট্রি বছরে ৭৫ হাজার রোবট উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের প্রতিযোগিতা দেখার জন্য আকর্ষণীয় হলেও শিল্পক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের বাস্তবতা এখনো অনেক দূরে। কারণ শিল্পকারখানায় কাজ করতে রোবটের সূক্ষ্ম দক্ষতা ও বাস্তব পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা প্রয়োজন।
বর্তমানে ইউনিট্রির রোবটগুলো গবেষণা, নাচের অনুষ্ঠান এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গাইড হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোবটগুলো এখনো ব্যাপকভাবে শিল্প বা ঘরোয়া ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রযুক্তি বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য হতে আরও সময় লাগবে।
এক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তাং ওয়েনবিন বলেন, ‘আমাদের রোবটের বুদ্ধিমত্তা এখনো কম। মডেলগুলো দুর্বল, সফলতার হারও কম।’ তিনি আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, পুরো শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এখন আমরা যা দেখছি, তার অনেকটাই ‘কাজের ছদ্মবেশে নাচ’।’
চীনা সরকার ‘ফিজিক্যাল এআই’ বা বাস্তবভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখছে। উৎপাদন বাড়াতে এবং শিল্প খাত আধুনিক করতে তারা এই প্রযুক্তিতে জোর দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রোবটকে মানুষের মতো দক্ষ করতে সফটওয়্যার উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে যন্ত্রাংশের খরচও একটি বড় সমস্যা।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে কোম্পানিগুলো বাস্তব ডেটা সংগ্রহে জোর দিচ্ছে। তারা মানুষের শরীরে সেন্সর লাগিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং কারখানায় আরও বেশি রোবট ব্যবহার করছে।
২০২৪ সালে ইউবিটেকের কারখানায় ১০টির কম রোবট ছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে এক হাজারের বেশি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তারা ১০ হাজার পূর্ণাঙ্গ মানবসদৃশ রোবট বাজারে আনতে চায়। এসব রোবট বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হবে।
ইউবিটেকের কর্মকর্তা মাইকেল ট্যাম বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতি নির্ভর করে আমরা কত বেশি এবং কত মানসম্পন্ন ডেটা সংগ্রহ করতে পারি তার ওপর।’
সংবাদসূত্রঃ আরবনিউজ