জাতীয় প্রেসক্লাবে গণসাক্ষরতা অভিযানের সংবাদ সম্মেলন © সংগৃহীত
দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে গণসাক্ষরতা অভিযান। পাশাপাশি প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এ পর্যায়ে অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দাবি ও পরামর্শ তুলে ধরে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর এই মোর্চা। সম্প্রতি শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত শিক্ষা নিয়ে ১২ দফা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে পরামর্শ জানাতে এ আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যে নিজেদের পরামর্শগুলো তুলে ধরেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি জানান, এগুলো সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে।
বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অর্ন্তর্বতী সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমদ বলেন, অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নিচের শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা নয়, বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছিল। এখন বলছে, নেবে। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাও হয়েছে, আবারও হবে। এটা করে আসলে পাবলিক পরীক্ষা ফেরানো হচ্ছে।
বৃত্তি পরীক্ষায় মানের কোনো উন্নয়ন হয় না উল্লেখ করে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, ১০ থেকে ২০ শতাংশ ভালো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা নিয়ে আরেকটু প্রণোদনা দেওয়া হয়। তারা তো ভালোই করছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, যারা ভালো নেই, তাদের মানোন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া দরকার। আমি বলব, বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত ‘ব্রিজ কোর্স’ প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘ব্রিজ কোর্স’ চালু করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে শুরুতে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের পেশাগত (প্রফেশনাল) অথবা বৃত্তিমূলক কোর্সে তা যুক্ত করা যেতে পারে। এটি নির্বাহী আদেশেই সম্ভব। ব্রিজ কোর্স হলো এক ধারা থেকে আরেক ধারায় যাওয়ার পথ সুগম করা ও মাধ্যমিকে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষার পদ্ধতি ‘রিভিউ’ করার সময় শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিতের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন বলে মত গণসাক্ষরতা অভিযানের। এর ভিত্তিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস এবং তাতে শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রণোদনা বা ভাতা দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষাক্রম ‘রিভিউ’ করার ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজসহ অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা দরকার।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই যেন অসংখ্য পরীক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কোচিং ও গাইড বই-নির্ভর হয়ে না ওঠে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত।
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, পরীক্ষা দিতে দিতে শ্রেণিভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে। সে জন্য এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং ও গাইড বই-নির্ভর করে ফেলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি গাইড বইই পড়বে, কোচিং সেন্টারে যাবে, তাহলে স্কুলের দরকার কী? এ জায়গায় সরকারকে দৃষ্টি দিতেই হবে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পরীক্ষার্থী হয়ে না যায়।
আরও পড়ুন: ঝুলে যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি
লিখিত বক্তব্যে তৃতীয় ভাষার শিক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে শুরু, বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত, মিড ডে মিল সব শিশুর জন্য নিশ্চিত করা, সমন্বিত শিক্ষা আইন, পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ বিবেচনা করাসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও দাবি জানায় গণসাক্ষরতা অভিযান।
শিক্ষা নিয়ে অবহেলার অবসান হবে আশা করে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যাচ্ছে, তবে বাস্তবায়নই বড় বিষয়। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিকল্পনা করতে বিশেষজ্ঞ বা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি চাই যে, শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, জোর দিতে হবে ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাকে ঠিকমতো চালানোর জন্য রাজনৈতিক সমর্থন ও অঙ্গীকার দরকার। রাজনৈতিক অপপ্রভাব যেটা আছে, তাও বন্ধ করতে হবে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন এডুকেশন ওয়াচের আহবায়ক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, ক্যাথলিক এডুকেশন বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি এফ গমেজ প্রমুখ।