কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর © এআই
সিফাত খান (ছদ্ম নাম), টাঙ্গাইল জেলার একটি কারিগরি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি নিয়োগ পাওয়া এই শিক্ষক পাঁচ মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। তার মতো ৬ষ্ঠ ও ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কারিগরি স্কুল-কলেজে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষক এমপিওভুক্তি না হওয়ায় ৫ থেকে ১০ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এসব শিক্ষকের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এমপিওভুক্ত করে বেতন-ভাতা চালু করা।
জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি হয়। নিয়োগ পাওয়া ৪০ হাজার শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক একই বছরের আগস্ট মাসে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি স্কুল-কলেজে যোগদান করেন। তাদের মধ্যে শতাধিক শিক্ষক এমপিওভুক্তি হননি। ৬ষ্ঠ রি-সুপারিশ ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি, সে সময় ৪০০ জনের মধ্যে শতাধিক শিক্ষক কারিগরিতে যোগদান করেন।
আর এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তি হয় ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি। ১৬ হাজারের মধ্যে ১ হাজারের অধিক শিক্ষক কারিগরির বিভিন্ন স্কুল-কলেজে নিয়োগ পান। ৬ষ্ঠ-৭ম গণবিজ্ঞপ্তি মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষক এমপিওভুক্তি হননি।
এদিকে গত ১১ মে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব বরাবর একটি আবেদন করেন ৭ম গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ পাওয়া কারিগরি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। আবেদনে শিক্ষকরা বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে বৈষম্য দূরীকরণ ও দ্রুত বেতন প্রদানের দাবি জানাই। আমরা ৭ম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কারিগরি শিক্ষকবৃন্দ গত ৩-৪ মাস ধরে বেতন-ভাতা ছাড়া মানবেতর জীবন যাপন করছি।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি হয়। নিয়োগ পাওয়া ৪০ হাজার শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক একই বছরের আগস্ট মাসে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি স্কুল-কলেজে যোগদান করেন। তাদের মধ্যে শতাধিক শিক্ষক এমপিওভুক্তি হননি। ৬ষ্ঠ রি-সুপারিশ ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি, সে সময় ৪০০ জনের মধ্যে শতাধিক শিক্ষক কারিগরিতে যোগদান করেন।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে আমাদের এমপিওভুক্তি আটকে আছে, যেখানে মাউশি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্তরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। এই বৈষম্য আমাদের পেশাগত জীবনে চরম হতাশা সৃষ্টি করেছে। এমপিওভুক্তির জটিলতা নিরসন করে বকেয়াসহ বেতন নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ পারভিন জাকির কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পটুয়াখালীর গফুরুদ্দিন বিএম কলেজ, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার হোসেন্দ্দী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, ঝিনাইদহের মহেশপুরের ডা. সাইফুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ, টাঙ্গাইলের নয়নখান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, পটুয়াখালীর প্রভাষক বাংলা আব্দুর রশিদ মিয়া ডিগ্রি কলেজ, নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের হোসেনপুর এসপি ইউনিয়ন হাই স্কুলসহ সারাদেশের প্রায় ১ হাজার ৭৬টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষক এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ ১০ মাস, আবার কেউ কেউ ৪-৫ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং মাদ্রাসা অধিদপ্তরের এমপিওর কার্যাবলি অনলাইনের মাধ্যমে হয়ে বেতন-ভাতা পেলেও কারিগরির শিক্ষকরা অনলাইনে এখনো যুক্ত পারেননি বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তাদের কেউ ১০ মাস, ৬ মাস ও ৫ মাস ধরে অপেক্ষা করেও এমপিওভুক্তি হতে পারিনি। অথচ তাদের সাথে মাউশি ও মাদ্রাসা শিক্ষকরা নিয়োগ পেয়েই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কোন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তাদের এমপিওভুক্তি আটকে আছে, তা বুঝতে পারছেন না।
ঈদুল আজহার ছুটি শেষে সরকারি অফিস খোলা হয়েছে। আশা করব সরকারের সংশ্লিষ্টরা আমাদের ব্যাপারে আন্তরিক হবেন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষক এমপিওভুক্তি না হওয়ায় চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
তারা বলেন, উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্ত আমাদের অনেক শিক্ষক যোগদানের প্রায় ১০ মাস পার করলেও এখনো এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। বেতন-ভাতা ছাড়াই আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। ষষ্ঠ রি-সুপারি ও ৭ম গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বলেন, প্রায় ৬ মাস ধরেও বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। আমাদের ইনডেক্স নম্বর ও এমপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
শিক্ষকরা জানান, এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে যথাযথ নিয়মে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন এবং নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মাসের পর মাস বেতন ছাড়া চাকরি করতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। পরিবার পরিচালনা, বাসাভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
কারিগরি শিক্ষক জামাল আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইনডেক্স নম্বর ও এমপিওভুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় দীর্ঘ ৬ মাস ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছি। এরই মধ্যে দুটি ঈদ অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো বেতন-ভাতা পাইনি। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত পাঠদান ও দায়িত্ব পালন করলেও ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত থাকা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি, যোগদানের তারিখ থেকে ইনডেক্স প্রদান ও দ্রুত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে আমাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক।’
আরও পড়ুন: সেই শিক্ষিকাকে মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় যুক্ত করছে মন্ত্রণালয়
শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজু আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষক এমপিওভুক্তির বিষয়টা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর দেখে, তারা যদি আমাদের বিভাগের কাছে কোনো মতামত জানতে চায় তখন সে আলোকে কাজ শুরু করি বা মতামত দিই। আমরা শুধু প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তর ব্যাপারে কাজ করি। তবে যেহেতু অধিদপ্তর আমাদের অধিনে তারপরও আমরা বিষয়টি দেখব।
গতমাসে কারিগরির ভুক্তভোগী শিক্ষকরা সমস্যা সমাধান চেয়ে একটি আবেদন দিয়েছেন জানালে তিনি বলেন, ডাক খোললে হয়তো আমরা দেখতে পারব। তারপরও যেহেতু বিষয়টি জানলাম আমরা খুঁজ-খবর নিব বলে জানান এই কর্মকর্তা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পিআইইউ) প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘৭ম গণবিজ্ঞপ্তির শিক্ষকদের বিষয়ে ইতোমধ্যে দুটি মিটিং করা হয়েছে। নতুন অর্থবছর থেকে তারা এমপিভুক্তি হবেন এবং বেতন-ভাতা পাবেন। আর ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির যেসব শিক্ষক বাদ পড়েছেন, তাদেরটা ৭ম-এর শিক্ষকের সঙ্গে তাদেরটাও বাস্তবায়ন হবে। ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির শিক্ষকরা দেরিতে কাগজপত্র জমা দেওয়ায় এমনটা হতে পারে।’