শিক্ষার্থী © ফাইল ছবি
দীর্ঘ ১৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে এ পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আদালতে রিট করা হলে স্থগিত হয়ে যায় পরীক্ষা। গত বছরের স্থগিত হওয়া ওই বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আয়োজন করা হবে। এবার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
শিক্ষামন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেননা গত বছর যারা ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেছিলেন, তারা এখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ফলে নিয়মিত পড়ালেখার পাশাপাশি ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার জন্য পৃথকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে তাদের। এছাড়া বৃত্তি পরীক্ষার পর প্রথম সাময়িক পরীক্ষা থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অভিভাবকদের একটি অংশের মতে, নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার সঙ্গে ৫ম শ্রেণির পাঠ্যবই পড়ে পুনরায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এর সঙ্গে ৬ষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতিও রয়েছে। সব মিলিয়ে কোমলমতি শিশুদের একসঙ্গে দুটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে।
অন্যদিকে, অভিভাবকদের আরেকটি অংশের মতে, দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাত্র চারটি বিষয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। যা বিগত বছর শিক্ষার্থীরা নিয়েছিল। এছাড়া আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি থাকায় শিক্ষার্থীরা এই সময়কালকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারবে। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর খুব বেশি চাপ পড়বে না।
মারুফা আক্তার মিম নামে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। দুই শ্রেণির শিখনসূচি, বিষয়বস্তু ও মূল্যয়ন পদ্ধতির মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। এই ভিন্ন ভিন্ন বিষয় একসঙ্গে পড়ালেখা করে খাতায় উপস্থাপন করা শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার প্রভাব কী হতে পারে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে কি না কিংবা তাদের মানসিক বিকাশ ও অগ্রগতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
কামরুন নাহার রুনা নামে আরেক অভিভাবক বলেন, শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই বৃত্তি পরীক্ষা এপ্রিলে আয়োজনের কথা জানিয়েছেন। কেননা রমজান উপলক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি চলছে। শিক্ষার্থীরা যেন ছুটির সময়কে কাজে লাগিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেন, সেজন্য এপ্রিলের শুরুতেই পরীক্ষা আয়োজনের কথা জানিয়েছেন। এছাড়া বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শিক্ষার্থীরা গত বছরই নিয়েছেন। এখন নিয়মিত রিভিশন দিলেই তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে এপ্রিলে বৃত্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের ওপর খুব বেশি যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে বিষয়টি তেমনও না।’
এদিকে পাশাপাশি সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে শিশু শিক্ষার্থীরাও। প্রস্তুতির চাপ, সময় ব্যবস্থাপনার সংকট এবং পরীক্ষা দেওয়ার মানসিক উদ্বেগের কারণে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, কাছাকাছি সময়ে দুটি পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করায় যে কোনো একটির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে তাদের। ঘাটতি থেকে যাবে আরেকটি পরীক্ষার। এতে ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে টিউশন, কোচিং নিয়ে জট তৈরি হতে পারে।
‘আদালতে রিটের কারণে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষাটা যথাসময়ে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এটি দুঃখজনক। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন করা হলে স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার জন্য এক মাসের সময় পাবে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। ফলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। শিক্ষার্থীরা একটু বাড়তি পরিশ্রম করলে দুটো পরীক্ষাতেই তারা ভালো করতে পারবে। পরীক্ষা না হওয়ার চেয়ে পরীক্ষা হওয়া ভালো।’—ডিজি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
সাদিয়া খাতুন নামে এক শিক্ষার্থী জানান, ‘৫ম শ্রেণির বৃত্তি আর ৬ষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার সিলেবাস ও ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কোনোটাই ঠিকভাবে শেষ করতে পারব না।’
জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আদালতে রিটের কারণে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষাটা যথাসময়ে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এটি দুঃখজনক। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন করা হলে স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার জন্য এক মাসের সময় পাবে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। ফলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। শিক্ষার্থীরা একটু বাড়তি পরিশ্রম করলে দুটো পরীক্ষাতেই তারা ভালো করতে পারবে। পরীক্ষা না হওয়ার চেয়ে পরীক্ষা হওয়া ভালো বলেও জানান তিনি।’
এর আগে গত বুধবার দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, গত বছর যে পরীক্ষাটি নেওয়া সম্ভব হয়নি, সেটি এ বছর নিয়ে নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের বঞ্চিত করা যাবে না।
এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোও। মোট অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থাকবে ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনের জন্য ২০ শতাংশ।
এদিকে, আগামী বছর থেকে জুনিয়র বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি আমরা ভেবে দেখবো। আমরা মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। ভেবেচিন্তে এবং সবার সহযোগিতায় এটা করা হবে।