বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে মারামারি
সোমবার উভয় পক্ষ মারামারিতে জড়ায়, ইনসেটে জুলাইয়ে হামলা মামলার আসামী ডা. আশরাফুজ্জামান সজীব © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার আসামীকে বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ (বিএমসি) হাসপাতালে নিয়োগের প্রতিবাদ জানানোকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দুই গ্রুপে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শাখা ছাত্রদলের সভাপতিকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছেন সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা। একই সাথে খোদ হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে সাধারণ সম্পাদকের উপর চড়াও হওয়ার অভিযোগও উঠেছে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের কক্ষে এই ঘটনার সূত্রপাত। পরে মেডিকেলের সামনের সড়কেও উভয় পক্ষে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন।
জানা গেছে, তিন মাস আগে হাসপাতালটির সহকারী অধ্যাপক ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুজ্জামান সজীব। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ৪ আগস্ট তৎকালীন বিএমইউয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় জড়িত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তার নামে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে বিএমইউ থেকেও চাকরিচ্যুত হন ডা. সজীব।
এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়োগের অল্প সময়ের মধ্যেই সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। এই ঘটনায় তাকে ফোন দিয়ে ‘জেরা’ করেন ছাত্রদলের বেসরকারি মেডিকেল শাখা কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ডা. মশিউর রহমান মুসা। তিনি একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ও শাখা ড্যাবের নেতা। এ অবস্থায় গত ১১ জানুয়ারি তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়ে সোমবার সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় আওয়ামীপন্থী চিকিৎসক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) শাখা সভাপতি ডা. দবির হোসেনকে।
১২ জানুয়ারি মশিউর রহমান মুসা পরিচালকের কক্ষে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রিফাত রায়হানসহ বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রদলের দাবি, জুলাই গণহত্যার সমর্থনকারী ও আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর হামলা মামলার আসামীকে ফোন দিয়ে কথা বলার কারণে কোনো তদন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এছাড়া দবির হোসেনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করারও প্রতিবাদ জানান তারা। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় উপস্থিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষ থেকে ‘বহিরাগত’ ছাত্রদল নেতাদের বের হয়ে যেতে চাপ প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। এ সময় এক ছাত্রদল নেতা মৃন্ময়ের উপর চড়াও হয়। তবে উপস্থিত নেতাকর্মী ও শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সেখানে সমাধান হয়। একই সঙ্গে গঠিত তদন্ত কমিটি বাতিল করে তদন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
এদিকে পরিচালকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে ডা. মশিউর রহমান মুসা ও শাখা ছাত্রদল সভাপতি রিফাত রায়হানসহ বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের বাইরে একটি চায়ের দোকানে অবস্থান করার সময় সেখানে উপস্থিত হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. দীপু। তিনি ছাত্রদলের শাখা সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময়ের উপর আক্রমণের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কথা কাটাকাটির শুরু হয়। মৃন্ময়ের অনুসারীদের অভিযোগ, এ সময় মশিউর রহমান মুসাসহ তার অনুসারীরা ডা. দীপুকে ব্যাপক মারধর করেন। ফলে উভয় পক্ষে মারামারি শুরু হয়। পরে শাখা মশিউর রহমান মুসা ও রিফাত রায়হানকে মারধর করেন মৃন্ময় ও শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদের অনুসারীরা।
উভয় পক্ষে মারামারির বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একজন চিকিৎসকের চাকরি ও নিয়োগ নিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত। ওই বিষয়ে তদন্ত স্থগিত করা হয়েছে। মারামারির ঘটনায় কোনো অ্যাকশন নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি গভর্নিং বডির বিষয়।
মারামারির বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রিফাত রায়হান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আওয়ামী লীগ পূনর্বাসন বিরোধী কর্মসূচিতে সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আমাদের উপর হামলা হয়েছে। আমি এবং মুসা ভাই আহত হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়েছি। সাধারণ সম্পাদকের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সহসভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদ আমাকে লাথি-ঘুসি মারতে থাকে। আমাকে রাস্তায় ফেলেও পেটানো হয়েছে।
তিনি বলেন, মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের আসামী ডা. সজিবের নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রতিবাদ করার জন্য ডা. মশিউর মুসাকে শোকজ করে এবং পরদিন তদন্ত কমিটির সাথে দেখা করা জন্য আদেশ প্রদান করা হয়। ওই দিন ডা. মুসার সাথে বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের অপর দুই জয়েন্ট সেক্রেটারি মমি আনসারী এবং ওমর খৈয়াম উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জোরপূর্বক তদন্তের রুমে প্রবেশ করে তদন্তে কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ফলে উপস্থিত কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয় এবং অশোভন আচরণে রুমে উপস্থিত নেতাকর্মীদের বাধার সম্মুখীন হয়। যা এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। ওই মূহুর্তে সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময়কে বাচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করি আমি। তবুও পরবর্তী সে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রপাগাণ্ডা ছড়ায় যে আমার দ্বারা সে শারীরিক ভাবে লাঞ্চনার শিকার। যা সম্পূর্ণ ভাবে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
একই সঙ্গে শাখা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক মৃন্ময় ও সহসভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদ অতীতে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও মৃন্ময় ছাত্রদল, বিএনপি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ব্যঙ্গ করে ফেসবুকে পোস্ট দিতেন। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক মেডিকেলটির প্রভাষক পদে নিয়োগ হওয়ার পরও শাখা ছাত্রদলের কমিটিতে জায়গা পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তদন্তের দিন মশিউর মুসা ভাই বহিরাগত নেতাকর্মীদের নিয়ে পরিচালকের কক্ষে আসেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তিনি একা সেখানে উপস্থিত হওয়ার কথা। ফলে বিষয়টি আমি জানার পর সেখানে যাই এবং বহিরাগতদের বের হওয়ার জন্য বলি। এতে তারা আমার উপর চড়াও হয় এবং আমার গলা চেপে ধরে। এ সময় শাখা ছাত্রদল সভাপতি রিফাত রায়হানও আমাকে মারধরের চেষ্টা করে। পরে আমাদের বড় ভাই ডা. দীপু এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা দীপু ভাইকে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক মারধর করে। ডা. দীপুকে উদ্ধার করতে গিয়ে উভয় পক্ষে মারামারি শুরু হয়।
ডা. আশরাফুজ্জামান সজীবকে ডা. মশিউর রহমান মুসা হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমরাও চাই ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন না হোক। কিন্তু এটি হাসপাতাল প্রশাসন করবে। ডা. মশিউর রহমান মুসা সজীবরে কলিগ। তিনি কী করে তাকে হত্যার হুমকি দেন?
একই কথা বলছেন শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকি তাজওয়ার সাদ। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীপু ভাইকে উদ্ধার করতে গিয়ে উভয় পক্ষে মারামারি শুরু হয়। আমাদের তরফ থেকে বিষয়টা ছিল ডা. দীপুকে উদ্ধার। বলা হচ্ছে আমি রিফাতকে লাথি দিয়েছি, এখন ওই সময়ে কে কাকে মেরেছে এটা বলা মুশকিল।
এদিকে তাকি তাজওয়ার সাদ ও ফারহানুল ফারুক মৃন্ময় উভয়েই ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। অতীতে বিভিন্ন কারণে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তারা। একই সঙ্গে রিফাত রায়হান ও মশিউর রহমান মুসার সঙ্গেই ছাত্রলীগের পদধারী নেতারা থাকেন বলেও অভিযোগ করেন মৃন্ময়।
সার্বিক বিষয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. মশিউর রহমান মুসা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডা. আশরাফুজ্জামান সজীবের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে জানার পর আমি তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তার বিরুদ্ধে শোনা অভিযোগগুলো সত্য কিনা? এর প্রমাণ পাওয়ায় আমি প্রশ্ন করেছিলাম কিভাবে তিনি নিয়োগ এবং পদোন্নতি পেলেন। তাকে কোনে ধরনের হুমকি-ধমকি দেইনি। মাত্র ৩ মিনিট কথা বলেছি তার সঙ্গে।
তিনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক। জুলাইয়ে আমরা অনেক রক্ত দেখেছি। অনেক বুলেট আমরা ছাত্রছাত্রীদের শরীর থেকে বের করেছি। এসব ঘটনায় যারা জড়িত ছিল, তারা নিয়োগ পাচ্ছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতিও পাচ্ছে। এ জায়গা থেকে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু এতে আমাকে শোকজ করে আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং এই কমিটির প্রধান করা হয় আবার আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের একজনকে। ফলে আমি সেখানে কোনো তদন্তের জবাব দিতে উপস্থিত হইনি। এই তদন্ত চলতে পারে না, সেটি বলতেই গিয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমার সঙ্গে বেসরকারি মেডিকেল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির লোকজন ছিল। এ বিষয়টিকে ইস্যু করে শাখা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক যে কিনা ওই চক্রের সঙ্গেই চলাফেরা করে, সে আমাদের উপর চড়াও হয়। ফলে উভয় পক্ষে মারামারি শুরু হয়।
ডা. মশিউর রহমান মুসা আরও বলেন, আমাদের সঙ্গে যেসব ছাত্রলীগ নেতা চলাফেরা করে, তারা জুলাইয়ের সম্মুখসারির লোক। ছাত্রলীগ থেকে ওই সময়ে পদত্যাগ করে তারা জুলাইয়ে ভূমিকা রেখেছে। আর মৃন্ময় ৫ আগস্টের পরও বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে নোংরামি করেছে।