শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম © সংগৃহীত
চিকিৎসকদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্য ঘিরে সমালোচনার মধ্যেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। আজ বুধবার (২৬ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এই দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে কিছু অনিয়মের কথা বলা মানেই পুরো পেশার মানুষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গত ২৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রশিবির আয়োজিত এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘A+ সংবর্ধনা-২০২৬’ চিকিৎসকদের নিয়ে মন্তব্য করেন শিবির সভাপতি। সেখানে অধিকাংশ চিকিৎসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত উল্লেখ করে বক্তব্য দেন তিনি। এ সময় প্রখ্যাত শিল্পী নচিকেতার ‘ও ডাক্তার’ গানটিরও বড় অংশ পড়ে শোনান শিবির সভাপতি। তবে চিকিৎসকদের নিয়ে বক্তব্যের প্রেক্ষিতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সাদ্দাম।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ‘আমার সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কিছু কথা’ শিরোনামে ফেসবুক পোস্টে দুঃখ প্রকাশ করেন শিবির সভাপতি। নুরুল ইসলাম সাদ্দাম লিখেছেন, ‘সম্প্রতি আমার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কিছু লেখালেখি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতি গ্রাস করে ফেলেছে প্রতি সেক্টরে, এমন কোনো খাত নেই যেখানে দুর্নীতির করাল থাবা আঘাত করেনি। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন বক্তব্যে আমি সেসব অসংগতিই তুলে ধরার চেষ্টা করি। শুরুতেই স্পষ্ট করতে চাই, কখনোই আমার কোনো বক্তব্যে কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী কিংবা কোনো পেশাকে ছোট করার উদ্দেশ্য থাকে না। কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে আঘাত করাটাও আমার উদ্দেশ্য নয়। কেউ কষ্ট পেলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আমার উপরিউক্ত বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট বিষয় ও বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সমাজের প্রায় প্রতিটি পেশাতেই কিছু অসাধু চক্র বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি থাকতে পারে। তাই কোনো একটি পেশার কিছু অনিয়মের কথা বলা মানেই পুরো পেশার মানুষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা নয়।’
চিকিৎসক ও মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ উভয়েই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে সাদ্দাম লিখেছেন, ‘অসংখ্য চিকিৎসক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও মানবিকতার সঙ্গে রোগীর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একইভাবে অসংখ্য মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদেরকে ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানিগুলো যেভাবে কাজে লাগায় তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের চাকুরির নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক সুজোগ সুবিধা নিয়ে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহলকে আন্তরিক হতে হবে।’
তবে যেখানে কোনো অনৈতিকতা, স্বার্থের সংঘাত বা অসাধু কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হয়, সেসব বিষয়ে জনস্বার্থ বিবেচনায় আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি করাও প্রয়োজন—উল্লেখ করেন ছাত্রশিবিরের এই শীর্ষ নেতা। বলেন, ‘আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল সেই জায়গাটিতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়। কোনো বক্তব্য যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কারও মনে কষ্ট বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে থাকে, সেটি আমার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে আমরা যেন পেশাগত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে আরও গঠনমূলক আলোচনা করতে পারি এটাই আমার প্রত্যাশা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সমালোচনা সবসময় সংশোধনের জন্য, কাউকে হেয় করার জন্য নয়। আলোচনা হোক বাস্তবতা ও তথ্যের ভিত্তিতে, কোনো পেশাকে ছোট করার জন্য নয়। সকল পেশার সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষদের প্রতি আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা।’
সমালোচিত বক্তব্যে যা বলেছিলেন সাদ্দাম
এর আগে গত ২৩ আগস্ট দেওয়া বক্তব্যে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসকদের দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছিলেন। অধিকাংশ চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছিলেন, ‘আমি একজন ডাক্তার হওয়ার পরে আমার চেম্বারে আমি বসে থাকি, আর বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির লোকজন এসে আমাকে প্রলুব্ধ করে এসি দেয়, আমার ঘরে বিশাল বিশাল অট্টালিকা তৈরি করে দেয়, এরপরে ফ্রিজ তৈরি করে দিচ্ছে। এর বিনিময়টা কী? ডাক্তার ওই কোম্পানির ওষুধ লেখে কিনা? লেখে কিনা এটা দেখার জন্য আবার দারোয়ান ফিট করা থাকে হাসপাতালে। দেখবেন ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দারোয়ান দাঁড়ানো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ও দারোয়ান দারোয়ানের পোশাকে না, ওই দারোয়ান সাদা ড্রেস পরা, সাদা শার্ট পরা আর কালো প্যান্ট পরা। ডিউটি সকাল থেকে সন্ধ্যা। আপনি বের হওয়ার সাথে দেখি দেখি কী ওষুধ লেখছে, হ্যা ভালো ওষুধ লেখছে, যান। নোট করে রাখে। এরপরে ওই ডাক্তারের কাছে আবার রিপোর্ট করে—আপনারে এসি দিয়ে গেলাম, ফ্রিজ দিয়ে গেলাম, কত কিছু দিলাম, মোটরসাইকেল দিলাম, গাড়ি দিলাম, ড্রাইভারের ভাড়া দিচ্ছি, এরপরে আমাদের ওষুধটা আপনি লেখেন না।’
সাদ্দাম বলেন, ‘এরপরে টেস্ট একটা লিখে দিবেম, টেস্ট একটা লেখার পরে তার ৪০%। অমুক জায়গা থেকে করান, আমার নামে যাবেন, কম নিবে। টেস্ট করাতে লাগে ১০০ টাকা, লিখে রাখবে ৮০০ টাকা। ডাক্তারের কাছ থেকে আসছেন, এইজন্য ২০% ছাড়। এই ২০% ছাড়ে হচ্ছে ৬০০ টাকা। এই ৬০০ টাকার মধ্যে ৪০% আবার যাবে ডাক্তারের কাছে। আর যে টাকাটা থাকবে এখান থেকে, তার ভিতরে অন্তত কস্টিং ওই প্রতিষ্ঠানের ১০০ টাকা। ১০০ টাকা তাদের লাভ। এইভাবে করে চলছে ডাক্তারি, এই বাণিজ্য।’
‘ওই ডাক্তারের চেম্বারে যারা যায়, যেভাবে জবাই করে’—উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণে টেস্ট দেয়, ইথিক্স নাই, নর্মস নাই। অথচ এই মেডিকেলে পড়তে গিয়ে যে পরিমাণে টাকা খরচ হয়, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই মেডিকেল কলেজগুলো পরিচালিত হচ্ছে—একজন ডাক্তারও বলে না আমি আমার জীবনে অন্তত সপ্তাহে একদিন ফ্রি চিকিৎসা দিব, এই জনগণের জন্য আমি খেদমত করব যাদের ট্যাক্সের টাকায় আমি পড়াশোনা করেছি। মেধা ছিল, সততা নাই, দেশপ্রেম নাই। দেশকে নিয়ে ভাবে না। আগামীর প্রজন্মকে নিয়ে ভাবে না। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে ভাবে না। ইনসাফের বাংলাদেশ কীভাবে হবে?’
তবে সব চিকিৎসক এমন নন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ডাক্তারদের মধ্যে কিছু অংশ মানবিক ডাক্তার রয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা এই জিনিসটা দেখতে পাই।’