গবেষণা

বাংলার প্রাধান্যে নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা

০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৫ PM , আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৮ PM
স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুরা

স্কুলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুরা © সংগৃহীত

বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ৫০টি জাতিগত সংখ্যালঘু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী) রয়েছে, যাদের প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের দিক থেকে আলাদা। তবে, জাতীয় ও সামাজিক জীবনে বাংলার প্রভাবের কারণে, তাদের শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ এবং ব্যবহার কমে যাচ্ছে। এছাড়াও, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভাষা বাংলা হওয়ায়, এসব শিশুদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত মাতৃভাষা পত্রিকার ‘বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জীবনে বাংলা ভাষার প্রভাব ও বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা পরিচালনা করেন স্বাক্ষার ব্লেইজ গমেজ।

গবেষণা বলছে, জাতীয় ও সামাজিক জীবনে বাংলার প্রভাবের কারণে, জাতিগত সংখ্যালঘুদের শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ এবং ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে। এই শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত বাংলা ভাষায় পরিচালিত হয়, যা তাদের প্রথমে বাংলা শিখতে বাধ্য করে। শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ভাষা বাংলা হওয়ায়, জাতিগত সংখ্যালঘু শিশুদের তাদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত। যেহেতু বাংলা গণযোগাযোগ, সাহিত্য এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য পায়, তাই এই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। এই প্রভাবের ফলে, শিশুরা তাদের মাতৃভাষার প্রতি কম মনোযোগ দিচ্ছে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মাতৃভাষা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অপর্যাপ্ত। যদিও ছোটবেলা থেকেই বাংলা ভাষা শেখা তাদের ভাষায় দক্ষ করে তোলে, তবুও তাদের জাতিগত ভাষা ব্যবহার করতে তাদের সমস্যা হয়। এই পরিস্থিতি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জাতিগত ঐতিহ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার সাথে ফারাক তৈরি করে।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি দেশ, যেখানে মূলধারার জাতিগোষ্ঠীর সাথে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ কাঠামো, ধর্মবিশ্বাস, রীতিনীতি নিয়ে স্মরণাতীতকাল থেকে এই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হলো ৫০টি। ২০১১ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, সমগ্র বাংলাদেশের মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা হলো ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১, যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৮ ভাগ। এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউটের তথ্য মতে বাংলাদেশে বাংলা ব্যতীত ৩৯টি ভাষা প্রচলন রয়েছে যে ভাষাগুলো সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।

আরও পড়ুন: জকসুর উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হলো স্টারলিংক

গবেষণা আরও বলছে, মালো, মুশহর, রাজোয়ার, ভূইমালি, হুদি, তেলি, তুরি ও বানাইয়ের মতো অন্তত ১৫টি জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার সমতল ভূমিতে বসবাস করে। তারা নানা ধরনের পেশার সাথে যুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ নানাভাবে কৃষি কাজের সাথে যুক্ত এবং বাকি ২৫ শতাংশ লোক অন্যান্য পেশা যেমন- চাকরি, শিক্ষকতা, হস্তশিল্প, জেলে, নাপিত, মুচি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত। তাদের মধ্যকার অনেকের দৈনিক আয় খুবই অল্প। ফলে জীবন-জীবিকার তাগিদে ছুটতে গিয়ে তাদের কাছে তাদের শিশুদের মাতৃভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারছে না বললেই চলে।  

আর, বর্তমানে এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা এখনো শিক্ষা ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্প্রদায় থেকে ঢের পিছিয়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, সচেতনতার অভাব, সুবিধা বঞ্চিত ইত্যাদি নানাবিদ কারণে এই সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। যা কিনা তাদের ভাষাকে বিপন্নতার মুখে ফেলে দিতে ভূমিকা পালন করছে।

শিক্ষায় পিছিয়ের পড়ার আরও কারণ তুলে ধরে গবেষণায় বলা হয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠানিক মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা নেই। এই শিশুরা শুধু তাদের পিতা-মাতা বা বয়স্কদের কাছ থেকে ভাষা মৌখিকভাবে শিখছে। যার ফলে ভাষা সঠিকভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চলে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষার উপযুক্ত অংশগ্রহণ এবং বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা কম রয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের প্রাথমিক স্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয় না এবং তাদের মাতৃ ভাষা বাংলা নয়। এই কারণে ভাষার অভাবের কারণে তারা সঠিকভাবে বাংলা ভাষা শিখতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

সুপারিশ ও পরামর্শ জানিয়ে গবেষণায় বলা হয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা এবং বাংলা ভাষা উভয়কেই সমানভাবে শিক্ষার মাধ্যমে কীভাবে প্রভাবিত করা যায় তা নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে; বাংলা ভাষার প্রসার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও ও সংস্কৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে এবং তার থেকে এই ভাষাগুলোর পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা এবং বাংলা ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে তাদের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে হবে; বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারিভাবে প্রণীত ভাষানীতি কীভাবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে এবং তা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও গবেষণা করতে হবে।

 

গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ স্কলারশিপে বিনা মূল্যে স্নাতকোত্তর ও প…
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জামায়াত আমিরের এক্স আইডি হ্যাক নিয়ে যা বলছে ডিবি
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন টুর্নামেন্টের সূচি ও স্কোয়াড ঘোষণা বিসিবির
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আপনার আমার অধিকার সমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের: হাবিব
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
৫০তম বিসিএসের ফল কবে, জানালেন পিএসসি চেয়ারম্যান
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভোটের কাজে বিএনসিসি চায় না বিএনপি
  • ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬